বিশ্ব এইডস পরিস্থিতি – কিশোর-কিশোরীরা বেশি ঝুঁকিতে

বিশ্ব এইডস পরিস্থিতি – কিশোর-কিশোরীরা বেশি ঝুঁকিতে

উত্তরদক্ষিণ মুদ্রতি সংস্করন । ০১ ডিসেম্বর ২০১৯ । প্রকাশ ০০:০১। আপডেট ১০:৩৮

সংক্রমণ ব্যাধি এইডস বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভয়ানক অবস্থা সৃষ্টি করেছে। বিশ্বায়নের যুগে এর ঝুঁকিতে রয়েছে সবদেশ। যদিও বাংলাদেশ সেই তুলনায় এখনও বেশ ভালো অবস্থানে রয়েছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এ নিয়ে আত্ম তৃপ্তির কিছু নেই। কারণ, বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর মধ্যে এইডস আক্রান্তের হার অনেক বেশি। এরই মধ্যে রোহিঙ্গারা দেশের মূলজনস্রোতে মিলে-মিশে একাকার হতে শুরু করেছে। তাছাড়া, রোহিঙ্গা তরুণীরা অভাবের কারণে ক্ষুধার তাড়নায় যৌন ব্যবসায় জড়িয়ে যাচ্ছে ব্যাপক হারে। ফলে এইডসও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেয়া যায় না। সরকারের পক্ষ থেকে অবশ্য বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে এখনও ০.০১ শতাংশের মধ্যেই রয়েছে এইডস আক্রান্তদের হার। আর ২০৩০ সালের মধ্যে তা নির্মূলের লক্ষ্য নিয়ে সরকারের প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে জানা গেছে। বাংলাদেশ পরিস্থিতি যাই হোক, বিশ্ব পরিস্থিতি মোটেই সন্তোষজনক নয় বলে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে। ইউনিসেফ-এর গত বছরের এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, এইডস আক্রান্ত যদিও কমতে শুরু করেছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। তবে সেই কমার ধারা বা গতি সন্তোষজনক নয়। বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩০ সালে এইডসে আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন ৮০ জন কিশোর-কিশোরী মারা যাবে। এইচআইভি সংক্রমণ ও এইডস-সম্পর্কিত মৃত্যু কমানোয় ধীরগতির তথ্যের প্রেক্ষাপটে কিশোর-কিশোরীদের মাঝে চিকিত্সা ও প্রতিরোধমূলক কর্মসূচি পরিচালনা জোরদার করার আহ্বান জানাচ্ছে ইউনিসেফ। ২০১৮ সালের ২৯ নভেম্বর ওই প্রতিবেদন প্রকাশ করে করা হয়। ইউনিসেফের ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এইডস-সম্পর্কিত রোগে আক্রান্ত হয়ে ২০১৮ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার কিশোর-কিশোরীর মৃত্যু হতে পারে। এর অর্থ হচ্ছে এইচআইভি প্রতিরোধ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও চিকিত্সা প্রকল্পে বাড়তি বিনিয়োগ করা না হলে প্রতিদিন ৭৬ জন কিশোর-কিশোরীর মৃত্যু হবে। ‘শিশু, এইচআইভি ও এইডস: ২০৩০ সালের বিশ্ব’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বলা

হয়েছে, জনসংখ্যা বৃদ্ধির বর্তমান ধারা বজায় থাকলে এইচআইভিতে আক্রান্ত ০-১৯ বছর বয়সীদের সংখ্যা ২০৩০ সালের মধ্যে আনুমানিক ২ লাখ ৭০ হাজারে পৌঁছাবে, যা বর্তমানের অনুমানের চেয়ে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কম। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এইডস-সম্পর্কিত কারণে মারা যাওয়া শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের সংখ্যা ভবিষ্যতে কমবে। বর্তমানের ১ লাখ ১৯ হাজার থেকে ২০৩০ সালে তা ৫৬ হাজারে নেমে আসবে। তবে এই কমার হার খুবই ধীরগতির, বিশেষ করে কিশোর-কিশোরীদের ক্ষেত্রে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে জীবনের প্রথম দশকে নতুন করে এইচআইভিতে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা কমে অর্ধেকে নেমে আসবে। তবে নতুন করে এইচআইভিতে আক্রান্ত ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীর সংখ্যা কমবে মাত্র ২৯ শতাংশ। এইডস-সম্পর্কিত কারণে ১৪ বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর হার ৫৭ শতাংশ কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যেখানে ১৫-১৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর হার কমবে ৩৫ শতাংশ। গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশকালে ইউনিসেফের নির্বাহী পরিচালক হেনরিয়েত্তা ফোর বলেন, ‘কোনো সন্দেহ ছাড়াই এই প্রতিবেদন এটা পরিষ্কারভাবে তুলে ধরেছে যে, ২০৩০ সালের মধ্যে এইডসে আক্রান্ত হওয়া শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের সংখ্যা শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার ব্যাপারে বিশ্ব সঠিক পথে নেই। মায়েদের শরীর থেকে সন্তানের শরীরে এইচআইভির সংক্রমণ ঠেকাতে পরিচালিত প্রকল্প কাজে দিচ্ছে, তবে তা বেশিদূর এগোয়নি। অন্যদিকে এই ভাইরাসে আক্রান্তদের চিকিত্সা এবং বেশি বয়সী শিশুদের মাঝে এই ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে পরিচালিত প্রকল্পগুলো যে অবস্থানে থাকা উচিত্ ছিল সে অবস্থানে নেই।’ ইউনিসেফের হিসাব অনুযায়ী, ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী আনুমানিক ৭০০ কিশোর-কিশোরী প্রতিদিন নতুন করে এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়- অথবা প্রতি দুই মিনিটে আক্রান্ত হয় একজন। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে জীবনের প্রথম দশকে নতুন করে এইচআইভিতে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা কমে অর্ধেকে নেমে আসবে। তবে নতুন করে এইচআইভিতে আক্রান্ত ১০ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোর-কিশোরীর সংখ্যা কমবে মাত্র ২৯ শতাংশ।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ২০৩০ সালেও আনুমানিক ১৯ লাখ শিশু ও কিশোর-কিশোরী এইচআইভিতে আক্রান্ত অবস্থায় বেঁচে থাকবে, যাদের বেশির ভাগই হবে পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলীয় আফ্রিকার অধিবাসী (১১ লাখ)।  এর পরেই হবে পশ্চিম ও মধ্য আফ্রিকা (৫ লাখ ৭১ হাজার) এবং লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চল (৮৪ হাজার)। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৩০ লাখ শিশু ও কিশোর-কিশোরী এইচআইভিতে আক্রান্ত অবস্থায় বেঁচে আছে, যাদের অর্ধেকের বেশির বসবাস পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলীয় আফ্রিকায়। ২০১৮ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়ে বেঁচে থাকা ০-১৯ বছর বয়সীর সংখ্যা কমার ক্ষেত্রে অঞ্চলভেদে ভিন্নতা থাকবে। সবচেয়ে বেশি কমবে দক্ষিণ এশিয়া (৫০ শতাংশের কাছাকাছি) এবং পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলীয় আফ্রিকায় (৪০ শতাংশ)। অন্যদিকে মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চলীয় আফ্রিকায় কমবে মাত্র ২৪ শতাংশ, যদিও এ অঞ্চলটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ এইচআইভি আক্রান্তের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে। শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের জন্য এইচআইভি মোকাবেলার ক্ষেত্রে প্রধান দু’টি বিষয়ে ‘ঘাটতির তথ্য প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তা হলো, শিশুদের মাঝে এইচআইভির সংক্রমণ ঠেকানোর কার্যক্রমে মন্থর অগ্রগতি এবং এই মহামারীর কাঠামোগত ও আচরণগত চালিকাশক্তি চিহ্নিতকরণে ব্যর্থতা। অনেক শিশু ও কিশোর-কিশোরীই জানে না তারা এইচআইভিতে আক্রান্ত নাকি আক্রান্ত নয় এবং এইচআইভি-পজেটিভ বা এইচআইভি আক্রান্ত হিসেবে যাদের পাওয়া গেছে ও চিকিত্সা প্রদান শুরু করা হয়েছে, তাদের মধ্যে খুব কম সংখ্যকই চিকিত্সা কার্যক্রম চালিয়ে গেছে। এই অবিরাম ঘাটতি মোকাবেলায় প্রতিবেদনে ইউনিসেফ সমর্থিত বেশ কিছু পদ্ধতি অবলম্বনের সুপারিশ করা হয়েছে, যেগুলোর মধ্যে রয়েছে- যেসব শিশু এইচআইভির সংক্রমণ নিয়েই বেঁচে আছে কিন্তু এখনও তা ধরা পড়েনি, তাদের চিহ্নিত করতে ও চিকিত্সা দিতে পরিবার-কেন্দ্রিক পরীক্ষার ব্যবস্থা করা; আগেভাগেই এইচআইভি সংক্রমিত শিশু চিহ্নিত করার ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে সেবাকেন্দ্রগুলোতে পরীক্ষা-নিরীক্ষার আরও প্রযুক্তির সন্নিবেশ ঘটানো; কিশোর-কিশোরীদের মাঝে এইচআইভি সংক্রান্ত জ্ঞানের প্রসারে অধিক মাত্রায় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো ব্যবহার করা; কিশোর-কিশোরীবান্ধব সেবা প্রদান এবং কমিউনিটিগুলোতে কিশোর-কিশোরদের জন্য কর্মসূচি পরিচালনা করা। ফোর বলেন, ‘আমরা যদি পরবর্তী প্রজন্মের মাঝে সংক্রমণ ঠেকাতে অগ্রগতি করতে না পারি, তাহলে এইচআইভির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমরা জয়ী হতে পারবো না। ছেলে ও মেয়ে উভয়ের ক্ষেত্রেই গত দশকের অর্জনগুলোকে টেকসই করতে হলে আমাদের অবশ্যই এই অত্যাবশ্যকীয় বোধটি বজায় রাখতে হবে। আর এটা করতে হলে সবচেয়ে দুর্দশাগ্রস্ত ও ঝুঁকির মুখে থাকা তরুণ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর উদ্ভাবনী ও প্রতিরোধমূলক উপায় খুঁজে বের করতে হবে।’

বাংলাদেশ পরিস্থিতি: বাংলাদেশে জনসাধারণের মাঝে এইচআইভি -এর প্রাদুর্ভাব কম (<.০১%)। ২০১৭ সালে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রনালয় ৮৬৫টি নতুন সংক্রমনের ঘটনা তুলে ধরে যার মধ্যে ৫%-এর বেশি শিশু ও কিশোর-কিশোরী, যাদের বয়স ১৮ বছরের নিচে, এবং ২৫% মহিলা। ইউনিসেফ বাংলাদেশ ও সরকারের জাতীয় এইচআইভি প্রোগ্রাম সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা কিশোর-কিশোরীদের এইচআইভি রোধ, চিকিত্সা ও যত্ন; এইডস আক্রান্ত শিশুদের সুরক্ষা, যত্ন ও চিকিত্সা কার্যক্রমগুলোকে আরও টেকসই ও প্রসারের জন্য কাজ করে যাচ্ছে। প্রসঙ্গত, ১৯৮৮ সাল থেকে ১ ডিসেম্বর বিশ্ব এইডস দিবস পালন করা হচ্ছে। এইডস-এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ও জনসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে বিশ্ব সম্প্রদায় এ দিবসটি পালন করে থাকে। ২০৩০ সালের মধ্যে এইডসমুক্ত বিশ্বের স্বপ্ন দেখে জাতিসংঘ।  জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ৩৪ মিলিয়ন মানুষ এইডসে আক্রান্ত এবং এ পর্যন্ত প্রায় ৩৫ মিলিয়ন মানুষ এ মরণঘাতী রোগে মৃত্যুবরণ করেছে। ১৯৮১ সালে মার্কিন আমেরিকায় সর্বপ্রথম এ মরণঘাতি রোগ প্রকাশ পায় এবং একই বছরে দেশটির লস অ্যাঞ্জেলস রাজ্যের পাঁচ সমকামী এই রোগে আক্রান্ত হয়। এক গবেষণায় জানা গেছে, সমকামীদের মধ্যে এই রোগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশে সর্বপ্রথম এইচআইভি কেস সনাক্ত হয়। ২০১২ সালে বাংলাদেশে ৩৩৮ জন এইচআইভিতে আক্রান্ত হয়। বর্তমানে দেশে এইডস আক্রান্তের হার শূন্য দশমিক শূন্য এক শতাংশ। প্রতিবারের মতো এবারও বাংলাদেশে দিবসটি পালনে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading