ফুলেল শ্রদ্ধায় আবেদকে শেষ বিদায়
উত্তরদক্ষিণ মুদ্রতি সংস্করন । ২৩ ডিসেম্বর ২০১৯ । প্রকাশ ০০:০১। আপডেট ১০:৩৪
বাংলাদেশের মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করার চেষ্টায় জীবন পার করা স্যার ফজলে হাসান আবেদকে শ্রদ্ধা, ভালোবাসায় বিদায় জানিয়েছে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ। গতকাল রাববার (২২ ডিসেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ফজলে হাসান আবেদের মরদেহ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হয়। বেলা সাড়ে ১২টায় সেখানে জানাজা শেষে বনানী কবরস্থানে চিরনিদ্রায় শায়িত হন তিনি। আর্মি স্টেডিয়ামে আনার আগে সকালে কিছু সময়ের জন্য ফজলে হাসান আবেদের কফিন নেওয়া হয় মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে। তাকে শেষ বিদায় জানাতে সকাল ১০টার দিকেই আর্মি স্টেডিয়ামে ভিড় করতে থাকে মানুষ। ব্র্যাকের কর্মীরা এসেছিলেন তাদের প্রিয় ‘আবেদ ভাইকে’ শেষবার দেখতে। শ্রদ্ধা জানাতে এসেছিলেন বিভিন্ন অঙ্গনে দেশের বিশিষ্টজনরা। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তার কফিন আর্মি স্টেডিয়ামে নিয়ে আসা হলে প্রথমেই রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের পক্ষে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান তার সামরিক সচিবের একান্ত সচিব মেজর আশিকুর রহমান। এরপর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে শ্রদ্ধা জানান উপ-সামরিক সচিব কর্নেল সাইফ উল্লাহ। জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী, ডেপুটি স্পিকার ফজলে রাব্বী মিয়া ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা ফুলের শ্রদ্ধা জানান ফজলে হাসান আবেদের কফিনে। শ্রদ্ধা নিবেদনের পর সিইসি বলেন, ‘সারা পৃথিবীর মানুষ স্যার ফজলে হাসান আবেদকে স্মরণ করবে। মানুষের সমতা প্রতিষ্ঠা, নারীর ক্ষমতায়ন ও আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের জন্য আজীবন কাজ করেছেন তিনি।’ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের শ্রদ্ধা নিবেদন করেন- দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ ও বাহাউদ্দিন নাছিমসহ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতাকে সঙ্গে নিয়ে। পরে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘একজন সৃজনশীল ও জনদরদী মানুষ ছিলেন তিনি। তার এই শূন্যতা পূরণ হবে না সহজে।’ বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমীরও তার দলের একটি প্রতিনিধি দলকে সঙ্গে নিয়ে ফজলে হাসান আবেদের কফিনে ফুল দেন। এসময় ফখরুল বলেন, ‘যারা পৃথিবীকে বদলে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, ছিলেন সাধারণ মানুষের পাশে- তাদের একজন স্যার ফজলে হাসান আবেদ। বাংলাদেশের গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়নে তিনি কাজ করেছেন। শিক্ষার বিস্তারে তিনি যে কাজ করেছেন তা দেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থা বদলে দিয়েছে।’ প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী ও সালমান এফ রহমান, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র মো.আতিকুল ইসলাম, জাতীয় পার্টির নেতা আনিসুল ইসলাম মাহমুদ ও সাংসদ শেখ ফজলে নূর তাপস আর্মি স্টেডিয়ামে এসেছিলেন শ্রদ্ধা নিবেদন করতে। সাবেক মন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, নোবেলবিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস, জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আকবর আলি খান, গণস্বাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচারক রাশেদা কে চৌধুরী ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ম. তামিম, গণস্বাস্থের ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীও ছিলেন শ্রদ্ধা নিবেদনের সারিতে। এছাড়া জাতিসংঘের ঢাকা কার্যালয়, ইউএসএইড, বিকাশ, কারিতাস, বাংলা একাডেমি, বেঙ্গল ইনস্টিটিউটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা জানানো হয় কর্মগুণে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পাওয়া এই বাংলাদেশির প্রতি। স্যার ফজলের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে এসে চোখে ভিজে ওঠে মুহাম্মদ ইউনুসের। ব্র্যাক প্রতিষ্ঠাতার কাজের নানা দিক স্মরণ করেন গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইউনূস। তিনি বলেন, ‘একক ব্যক্তি হিসেবে তিনি সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় সবকিছু করেছেন। এখন আমরা যা দেখছি, তার রূপকার ছিলেন তিনি। এটা একটা বড় দৃষ্টান্ত হবে আমাদের জন্য। তার মৃত্যু এক বিরাট শূন্যতা তৈরি করবে, যা আমাদেরকে একযোগে এগিয়ে নিতে হবে।’ শ্রদ্ধা নিবেদন করতে এসেছিলেন ঢাকায় বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশনের প্রতিনিধিরা। অনেকে শোকবার্তাও পাঠিয়েছেন। শ্রদ্ধা নিবেদনের পর ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলার বলেন, ‘শুধু বাংলাদেশ নয়, সারা পৃথিবীর জন্য তিনি কাজ করেছেন। মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য জীবন অতিবাহিত করেছেন তিনি। তাকে মানুষ সেভাবে স্মরণে রাখবে।’ পরে সেখানে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে লাশ নিয়ে যাওয়া হয় বনানীর কবরস্থানে। সেখানে প্রথম স্ত্রীর কারবে চিরশায়িত করা হয় কিংবদন্তী এই বাঙালির মরদেহ। এর আগে শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টায় রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় মারা যান স্যার ফজলে হাসান আবেদ। তার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর।

