মধ্যপ্রাচ্যে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অশান্ত ইরাক
উত্তরদক্ষিণ মুদ্রতি সংস্করন । ৩০ নভেম্বর ২০১৯ । প্রকাশ ০০:০১। আপডেট ১০:৪০
বিবিসি, আলজাজিরা ও আনন্দবাজার অবলম্বনে উত্তরদক্ষিণ ষ সরকারবিরোধী ব্যাপক বিক্ষোভ ও রক্তপাতের পর অবশেষে পার্লামেন্টে পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আদেল আবদুল মাহাদী। শুক্রবার ইরাকের শীর্ষ শিয়া নেতা আয়াতুল্লাহ আল সিসতানির আহ্বানে সাড়া দিয়ে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি বলে জানিয়েছেন। কর্মসংস্থানের সংকট, নিম্নমানের সরকারি পরিষেবা এবং দুর্নীতির অভিযোগ তুলে গত ১ সেপ্টেম্বর বাগদাদের রাজপথে নামে কয়েক হাজার বিক্ষোভকারী। নিরাপত্তা বাহিনী টিয়ার গ্যাস ও গুলি চালিয়ে তাদের ওপর চড়াও হলে এই বিক্ষোভ আরও জোরালো হয়ে ওঠে, বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে ইরাকের বিভিন্ন শহরে। গত বুধবার রাতে নাজাফের ইরানি দূতাবাসে অগ্নিসংযোগের পর বৃহষ্পতিবার বিভিন্ন শহরে চলতে থাকা বিক্ষোভের ওপর চড়াও হয় নিরাপত্তা বাহিনী। গুলিতে নিহত হয় কমপক্ষে ২৭ জন, মতান্তরে আরো বেশি। শুক্রবার শিয়া মতালম্বীদের পবিত্র শহর নাজাফে দেওয়া ভাষণে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আল সিসতানি প্রধানমন্ত্রী আবদুল মাহাদীকে পদত্যাগের কথা বিবেচনার আহ্বান জানান। পরে পার্লামেন্টে ইরাকী প্রধানমন্ত্রী আদেল আবদুল মাহাদী বলেন, তিনি (প্রধানমন্ত্রী) গভীর উদ্বেগ নিয়ে আল সিসতানির ভাষণ শোনার পর তার আহ্বানে সাড়া দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মাত্র এক বছর আগে দায়িত্ব নেওয়া মাহাদী বলেন, ‘বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে দিতে আমি পার্লামেন্টে আনুষ্ঠানিক স্মারক জমা দেব যাতে পার্লামেন্ট তাদের সিদ্ধান্ত নিতে পারে’।

ইরানি কনসুলেট অগ্নিসংযোগ: জ্বলছে ইরানের কনসুলেট। ধোঁয়ায় ঢেকেছে আকাশ। সে দিকে তাকিয়ে বিক্ষুব্ধ জনতার উল্লাস ‘‘বেরোও, এখান থেকে বেরোও ইরান!’’ ঘটনাস্থল ইরাকের দক্ষিণের শহর নজাফ। বুধবার রাতে নজাফে ভয়াবহ চেহারা নেয় ইরাকের সরকার-বিরোধী আন্দোলন। ক্রমশ তা ছড়িয় পড়ে দক্ষিণের অন্য শহরগুলোতেও। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী আদেল আব্দেল মেহদির শহর নাসিরিয়ায়। সেনা-বিক্ষোভকারী সংঘর্ষে আজ ইরাকে অন্তত ২৭ জন নিহত হয়েছেন বলে খবর। বুধবার রাতে নজাফের ইরানি কনসুলেটে হামলা চালান ইরাকের সরকার-বিরোধী আন্দোলনকারীরা। তাঁরা কনসুলেটের মূল ফটক ভেঙে ভিতরে ঢুকে আগুন লাগিয়ে দেন। পরিস্থিতি সামলাতে ঘটনাস্থলে পৌঁছয় ইরাকি বাহিনী। বিক্ষোভকারীদের নিরস্ত করতে কাঁদানে গ্যাস ছোড়া হয়। দু’পক্ষের সংঘর্ষে ৩৫ জন বিক্ষোভকারী আহত হয়েছেন। ইরাকের নিরাপত্তা বাহিনীরও ৩২ জন জখম হন। ঘটনার সময়ে কনসুলেটের ভিতরে ইরানের কোনও রাষ্ট্রদূত বা কর্মী ছিলেন না। ইরানের কোনও নাগরিকের জখম হওয়ার খবরও নেই তাই। এ ঘটনার পর থেকে কার্ফু জারি রয়েছে নজাফে। কিন্তু বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে, দক্ষিণ ইরাকের আর এক শহর নাসিরিয়ায়। ২৭ জনের মৃত্যুর পাশাপাশি অন্তত দেড়শো জন আহত হয়েছেন সেখানে। জ্বলছে বাগদাদও। আজ বাগদাদের রাস্তাতেও নামেন অসংখ্য তরুণ। মুখে মাস্ক, মাথায় হেলমেট। সেখানেও দুই বিক্ষোভকারীর মৃত্যু হয়েছে বলে খবর। গত দু’মাসে ইরাকের সরকার-বিরোধী আন্দোলনে মোট ৩৫০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এরই মধ্যে নতুন করে মাথাচাড়া দিয়েছে ইসলামিক স্টেটের মতো জঙ্গি গোষ্ঠীও। মঙ্গলবার বাগদাদে বিক্ষিপ্ত ভাবে তিনটি বিস্ফোরণ ঘটে। ছ’জন নিহত হয়েছিলেন। আজ ওই হামলার দায় নিয়েছে আইএস। ইরাকে সরকার-বিরোধী ক্ষোভের সূত্রপাত আজ থেকে ষোলো বছর আগে। ২০০৩ সালে মার্কিন সেনা অভিযানে সাদ্দান হুসেনের গদিচ্যুত হওয়ার পর থেকেই ইরাকের রাজধানী শহর ও দক্ষিণে শিয়া-অধ্যুষিত শহরগুলোতে ক্ষোভ ছড়াতে শুরু করে। ষোলো বছর আগের সেই পরিবর্তন পড়শি রাষ্ট্রের (ইরানের) দরজা খুলে দেয় ইরাকে। অর্থনীতি, রাজনীতি, প্রতিরক্ষা প্রতিটি ক্ষেত্রে আধিপত্য বিস্তার করতে থাকে ইরান। প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে ক্ষোভ ছড়াতে থাকে ইরাকিদের মধ্যে।
মাস দুয়েক আগে সেই ক্ষোভ প্রথম ‘আন্দোলনের’ চেহারা নেয়। পথে নামে বাগদাদবাসী। প্রথম দিকে আন্দোলনের প্রকাশ্য দাবি ছিল মূলত, চাকরি চাই, উন্নত মানের সরকারি পরিষেবা চাই। কিন্তু ক্রমশ আন্দোলনের চেহারা বদলাতে থাকে। দাবি ওঠে- ‘‘এই সরকারই আর চাই না। এই সরকার দুর্নীতিগ্রস্ত, এই সরকার ইরানের হাতের পুতুল।’’ বিক্ষুব্ধদের অভিযোগ, ইরাকের পার্লামেন্টে ক্ষমতাসীন দলগুলি ইরানের কথা শুনে চলে। ইরানের বিরুদ্ধে এই ক্ষোভেরই প্রতিফলন গত কাল নজাফের ঘটনা। তবে ইরানের কনসুলেটে হামলা এই প্রথম নয়। এ মাসের গোড়াতেই কারবালার ইরানি কনসুলেটে হামলা চালান ইরাকের বিক্ষোভকারীরা। সে বার নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে চার বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছিলেন। নজাফের এক শীর্ষস্থানীয় ধর্মগুরুর কথায়, ‘‘কনসুলেটে এই হামলার ঘটনায় একটা ষ্পষ্ট বার্তা রয়েছে, ইরাকি সমাজের একটা বড় অংশ ইরানের রাজনৈতিক উপস্থিতি চায় না। এবং দেশের সরকারের বর্তমান অবস্থার জন্য তারা ইরানকেই দায়ী করছে। অতএব ইরান বিদায় হও…।’’
বিক্ষোভের দিনলিপি : রাস্তায় প্রতিবাদের রং গারদ ভেঙে বেরিয়ে আসছে একটা লোক। নীচে লেখা, ‘আমাদের একটা দেশ চাই, কারাগার নয়।’ আর একটা ছবি এক দঙ্গল বিক্ষোভকারীর। ‘ভি’ চিহ্ন দেখাচ্ছেন তাঁরা। ছবির নীচে লেখা ‘বিপ্লবের বীজ পুঁতে দাও, রাষ্ট্রের জন্ম হবে।’ একটা দেওয়াল-লিখনের বার্তা আরও স্পষ্ট, ‘দেখো আমেরিকা, তোমাদের জন্যই আমাদের এই হাল।’ বাগদাদের সাদুন টানেল ও তার চারপাশ। টাইগ্রিস নদীর ধারে এই এলাকাটি এখন বিক্ষোভকারীদের দখলে। অক্টোবর থেকে বিক্ষোভে উত্তাল যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটি। পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে শতাধিকের মৃত্যু হয়েছে, আহত কয়েক হাজার। আজ ও চার জনের মৃত্যু হয়েছে। বিক্ষোভ আগেও দেখেছে এ দেশ। তবে সেই বিক্ষোভের থেকে এ বারের প্রতিবাদের চেহারাটি আলাদা। এ বার বিক্ষোভকারীরা কোনও রাজনৈতিক নেতার পদত্যাগ বা রাজনৈতিক দলের গদি ছাড়ার দাবি তুলছে না। তারা চাইছে, দেশের রাজনৈতিক কাঠামো এবং শাসন ব্যবস্থাতেই আমূল পরিবর্তন আসুক। ২০০৩-এ মার্কিন হানা ও সাদ্দাম হুসেনের পতনের পর থেকে যে ভাবে সরকার চলছে, তা নিয়েই প্রবল আপত্তি রয়েছে বিক্ষোভকারীদের। এখন সরকারি আধিকারিকদের সব পদ-ই শিয়া, সুন্নি ও কুর্দদের জন্য সংরক্ষিত। এবং এই সব আধিকারিকের অধিকাংশই দুর্নীতিগ্রস্ত। গত বছর ক্ষমতায় এসে প্রধানমন্ত্রী আদেল আবদেল মাহদি আশ্বাস দিয়েছিলেন, দুর্নীতি রুখতে কড়া পদক্ষেপ করবেন তিনি। দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোও ঢেলে সাজানোর আশ্বাস দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী। বলেছিলেন, অতি ধনীদের সঙ্গে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠদের এই আকাশ-পাতাল তফাত থাকবে না। কিন্তু সে সব আশ্বাস বাস্তবায়িত হয়নি। আর তারই ফলে অসন্তোষ দানা বাঁধতে বাঁধতে বিশাল বিক্ষোভের আকার ধারণ করেছে। সেই বিক্ষোভের নতুন প্রকাশ, সাদুন টানেলের গা-জোড়া গ্রাফিটি। এই টানেলটি আসলে বিশাল এক আন্ডারপাস। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ সেখান দিয়ে যাতায়াত করেন। সেই প্রাচীরের গায়েই অসংখ্য ছবি ও গ্রাফিটি একেছেন ছাত্রছাত্রীরা, যাদের অধিকাংশই মেডিক্যাল পড়ুুয়া। হায়দার মহম্মদ নামে এক ছাত্রের কথায়, ‘আমরা হয় তো পথে নেমে বিক্ষোভে অংশ নিতে পারছি না। কিন্তু এই ছবি এঁকে আমাদের আন্দোলনকারী ভাইদের বার্তা দিতে চাই যে, আমরা সবাই আপনাদের পাশে আছি। আমরাও পরিবর্তন চাই।’

