ওসি মোয়াজ্জেমের ৮ বছরের জেল – এ রায় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে
উত্তরদক্ষিণ মুদ্রতি সংস্করন । ২৯ নভেম্বর ২০১৯ । প্রকাশ ০০:০১। আপডেট ১০:৪০
সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালে মামলার প্রথম রায়
মোহাম্মদ শিহাব ষ বাংলাদেশ সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠার পর মামলার প্রথম রায় ঘোষণা করেছে। রায়টি ঐতিহাসিক ও নানা কারণেই গুরুত্বপূর্ণ। রায়ে ফেনীর সোনাগাজী থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোয়াজ্জেম হোসেনকে ৮ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফির জবানবন্দি ভিডিও করে ইন্টারনেটে ছড়িয়ে দেওয়ায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় বাংলাদেশ সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচারক মোহাম্মদ আসসামছ জগলুল হোসেন দু’টি ধারায় এই শাস্তির রায় ঘোষণা করেন। বাংলাদেশ সাইবার ক্রাইম ট্রাইব্যুনালে মামলার প্রথম রায়ও এটি। গতকাল বৃহস্পতিবার (২৮ নভেম্বর) দুপুরে আদালত মামলার একমাত্র আসামিকে ৮ বছর কারাদণ্ডের পাশাপাশি ১০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। জরিমানার অর্থ ক্ষতিগ্রস্ত নুসরাতের পরিবারকে দিতে বলা হয়েছে। কিন্তু জরিমানা অনাদায়ে আরও ছয়মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয় রায়ের আদেশে। ‘এ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে’ বলে মনে করেন নির্মম হত্যাকাণ্ডের শিকার নুসরাত জাহান রাফির মা শিরিন আখতার। তিনি এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, আদালাত বিচার বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনা করে রায় দিয়েছেন, আমি আদালতে ওসির বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছিলাম। নুসরাতের মা বলেন, ‘এ রায় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে, আর কোনো পুলিশ কর্মকর্তা কোনো মেয়ের সঙ্গে এমন আচরণ করার সাহস পাবেন না। কোনো হত্যাকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেওয়ার সাহস আর কোনো পুলিশ কর্মকর্তা পাবেন না।’ এ রায়ের মাধ্যমে নুসরাতের বিদেহী আত্মাও খুশি হবে বলেও জানান নুসরাতের মা। একটি টিভি চ্যানেলকে দেয়া সাক্ষাত্কারে প্রধানমন্ত্রীর কাছে কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করেন তিনি। শিরিনা আখতার বলেন, ‘ওসি মোয়াজ্জেম সহযোগিতা তো দূরের কথা; বরং ভিডিওটি ছড়িয়ে দিয়ে আরো ক্ষতি করেছেন। আমি এই রায়ে সন্তুষ্ট। প্রধানমন্ত্রীকে আমার ধন্যবাদ। বিচার বিভাগ এবং মিডিয়ার সাংবাদিকদের প্রতি কৃতজ্ঞ।’ পুলিশের বিরুদ্ধে রায়ে আপনি নিরাপত্তা আশঙ্কায় ভুগছেন কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ নিয়ে আশঙ্কা নেই। কারণ, সব পুলিশই তো আর মোয়াজ্জেমের মতো খারাপ নয়। যেমন সব হুজুরই তো সিরাজ উদদৌলার মতো লম্পট নয়।’ তবে তিনি নিরাপত্তা বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। সেই সাথে দাবি জানিয়েছেন মামলার প্রধান আসামি সিরাজ উদদৌলাকে যেন দ্রুত ফাঁসিতে ঝুলানো হয়। রায়ের প্রতিক্রিয়ায় মামলার বাদী ব্যারিস্টার সুমন বলেছেন, ‘নিজেদেরকে জমিদার ভাবা ওসিদের জন্য এ রায় অশনি সংকেত। পুলিশেরও যে বিচার হতে পারে তা এ রায়ের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বলেন, এ রায়ের মাধ্যমে দেশে আইনেন শাসন প্রতিষ্ঠা হয়েছে। এটি প্রমাণ করে অপরাধী যেই হোক তাকে ছাড় দেওয়া হয়নি। নুসরাতের ভাই নোমান এমন রায়ের জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ বিচার বিভাগের সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানান। জানা গেছে, ওসি মোয়াজ্জেমের এ রায়ে শুধু নুসরাতের পরিবার নয়, স্বস্তি বিরাজ করছে পুরো ফেনীতে। ফেনীর সোনাগাজী, ছাগলনাইয়া ও মডেল থানা এলাকার মানুষদের মধ্যে বিরাজ করছে স্বস্তি। দেশবাসীও ঐতিহাসিক এ রায়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন। এদিকে, নুসরাতের সহপাঠী ও সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা বলছেন, এ রায় ওসির জন্য সঠিক বিচার হয়েছে। নুসরাতকে যে অপমান তিনি করেছেন তার সঠিক বিচার এটি।
তবে আসামিপক্ষের আইনজীবীর ভাষ্য, ‘আবেগের বশে’ আদালত রায় দিয়েছে। তারা উচ্চ আদালতে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। উল্লেখ্য নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার সময় পরীক্ষাকেন্দ্রে পুলিশ ছিল। তারপরও এ ধরনের ঘটনা কীভাবে ঘটলো? দোষীরা কীভাবে পালিয়ে গেলেন। ওই ঘটনার তিনদিন পরও আসামি গ্রেপ্তাারে পুলিশের রহস্যজনক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তার ভাইয়ের দায়ের করা হত্যাচেষ্টা মামলাটি রূপান্তরিত হয় হত্যা মামলায়। তখন অভিযোগ ওঠে, ঘটনা ভিন্ন খাতে নেওয়ার জন্য সোনাগাজী থানার ওসি মোয়াজ্জেম নুসরাতের মৃত্যুর বিষয়টি ‘আত্মহত্যা’ বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু এ হত্যাকাণ্ডে দেশব্যাপী তোলপাড় ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কঠোর অবস্থানের কারণে অপরাধীরা একে একে সবাই আইনের আওতায় আসেন। হত্যা মামলা থেকে ওসি মোয়াজ্জেম বেঁচে গেলেও ব্যারিস্টার সুমনের দায়ের করা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে শেষ পর্যন্ত ফেঁসে গেলেন তিনি।
এ রায়ের পর রাষ্ট্রপক্ষের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম শামীম বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৬ ধারায় পাঁচ বছর কারাদণ্ড ও ৫ লাখ টাকা এবং ২৯ ধারায় তিন বছর কারাদণ্ড এবং পাঁচ লাখ টাকা অনাদায়ে ছয় মাসের কারাদণ্ডের আদেশ দেন আদালত। এ দুই ধারায় মোট আট বছরের কারাদণ্ড এবং ১০ লাখ অর্থদণ্ড হয় ওসি মোয়াজ্জেমের। রায়ে আসামিকে করা জরিমানার ১০ লাখ টাকা ক্ষতিগ্রস্ত নুসরাতের পরিবারকে দিতে বলেছেন আদালত।
যেভাবে এলো রায়: গত ২০ নভেম্বর রাষ্ট্রপক্ষ ও আসামি পক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষে রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করেন ট্রাইব্যুনাল। এই মামলায় মোট ১২ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। গত ২৭ মে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার রীমা সুলতানা ১২৩ পৃষ্ঠার একটি প্রতিবেদন জমা দেন ট্রাইব্যুনালে। এরপর বাদীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। এরপর গত ১৬ জুন দুপুরে রাজধানীর শাহবাগ এলাকা থেকে মোয়াজ্জেমকে গ্রেপ্তার করে শাহবাগ থানা পুলিশ। পরদিন ১৭ জুন তার জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন সাইবার ট্রাইব্যুনাল। উল্লেখ্য, ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিম পরীক্ষার্থী ছিলেন নুসরাত জাহান রাফি। ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদ্দৌলার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এনেছিলেন তিনি। নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে ২৭ মার্চ সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। এরপর অধ্যক্ষকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ওই মামলায় নুসরাতের বক্তব্য গ্রহণের সময় তা ভিডিও করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেন ওসি মোয়াজ্জেম হোসেন। যৌন হয়রানির অভিযোগ ভিডিওতে ধারণ এবং তা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন। পরে চলতি বছরের ৬ এপ্রিল আলিম পর্যায়ের আরবি প্রথমপত্রের পরীক্ষা দিতে মাদ্রাসার কেন্দ্রে যান নুসরাত। এ সময় তাকে পাশের বহুতল ভবনের ছাদে ডেকে নিয়ে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেওয়া হয়। ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিত্সাধীন অবস্থায় নুসরাত মারা যান। হত্যা মামলায় গত ২৪ অক্টোবর বিচারিক আদালত প্রধান আসামি অধ্যক্ষ মাওলানা সিরাজ উদ্দৌলাসহ ১৬ জন আসামির সবাইকে ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন। আর অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির মামলাটি বিচারাধীন রয়েছে। ‘জমিদার’ ভাবা ওসিদের জন্য অশনি সংকেত: যেসব ওসিরা পুলিশ স্টেশনকে জমিদার বাড়ি মনে করেন এবং নিজেদের আচরণও জমিদারের মতো, তাদের জন্য ওসি মোয়াজ্জেমের সাজার রায় অশনি সংকেত বলে মন্তব্য করেছেন এ মামলার বাদী ব্যারিস্টার সায়েদুল হক সুমন। ওসি মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলার রায়ের পর সাংবাদিকদের এ প্রতিক্রিয়া জানান ব্যারিস্টার সুমন। মামলার বাদী ব্যারিস্টার সুমন বলেন, সোনাগাজী থানার তত্কালীন ওসি অন্যায়ভাবে নুসরাতের ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার অপরাধে আদালত তাকে আট বছরের সাজা দিয়েছেন এবং ১০ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন। প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ, কারণ নুসরাত নিহত হওয়ার ঘটনায় তিনি আমাদের সাহস দিয়েছিলেন। যার ফলে সফলতার সঙ্গে আমরা মামলাটি শেষ করতে পেরেছি। তদন্তকারী সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) ধন্যবাদ, তাদের সুন্দর একটি তদন্তের জন্য আমরা ন্যয়বিচার পেয়েছি। ‘সারাদেশে পুলিশ স্টেশনগুলোকে যেসব ওসিরা জমিদার বাড়ি মনে করেন এবং যেসব ওসিদের আচরণও জমিদারের মতো এ রায় তাদের জন্য অশনি সংকেত। এ রায়ের মধ্য দিয়ে প্রমাণ হলো- পুলিশের বিরুদ্ধে বিচার পাওয়া সম্ভব। যারা পুলিশের পোশাক পরে দম্ভোক্তি করে এবং ক্ষমতা দেখায় তাদের জন্য এই রায় আতঙ্ক হয়ে থাকবে,’ যোগ করেন ব্যারিস্টার সুমন। আদালতের পর্যবেক্ষণের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভিডিওতে দেখা গেছে নুসরাত তার নেকাব খুলতে চায়নি এবং ভিডিওতে নুসরাত বার বার নিজেকে আড়াল করতে চাইছিলেন। এ থেকে বোঝা যায়, নুসরাত ভিডিওর বিষয়ে কনসার্ন ছিলেন না। সেক্সুয়াল হেরেজমেন্টের বিষয়ে অভিযোগ করতে এসে থানায় আবারো নুসরাত সেক্সুয়াল হেরেজমেন্টের শিকার হয়েছেন। ওসি হিসেবে মোয়াজ্জেমের যে দায়িত্ব, তিনি সে দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। এজন্য আদালত তার সর্বোচ্চ সাজা দিয়েছেন।

