জাতিসংঘ আদালতকে গাম্বিয়া মিয়ানমারে গণহত্যা বন্ধ করুন

জাতিসংঘ আদালতকে গাম্বিয়া মিয়ানমারে গণহত্যা বন্ধ করুন

উত্তরদক্ষিণ মুদ্রতি সংস্করন । ১১ ডিসেম্বর ২০১৯ । প্রকাশ ০০:০১। আপডেট ১০:৪০

আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে (আইসিজে) গাম্বিয়ার বিচারমন্ত্রী আববকর তামবাদউ মিয়ানমারে গণহত্যা বন্ধের দাবি জানিয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার (১০ ডিসেম্বর) আদালতে বিচার শুরুর সময় উদ্বোধনী বক্তব্যে তামবাদউ বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে চলতে থাকা গণহত্যা বন্ধে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারকদেরকে ব্যবস্থা নিতেই হবে। ‘গাম্বিয়া যা চায় তা হচ্ছে, আপনারা মিয়ানমারকে এই কাণ্ডজ্ঞানহীন হত্যাযজ্ঞ বন্ধ করতে বলুন। যে বর্বরতা এবং নৃশংসতায় মানুষ স্তম্ভিত হয়ে যায়, মর্মাহত হয় গাম্বিয়া তার অবসান চায়। মিয়ানমারে নিজ দেশের মানুষের ওপর গণহত্যা বন্ধ হতে দেখতে চায়।’ পশ্চিম আফ্রিকার মুসলিম অধ্যুষিত দেশ গাম্বিয়া সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালানোর জন্য নভেম্বরে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করে। ১০ ডিসেম্বর থেকে নেদারল্যান্ডসে হেগের আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচার আদালতে (আইসিজে) মিয়ানমারের গণহত্যা নিয়ে অভিযোগের প্রথম শুনানি শুরু হয়েছে। চলবে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত।  দ্য হেগ শহরের আন্তর্জাতিক বিচার আদালত আইসিজেতে গ্যাম্বিয়ার বিচারমন্ত্রী আবুবাকার তাম্বাদু শুনানির শুরুতে বলেছেন, রোহিঙ্গা মুসলমানদের নির্বিচার হত্যার প্রশ্নে বিশ্ব বিবেককে জাগ্রত করতেই তার দেশ আইসিজেতে এই অভিযোগ এনেছে। ‘সারা বিশ্ব কেন এখন নীরব দর্শক? কেন আমাদের জীবদ্দশাতে এটা আমরা ঘটতে দিচ্ছি?’ তিনি বলেন, ‘সবাই মনে করে এখানে মিয়ানমারের বিচার হচ্ছে। আসলে এখানে বিচার চলছে আমাদের সামগ্রিক মানবিকতার।’ শুনানির প্রথম দিনে বাদীপক্ষের বক্তব্য শোনা হয়। মিয়ানমার এসব অভিযোগের জবাব দেবে আজ বুধবার। এরপর বৃহস্পতিবার দু’পক্ষের মধ্যে যুক্তি-তর্ক হবে।  ধর্ষণের কথা অস্বীকার করতে বলেছিলেন সু চি: রাখাইনে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীর বর্বরতার তথ্য-উপাত্ত ও দেশটির স্টেট কাউন্সিলর অং সান সু চির ভূমিকা হেগে আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে (আইসিজে) তুলে ধরেছেন গাম্বিয়ার পক্ষের মার্কিন আইনজীবী তাফাদজ পাসিপান্দো। আদালতে তিনি বলেন, “রোহিঙ্গা নারীদের ধর্ষণের কথা অস্বীকার করতে বলেছিলেন অং সান সু চি। ফেসবুকে ‘ফেক রেপ’ নামে যে পেজ খোলা হয়েছে সেটিও নিয়ন্ত্রণও হচ্ছে স্টেট কাউন্সিলরের দপ্তর থেকে।” রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আইসিজেতে গাম্বিয়ার করা মামলার বিচার শুরু হয়েছে গতকাল মঙ্গলবার। দেশের আইনি লড়াই চালাতে হেগে গেছেন মিয়ানমারের ডি ফ্যাক্টো নেত্রী অং সান সু চি। মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় বেলা ৩টায় গাম্বিয়ার তথ্য উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে তিনদিনের শুনানি শুরু হয়েছে। মার্কিন আইনজীবী তাফাদজ পাসিপান্দো আরাকানে এখনও যে ৬ লাখ রোহিঙ্গা আছেন, তাদের দুর্ভোগ ও ঝুঁকির কথা আদালতে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, রাখাইনে কাঁটাতার দিয়ে ঘেরা শিবিরে রোহিঙ্গাদের আটক রাখা হয়েছে। তাদের চলাচলের স্বাধীনতা খর্ব করা হয়েছে।  নানা বিধি-নিষেধও আরোপ করা হয়েছে। জাতিসংঘ তদন্তে এসব উঠে এসেছে বলে জানান পাসিপান্দো। তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গাদের চাষাবাদের জমি কেড়ে নেওয়া হয়েছে। খাদ্য সরবরাহ কমানো হয়েছে। বাড়ির গবাদি পশু কেড়ে নেওয়া হয়েছে। তাদের অভুক্ত রাখতেই এসব করা হয়েছে। জাতিসংঘের তদন্ত প্রতিবেদনে বিষয়গুলো উঠে এসেছে। পাসিপান্দো বলেন, রাখাইনে গণহত্যার অপরাধ যাতে আর না ঘটে, সে জন্য ব্যবস্থা নিতে পারে আইসিজে। শুনানিতে মিয়ানমারকে গণহত্যা বন্ধের নির্দেশ দিতে আইসিজের প্রতি আহ্বান জানায় গাম্বিয়া। দেশটির আইন ও বিচারমন্ত্রী আবুবকর মারি তামবাদু এই আহ্বান জানান। তিনি বলেন, আধুনিক যুগে এই গণহত্যা কোনোভাবেই গ্রহণ করা যায় না। রোহিঙ্গারাও মানুষ। খাদ্য বস্ত্র বাসস্থানসহ বাঁচার অধিকার তাদের রয়েছে। রোহিঙ্গা শিশুদের অধিকার রয়েছে শিক্ষা লাভ করে ডাক্তার হওয়ার। তিনি বলেন, আমি ২০১৮ সালে কক্সবাজারে ওআইসির পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করি। সেখানে গিয়ে রোহিঙ্গাদের চোখে ভয়, কষ্ট ও মানবিকতার চরম অবমাননা দেখতে পেয়েছি। সেখানে গিয়েই জানতে পেরেছি রাখাইনে গণহত্যা চালানো হয়েছে। গণহত্যা না হলে এত মানুষ পালিয়ে আসত না। দ্য হেগের স্থানীয় সময় সকাল ১০টায় বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, রোহিঙ্গা এবং মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে শুনানি শুরু হয়। মঙ্গলবার আদালতে গাম্বিয়ার বক্তব্য উপস্থাপনের পর বুধবার মিয়ানমার তাদের অবস্থান তুলে ধরবে। এরপর বৃহস্পতিবার সকালে গাম্বিয়া এবং বিকেলে মিয়ানমার প্রতিপক্ষের যুক্তি খণ্ডন ও চূড়ান্ত বক্তব্য পেশের সুযোগ পাবে। গাম্বিয়ার প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন সে দেশের আইন ও বিচারমন্ত্রী আবুবকর মারি তামবাদু। মিয়ানমারের নেতৃত্বে থাকছেন দেশটির স্টেট কাউন্সেলর অং সান সু চি। শুনানির শুরুতে আইসিজের প্রেসিডেন্ট আবদুলকোয়াই আহমেদ ইউসুফ শুনানির প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিচারকক্ষে উপস্থিত সুধীজনদের অবহিত করেন। বাংলাদেশ এই মামলার সরাসরি অংশগ্রহণকারী পক্ষ না হলেও পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হকের নেতৃত্বে কর্মকর্তা ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং বিশেষজ্ঞদের একটি প্রতিনিধি দল ওই শুনানিতে উপস্থিত রয়েছেন। মামলার শুনানি উপলক্ষে হেগ শহরে গাম্বিয়া ও মিয়ানমার ছাড়াও অন্য কয়েকটি দেশ ও সংস্থার প্রতিনিধিরা হাজির হয়েছেন। মামলায় গাম্বিয়াকে সমর্থন দিতে ইসলামি সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) কূটনীতিকেরাও উপস্থিত হয়েছেন। এছাড়াও বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা রোহিঙ্গা অধিকারকর্মী এবং মিয়ানমার সরকারের সমর্থকেরাও উপস্থিত রয়েছেন শুনানিতে।

আদালতে পাথরের মতো মুখ করে বসে ছিলেন সু চি: মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে শুনানির প্রথম দিনে যখন রোহিঙ্গাদের ওপর সে দেশের সামরিক বাহিনীর একের পর এক নৃশংসতার ঘটনা তুলে ধরা হচ্ছিল তখন সেখানে পাথরের মত মুখ করে বসে ছিলেন নোবেল শান্তি পুরষ্কার বিজয়ী অং সান সু চি। এসব অভিযোগের জবাব দেয়ার জন্য মিয়ানমার যে প্রতিনিধিদল পাঠিয়েছে ফার্স্ট মিনিস্টার মিজ সু চি নিজেই তার নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

তিনি মঙ্গলবার গাড়িবহরে করে আদালতে যান এবং তাকে করা সাংবাদিকদের প্রশ্নের কোনো জবাবও দেননি। গাম্বিয়ার পক্ষ থেকে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিস্তারিত বর্ণনার সময় সু চিকে অনেকটাই ভাবলেশহীন দেখা গেছে।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading