ঢাকার ২ সিটিতে ভোট, মেয়র প্রার্থীদের দৌড়-ঝাপ

ঢাকার ২ সিটিতে ভোট, মেয়র প্রার্থীদের দৌড়-ঝাপ

উত্তরদক্ষিণ মুদ্রতি সংস্করন । ২৬ ডিসেম্বর ২০১৯ । প্রকাশ ০০:০১। আপডেট ১০:৪০

মোহাম্মদ শিহাব : জাতীয় নির্বাচনের পর ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্বাচন পুরো জাতির কাছে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত। দলীয় প্রতীকে এ নির্বাচন হওয়ায় রাজনৈতিক কারণে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের গুরুত্ব এবার আরও কয়েকগুন বেড়ে গেছে। এর আগে ২০১৫ সালে দুই সিটিতে দলীয় মনোনয়ন থাকলেও প্রতীক দলীয় ছিল না। মাঝখানে উত্তরের মেয়র আনিসুল হকের মৃত্যুতে বছরখানেক আগে সেখানে উপনির্বাচন অবশ্য দলীয় প্রতীকেই অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে আওয়ামী লীগের মনোনিত প্রার্থী আতিকুল ইসলাম নৌকা প্রতীকে বিজয়ী হন। তবে এবারই প্রথম ঢাকার দুই সিটিতে রাজনৈতিক দলের প্রতীকে একসঙ্গে মেয়র নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এ নির্বাচনে কাউন্সিলর প্রার্থীদেরও দলীয় মনোনয়ন দেয়া হবে। কিন্তু তাদের জন্য প্রতীক স্বতন্ত্রই থাকছে। কাজেই নৌকা আর ধানের শীষ প্রতীকের এই যুদ্ধে নামতে সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থীদের দৌড়-ঝাপ চলছে সমানে। এছাড়া অন্য রাজনৈতিক দলগুলোও এই নির্বাচনে দলীয় মেয়র প্রার্থী চূড়ান্ত করতে উঠে পড়ে লেগেছে বলে জানা গেছে। নির্বাচন কমিশন (ইসি) ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, নতুন বছরের ৩০ জানুয়ারি ঢাকার দুই সিটিতে নির্বাচন। বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নির্বাচনটি আরও একটি কারণে গুরুত্বপূর্ণ। সেটি হলো- এবারই দুই সিটিতে সম্পূর্ণ ইভিএম বা ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে ভোটগ্রহণ হতে যাচ্ছে। এরই মধ্যে নির্বাচনের মনোনয়ন ফরম বিতরণ শুরু করেছে ইসি। মনোনয়নপত্র সংগ্রহ ও জমা দেয়া যাবে চলতি মাসের শেষদিন অর্থাত্ ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির কারণে দলীয় মনোয়ন ছাড়া ঢাকা সিটিতে মেয়র নির্বাচিত হওয়া সম্ভব নয়। সেটি সচেতন নাগরিক সমাজ ও প্রার্থীরা বেশ ভালো করেই উপলব্ধি করতে পারছেন। ফলে দলীয় মনোনয়ন পেতে এ মুহূর্তে মেয়র প্রার্থীদের দৌড়-ঝাপ পরিলক্ষিত হচ্ছে। দেশের সর্ববৃহত্ রাজনৈতিক দল তথা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ- বিএনপি’র মনোনয়ন পেতে মেয়র প্রার্থীদের এখন ঘুম হামার হয়ে গেছে।

আওয়ামী লীগ: রাজনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটিতে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বর্তমান মেয়র আতিকুল ইসলামই থাকছেন- এটা মোটামুটি নিশ্চিত। এরই মধ্যে তিনি দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। তবে দক্ষিণ সিটিতে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী পরিবর্তনের গুঞ্জন বেশ জোরে-সোরেই শোনা যাচ্ছে। সেই গুঞ্জনের পালে হাওয়া পেয়েছে ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস এমপি ও হাজী সেলিম এমপি- ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য মেয়র পদে দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করার পর। গতকাল বুধবার তারা এই মনোনয়ন ফরম কিনেছেন। দক্ষিণের বর্তমান মেয়র সাঈদ খোকন- আজ-কালের মধ্যে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করতে পারেন। সূত্রমতে, এবার ঢাকা দক্ষিণে যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মনির ছোট ছেলে ও আওয়ামী লীগ নেতা তাপসের মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। যদিও এ ব্যাপারে দলীয়প্রধান শেখ হাসিনাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিবেন। ফলে এ নিয়ে এ মুহূর্তে দলের কোনও শীর্ষনেতা কথা বলতে নারাজ।

২ সিটির মেয়র পদে মনোনয়ন নিলেন আ. লীগের ৮ জন: দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম বিক্রির প্রথম দিনে গতকাল বুধবার আট জন মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন। এর মধ্যে ডিএনসিসি মেয়র পদে চার জন ও ডিএসসিসি মেয়র পদে বাকি চার জন মনোনয়ন ফরম নিয়েছেন। ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ সভাপতির রাজনৈতিক কার্যালয় থেকে মনোনয়ন ফরম বিক্রি করা হয়। দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন উত্তর সিটি করপোরেশনটির বর্তমান মেয়র আতিকুল ইসলাম। তার পক্ষে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন ব্যক্তিগত সচিব সাইফুদ্দিন ইমন। একই সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে আরও মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশনের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শহীদুল্লাহ ওসমানী, ভাষানটেক থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মেজর (অব.) মো. ইয়াদ আলী ফকির এবং শহিদ পরিবারের সন্তান অধ্যাপক মো. জামান ভূঁইয়া।

অন্যদিকে, ডিএসসিসি মেয়র পদে মনোনয়ন নিয়েছেন আওয়ামী লীগের দুই সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস ও হাজী মো. সেলিম। ধানমন্ডি, মোহাম্মদপুর, হাজারীবাগ ও নিউমার্কেট থানার দলীয় নেতাকর্মী ও কমিশনারদের নিয়ে ফজলে নূর তাপসের মামা মাসুদ সেরনিয়াবাত তার মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেন। অন্যদিকে হাজী সেলিমের পক্ষে মহিউদ্দিন আহমেদ বেলাল সংগ্রহ করেন এই ফরম। এছাড়া শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদের উপদেষ্টা মো. নাজমুল হক এবং মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিলের সাবেক মহাসচিব এম এ রশিদও ঢাকা দক্ষিণ সিটির মেয়র পদে মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন।

আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয় থেকে এসব মনোনয়ন ফরম বিক্রি করা হয়ে‌ছে। বুধবার সকাল ১০টা থেকে শুরু হয় মনোনয়ন ফরম বিক্রির কার্যক্রম, চলে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। শুক্রবার (২৭ ডিসেম্বর) বিকেল ৫টা পর্যন্ত ফরম বিক্রি করা হবে এই কার্যালয় থেকে। শনিবার (২৮ ডিসেম্বর) আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের সভায় দলীয় প্রার্থী নির্ধারণ করা হবে।

 বিএনপি: মেয়র পদে মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু করেছে ক্ষমতার প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচিত ও দেশের অন্যতম বৃহত্ রাজনৈতিক দল বিএনপি-ও। অবশ্য দলটির একাধিক সূত্রে জানা গেছে, বিএনপির আগের মেয়র প্রার্থীরাই এবারও মনোনয়ন পাবেন- এটা মোটামুটি চূড়ান্ত। ২০১৫ সালের নির্বাচনে ঢাকা উত্তর সিটিতে বিএনপির মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল দলটির কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়ালকে। তিনি সাবেক ব্যবসায়ী নেতা ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল আউয়াল মিন্টুর ছেলে। আনিসুল হকের মৃত্যুতে মেয়র পদটি শূন্য হওয়ার পর চলতি বছরের শুরু দিকে অনুষ্ঠিত উপনির্বাচন বর্জন করেছিল বিএনপি। ফলে তখন তাবিথ আর প্রার্থী হননি। তবে আগামী ৩০ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছে। বিএনপির পক্ষ থেকে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সেটি এরই মধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন। এখন প্রার্থীর নাম ঘোষণা বাকি। দলটির একাধিক সূত্র বলছে, ঢাকা দক্ষিণে মনোনয়ন পাচ্ছেন অবিভক্ত ঢাকার সর্বশেষ মেয়র প্রয়াত সাদেক হোসেন খোকার ছেলে প্রকৌশলী ইশরাক হোসেন। যদিও এ নিয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি এখনও। দলটি দুই সিটিতে কাউন্সিলর প্রার্থী মনোনয়নেও ফরম বিক্রি শুরু করেছে বলে জানা গেছে।

জাপা: আওয়ামী লীগ ও বিএনপির পাশাপাশি আলোচনায় আসতে

জাতীয় পার্টিও (জাপা) বসে নেই। এরই মধ্যে দলটি এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘোষণা দিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে মেয়র প্রার্থীর নাম ঘোষণা দিয়েছে। একদিন আগে দলে যোগ দেয়া সাবেক সামরিক কর্মকর্তা কামরুল ইসলামই হচ্ছেন উত্তরে জাপার প্রার্থী। এমনটা দলীয় সূত্রে নিশ্চিত করেছে। আর দক্ষিণে জাপার প্রার্থী আজ বৃহস্পতিবার চূড়ান্ত করার কথা রয়েছে। জাপা চেয়ারম্যানের ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি খন্দকার দেলোয়ার জালালী গতকাল বুধবার উত্তরদক্ষিণকে জানান, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জাতীয় পার্টির সম্ভাব্য মেয়রপ্রার্থী অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম। দল থেকে সিনিয়র নেতাদের মধ্যে তেমন কেউ আগ্রহী না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত তাকে উত্তর সিটিতে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে মাঠে দেখা যেতে পারে। এর একদিন আগে তিনি বেশকিছু অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাদের নিয়ে জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন উল্লেখ করে জালালী বলেন, ‘কামরুল ইসলামের বাড়ি গোপালগঞ্জে’। ঢাকা উত্তর সিটি থেকে জাতীয় পার্টির সম্ভাব্য মেয়রপ্রার্থী হিসেবে বুধবার দুপুরে দলের বনানী কার্যালয়ে পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের কাছ থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন এই সাবেক সেনাকর্মকর্তা। এ সময় দলের মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা, প্রেসিডিয়াম সদস্য জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, সংসদ সদস্য সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা, সুনীল শুভরায়, এস এম ফয়সল চিশতী, শফিকুল ইসলাম সেন্টু, লেফট‌্যানেন্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এমপি, নাজমা আখতার এমপি উপস্থিত ছিলেন। দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা উত্তর সিটি নির্বাচনে বিভিন্ন ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে সম্ভাব্য প্রার্থীরাও মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন। মোহাম্মদপুর ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে আবারো কাউন্সিলর পদে নির্বাচন করতে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য শফিকুল ইসলাম সেন্টু। বিভিন্ন ওয়ার্ডে শতাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন বলে জানা গেছে দলীয় সূত্রে। তবে দক্ষিণ সিটি নির্বাচনে মনোনয়ন ফরম বিতরণ হবে আজ বৃহস্পতিবার। এদিন বেলা ১১টায় জাতীয় পার্টি কেন্দ্রীয় কার্যালয়, কাকরাইল অফিসে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জাতীয় পার্টির সম্ভাব্য মেয়র ও কাউন্সিলর পদে মনোনয়নপত্র বিতরণ করা হবে।

এছাড়া ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন থেকে ২০ জন কাউন্সিলর প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়ার কথা জানানো হলেও মেয়র পদে দলটি কাউকে মনোনয়ন দেয়নি। এছাড়া, বাম রাজনৈতিক দলগুলো দুই সিটিতেই মেয়র পদে প্রার্থী মনোনয়ন দিতে যাচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে সেই তালিকা এখনও প্রকাশ করা হয়নি। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জোর দিয়ে বলেছেন, ঢাকা সিটির এই নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ। নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ এবং অংশগ্রহণমূলক করতে কমিশনের সব ধরনের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে বলেও জানিয়েছেন সিইসি। রাজনৈতিক দলগুলোর নেতারা ও সচেতন নগরবাসীর প্রত্যাশাও সেটি। যদিও ইভিএম’র ব্যবহার নিয়ে বিএনপির ভিন্ন মত আছে। বিশ্লেষকদের মতে, এখন দেখার অপেক্ষা ঢাকা সিটির এই পরীক্ষায় ইসি কত নম্বর পেয়ে পাস করেন। রাজনৈতিক দলগুলো ও তাদের মনোনীত প্রার্থীদেরও গণতান্ত্রিক ভূমিকা দেখতে চান ভোটাররা। সেটি শেষ পর্যন্ত কতটা বাস্তব হয় এখন সেদিকেই দৃষ্টি রাজধানীসহ পুরোদেশবাসীর।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading