রাজাকারের তালিকা হতেই হবে

রাজাকারের তালিকা হতেই হবে

উত্তরদক্ষিণ মুদ্রতি সংস্করন । ১৯ ডিসেম্বর ২০১৯ । প্রকাশ ০০:০১। আপডেট ১০:৪০

হিল্লোল বাউলিয়া ষ বিজয়ের মাসে রাজাকারের তালিকা প্রকাশ একটি সাহসী ও মহত্ উদ্যোগ ছিল সরকারের। কিন্তু অসতর্কতার কারণে বিষয়টি বিতর্কিত হয়েছে। এক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন ছিল। তবে যেকোনো মূল্যে রাজাকারের তালিকা হতেই হবে। এমনটাই মত সচেতন মহলের। এ জন্য সংশোধিত তালিকা প্রকাশের যে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে- নিশ্চয়ই সেটি ইতিবাচক। কারণ, রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধার নাম থাকাটা কোনোভাবেই মার্জনীয় নয়। ফলে এই ভুলের জন্য দেশের অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধা, তাদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ব্যথিত হয়েছেন। তার নির্দেশে ‘বিতর্কিত’ তালিকাটি এ মুহূর্তে স্থগিত করা হয়েছে। কিন্তু কীভাবে এমন তালিকা প্রকাশ হলো- এ প্রসঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এখন বলছেন, বিএনপি-জামায়াত ২৫-৩০ বছর ক্ষমতায় থাকাকালীন এই তালিকা পরিবর্তন হয়ে থাকতে পারে। বিষয়টি খুবই উদ্বেগজনক। কাজেই সংশ্লিষ্টদের এক্ষেত্রে আরও সতর্ক ও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশিষ্টজনরা। এদিকে, তালিকায় নাম আসায় তা বাতিল করতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়সহ তিনটি মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু। গতকাল বুধবার (১৮ ডিসেম্বর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তিতে রাজাকারের সদ্য প্রকাশিত ‘বিতর্কিত’ তালিকা স্থগিত করার কথা জানিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, যাচাই-বাছাই করে আগামী ২৬ মার্চ রাজাকারের নতুন তালিকা দেওয়া হবে। অপরদিকে, এদিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধার নাম আসায় প্রধানমন্ত্রী নিজেও আহত হয়েছেন। দ্রুত ভুল সংশোধন করে তিনি নতুন তালিকা প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন। একই কথা বলেছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। গতকাল বুধবার (১৮ ডিসেম্বর) বিকেলে সচিবালয়ে নিজ কক্ষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, এই ঘটনায় আমার মন্ত্রণালয়ের কেউ জড়িত কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে তদন্ত কমিটি করা হবে। আমার মন্ত্রণালয়ের কেউ জড়িত থাকলে তাকে অবশ্যই আইনের আওতায় আনা হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমাদের কাছে রাজাকার, আলবদর আল-শামসের কোনো তালিকা নেই। আমরা মন্ত্রণালয়কে যে তালিকা দিয়েছিলাম, সেটি ছিল ১৯৭২-৭৪ সালে দালাল আইনে অভিযুক্তদের তালিকা। ১০ হাজার ৭৮৯ জনের মধ্যে ৯৯৬ জনকে বিভিন্ন সময়, বিভিন্ন কারণে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়কে আমরা সে সংক্রান্ত একটি নোটও পাঠিয়েছিলাম। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় আমাদের কাছে তালিকা চেয়েছে, কিন্তু প্রকাশ করবে কি না তা তিনি বলেনি। মুক্তিযুদ্ধমন্ত্রী আ. ক. ম. মোজাম্মেল হক নিশ্চয়ই ভালো কিছু করতে চেয়েছিলেন বলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।

‘সংশোধনের’ নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর: গতকাল বুধবার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের প্রধান কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ওবায়দুল কাদের বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত স্বাধীনতাবিরোধীদের তালিকা যাচাই-বাছাই ও সংশোধনের পর নতুন করে প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন। সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘এ বিষয়টা আমাদের নজরে এসেছে এবং এ বিষয়টি আমাদের নেত্রী জানেন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে এ ব্যাপারে আমাদের নেত্রী প্রধানমন্ত্রী নির্দেশনা দিয়েছেন। ‘মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ইতোমধ্যে ভুল সংশোধনের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। আমাদের নেত্রীও তাদের যাচাই বাছাই করে- এখানে যেন ভুলভ্রান্তি না থাকে, ভুলভ্রান্তি থাকলে সংশোধন করে তালিকা প্রকাশের নির্দেশনা দিয়েছেন।’ বিজয় দিবসের আগের দিন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ১০ হাজার ৭৮৯ জন ‘স্বাধীনতাবিরোধীর’ ওই তালিকা প্রকাশ করে। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামী লীগের সরকারের কাছে বিভিন্ন মহল থেকে স্বাধীনতা বিরোধীদের তালিকা প্রকাশের দাবি করা হচ্ছিল দীর্ঘদিন ধরে। কিন্তু প্রথম দফায় এই তালিকা প্রকাশের পর বরিশাল, বরগুনা, রাজশাহী, বগুড়া ও ঝালকাঠি জেলার মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ পরিবারের সদস্য, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও একাত্তরের আওয়ামী লীগ নেতাদের কয়েকজনের নাম দেখে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেন স্থানীয় নেতাকর্মী ও মুক্তিযোদ্ধারা। কোথাও কোথাও বিক্ষোভ কর্মসূচিও দেওয়া হয়। মুক্তিযোদ্ধারা এসব ভুল দ্রুত সংশোধন করে নতুন তালিকা প্রকাশের দাবি জানান। আর এই ভুলের পেছনে দায়ীদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানায় ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি ও সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে আসা এই সংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, দালাল আইনের আওয়তায় তালিকাভুক্ত রাজাকারদের গেজেট অনুসরণ করা হলে এই বিভ্রান্তি তৈরি হত না। রাজাকারের এই তালিকা প্রকাশের আগে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা করা ছিল জরুরি। এই প্রেক্ষাপটে ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, একাত্তরে প্রকৃতপক্ষে স্বাধীনতাবিরোধী ছিলেন না, এমন কারো নাম সরকারের প্রকাশিত স্বাধীনতাবিরোধীদের তালিকায় এসে থাকলে তা বাদ দেওয়া হবে। তবে ভুলের দায় অস্বীকার করে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রী বলেছেন, ‘এই তালিকাটি ১৯৭১ সালে করা। আমি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সংগ্রহ করেছি।’ অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তালিকা সরবরাহ করার সময় যেসব ব্যক্তির নাম-মামলা প্রত্যাহার হয়েছিল, সে বিষয়ে ‘নোট’ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তালিকা প্রকাশের ক্ষেত্রে ওই সব ‘নোট’ বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ওই নোটগুলো বিবেচনায় নিয়ে যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধী তালিকা আবার প্রকাশ করবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি। ওবায়দুল কাদের বলছেন, মন্ত্রণালয় যেহেতু বিষয়টি নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেছে, যাচাই বাছাইয়ের অঙ্গীকার করেছে, সেহেতু এ নিয়ে আর কোনো ‘প্রশ্ন থাকার কথা নয়’। আওয়ামী লীগের কার্যালয় জাতীয় সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির বৈঠক শেষে দলীয় কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন কাদের। 

এর পর বুধবার দলীয় এক কর্মসূচিতে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এসময় তিনি বলেন, তালিকা প্রকাশের আগে ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করার জন্য আমি নির্দেশ দিয়েছিলাম মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রীকে। এটি তাড়াহুড়ো করে প্রকাশ করার কথা ছিল না। এটি খুবই খারাপ কাজ হয়েছে বলেও মনে করেন সরকারপ্রধান ও বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। পাশাপাশি তিনি সবাইকে আশ্বাস্ত করেছেন, এটি অবশ্যই দ্রুত সময়ের মধ্যে সংশোধন করে মুক্তিযোদ্ধাদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেয়া হবে। সুতরাং কেউ যেন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করতে না পারে সেদিকেও সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading