গ্রাজুয়েটদের যোগ্য নাগরিক হওয়ার আহ্বান রাষ্ট্রপতির
উত্তরদক্ষিণ মুদ্রতি সংস্করন । ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ । প্রকাশ ০০:০১। আপডেট ১০:৪০
প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে (ঢাবি) বর্ণাঢ্য আয়োজনে ৫২তম সমাবর্তন হয়ে গেল। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মনের কোণে লালিত স্বপ্ন বাস্তব হলো ২০ হাজারের অধিক তরুণ-তরুণীর জীবনে। কালো রঙের গাউন পরে উল্লাসে মেতেছেন গ্রাজুয়েটরা। এ এক অবর্ণনীয় ভালো লাগা, বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস আর অনাবিল আনন্দ। সেইসঙ্গে অনেকের চোখ ভিজেছে প্রিয় ক্যাম্পাস বিচ্ছেদের বেদনায়। যেখানে যৌবনের শুরুতে পদধূলি, কত স্মৃতি আনন্দ বেদনার কাব্য কাম্পাসকে ঘিরে। যেখানে মিশে আছে না বলা অনেক রোমাঞ্চ। আছে বড় হওয়ার গল্প। মানুষ হওয়ার, শিক্ষার উচ্চ সোপানে পৌঁছার স্মৃতির মন্দির। সেই ক্যাম্পসকে বিদায়। সহপাঠীদের ছেড়ে যাওয়ার বেদনা। হূদয় কোণে ভাসছে ক্যাম্পাসের দেয়ালে দেয়ালে একে যাওয়া অসংখ্য সুখস্মৃতি। মধুর ক্যান্টিন। টিএসসি। এক কথায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটা ইট, গাছ, ঘাষ সব কিছুর সঙ্গে আপন হয়ে উঠার স্মৃতিগুলো বিদায় বেলায় মন্থর হচ্ছে হূদয়পটে। এসবের মাঝে ছিল ভালো লাগার সংখ্য শিহর, অনুভুতিও। যার জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা। কালো গাউন জড়িয়ে যেন আলোকিত উল্লাস। সেলফি তোলা। কেউ আবার দীর্ঘ শিক্ষা জীবনের এই প্রান্তে এসে অর্জিত কালো গাউন পিতা-মাতা’র গায়ে জড়িয়েও স্মৃতির খাতা সমৃদ্ধ করে রেখেছেন। যা বাকি জীবনে পথ চলার জন্য হয়ে থাকছে প্রেরণার উত্স। সেইসঙ্গে সমাবর্তন অনুষ্ঠানের সভাপতি, বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলার ও দেশের রাষ্ট্রপতির দিক-নিদের্শনা গ্রাজুয়েটদের আগামীর পথ চলতে অনুপ্রেরণা যোগাবে। নতুন গ্রাজুয়েটদের অভিনন্দন জানিয়ে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ- তাদের দেশের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে ওঠার আহ্বান জানিয়েছেন। একইসঙ্গে তাদেরকে পরিবারসহ দেশের জন্য ভালো কিছু করার উপদেশ দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি। বিশেষ করে চিকিত্সক ও ফার্মাসির ছাত্রদের ভেজাল ও নকল ওষুধের বিরুদ্ধে জোরালো প্রচারণা চালানোর আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘এসব ওষুধ মানুষের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।’ এসময় রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চালু হওয়া বিভিন্ন ইভিনিং কোর্সের তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, একশ্রেণির শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছেন, যাতে সার্বিক শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে। রাষ্ট্রপতি গতকাল সোমবার (৯ ডিসেম্বর) পরন্ত বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ৫২তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে এ কথা বলেন। রাষ্ট্রপতি ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন ডিপার্টমেন্ট কোর্স, ইভিনিং কোর্স, ডিপ্লোমা কোর্স ও ইনস্টিটিউটের ছড়াছড়ি। নিয়মিত কোর্স ছাড়াও এসব বাণিজ্যিক কোর্সের মাধ্যমে প্রতি বছর হাজার হাজার গ্রাজুয়েট বের হচ্ছে। এসব ডিগ্রি অর্জন করে শিক্ষার্থীরা কতটুকু লাভবান হচ্ছে এ ব্যাপারে প্রশ্ন থাকলেও একশ্রেণীর শিক্ষক ঠিকই লাভবান হচ্ছেন। তারা নিয়মিত নগদ সুবিধা পাচ্ছেন এবং বিশ্ববিদ্যালয়কে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করছেন। রাষ্ট্রপতি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন দিনে সরকারি ও রাতে বেসরকারি চরিত্র ধারণ করে। বিশ্ববিদ্যালয় সন্ধ্যায় মেলায় পরিণত হয়। এটা কোনওভাবেই কাম্য নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের আচর্য ও রাষ্ট্রপতি বলেন, কিছু শিক্ষক আছেন- যারা নিয়মিত কোর্সের ব্যাপারে অনেকটা উদাসীন। কিন্তু ইভিনিং কোর্স, ডিপ্লোমা কোর্স ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস নেয়ার ব্যাপারে তারা খুবই সিরিয়াস। কারণ, এগুলোতে নগদ প্রাপ্তি থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে অনুষ্ঠিত মূল সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ শিক্ষকদের প্রতি সতর্কবাণী উচ্চারণ করে বলেন, মনে রাখবেন বিশ্ববিদ্যালয় চলে জনগণের টাকায়। সুতরাং এর জবাবদিহিও জনগণের কাছে। রাষ্ট্রপতি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে সান্ধ্য কোর্সগুলো পুনর্বিচনার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আমি এই সান্ধ্য কোর্স পদ্ধতি পছন্দ করতে পারি না। সন্ধ্যার পর শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ থাকে না।’ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলার ও রাষ্ট্রপতি- বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ভাইস-চ্যান্সেলার ও শিক্ষকদের প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটা পয়সা সততার সঙ্গে সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। উপাচার্যকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান অভিভাবক ও একাডেমিক লিডার অভিহিত করে রাষ্ট্রপতি হামিদ বলেন, কোনো কোনো উপাচার্য ও শিক্ষকের কর্মকাণ্ড দেখলে মনে হয় তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের আসল কাজ কি- তা ভুলে গেছেন। অনেক শিক্ষক প্রশাসনিক পদ-পদবি পেয়ে নিজে যে একজন শিক্ষক সে পরিচয় ভুলে যান। গবেষণা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অত্যন্ত মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ কাজ উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, এখন গবেষণার মান নিয়েও নানা কথা ওঠে। অনেক বিভাগেই অন্যান্য পদের শিক্ষকের চেয়ে অধ্যাপকের সংখ্যা বেশি। রাষ্ট্রপতি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে পদোন্নতির ক্ষেত্রে গবেষণা মৌলিক, নাকি কেবল পদোন্নতির জন্য একটি গবেষণা- তা বিবেচনায় নেয়ার নির্দেশ দেন। সম্প্রতি দেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া অমানবিক ও অনভিপ্রেত ঘটনার প্রসঙ্গে রাষ্ট্রপতি বলেন, এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ও শিক্ষার্থীদের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে। রাষ্ট্রপতি ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য ঢাবি কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানিয়ে আশা প্রকাশ করেন যে, পরবর্তী নির্বাচন কোনো ধরনের অপ্রত্যাশিত ঘটনা ছাড়া অনুষ্ঠিত হবে। ডাকসু নেতৃবৃন্দের ভূমিকার সমালোচনা করে উদ্বেগ প্রকাশ করেন চ্যান্সেলার। বলেন, ডাকসু নেতাদের ছাত্রছাত্রীদের কল্যাণে কাজ করা উচিত।রাষ্ট্রপতি হামিদ ২০২০ সালে মুজিববর্ষকে সামনে রেখে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মরণোত্তর সম্মানসূচক ডক্টর অব লজ ডিগ্রি প্রদান করার সিদ্ধান্তের জন্য ঢাবি কর্তৃপক্ষের প্রতি কতৃজ্ঞতা জানান।

