আইসিটি আইনের ২৫, ৩১ ধারা কেন অসাংবিধানিক নয়: হাইকোর্ট
উত্তরদক্ষিণ অনলাইন । ২৪ ফেব্রুয়ারী ২০২০ । আপডেট ১৮ঃ১০
ডিজিটাল নিরাপত্তা (আইসিটি) আইনের ২৫ এবং ৩১ ধারা কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছে হাইকোর্ট। সাংবাদিক, আইনজীবী ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকসহ ৯ ব্যক্তির করা রিটের শুনানি করে সোমবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি মো. মাহমুদ হাসান তালুকদারের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রুল দিয়েছে। আইন, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিবকে চার সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ইমরান এ সিদ্দিক ও আইনজীবী শিশির মনির। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিপুল বাঘমার। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৫, ২৮, ২৯ ও ৩১ ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে গত ১৯ জানুয়ারি হাইকোর্টে এ রিট আবেদনটি করা হয়।
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (একাংশের) মহাসচিব মোহাম্মদ আবদুল্লাহ, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আসাদ উদ্দিন, মো. আসাদুজ্জামান, মো. জোবাইদুর রহমান, মো. মহিউদ্দিন মোল্লা ও অ্যাডভোকেট মো. মুজাহিদুল ইসলাম শাহিন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইসমাইল, ড. মো. কামরুজ্জামান ও ড. মো. রফিকুল ইসলাম রিটের আবেদনকারী।
নানা পক্ষের আপত্তি, সাংবাদিকদের উদ্বেগের মধ্যে ২০১৮ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে পাস হয় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইনের ব্যাপক সমালোচিত ৫৭সহ কয়েকটি ধারা বাতিল করে নতুন ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন প্রণয়ন করা হলেও পুরনো আইনের বাতিল হওয়া ধারাগুলো নতুন আইনে রয়ে যাওয়ায় উদ্বেগ থেকেই গিয়েছিল। আইনটি পাসের আগে দুই দফায় সম্পাদক পরিষদ, টেলিভিশন মালিকদের সংগঠন অ্যাটকো, ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সঙ্গে বৈঠক করে সংসদীয় কমিটি। তবে তাতেও উদ্বেগ প্রশমিত হয়নি।
আইনজীবী শিশির মনির পরে সাংবাদিকদের বলেন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৫ ও ৩১ ধারায় যে অপরাধের কথা বলা আছে- তা সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত নয়। যেমন ২৫ ধারায় বলা আছে, কেউ ‘ভীতিকর’, ‘অসত্য’ অথবা ‘বিরক্তিকর’, ‘আক্রমণাত্মক’ তথ্য প্রকাশ করে…এখনে কোনটা ভীতিকর, কোনটা আক্রমাণাত্মক, কোনটা বিরক্তিকর তা সুনির্দিষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা নেই। ৩১ ধারায় বলা আছে ‘যদি আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটে’ অথবা যদি ‘অস্থিরতা তৈরি হয়’, এখন প্রশ্ন হলো অস্থিরতাটা কী, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি বলতে কী বোঝায়…এগুলোর কোনোটার সংজ্ঞা সুনির্দিষ্ট করা নেই এই আইনে। এই অস্পষ্টতার কারণে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যাকে ইচ্ছা তাকেই ধরতে পারবে।
আইনজীবী শিশির বলেন, সাংবিধানিক অধিক্ষেত্রের প্রেক্ষিতে এটাকে বলে ‘ডকট্রিন অব ভেগনেস’, অর্থাৎ যে সমস্ত আইনে দণ্ড উল্লেখ থাকে সেসব আইন এরকম অস্পষ্ট থাকতে পারবে না। তাছাড়া সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে মত প্রকাশের যে স্বাধীনতা দেওয়া আছে, তার সাথে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৫ ও ৩১ ধারা সাংঘর্ষিক। এ দুই যুক্তিতে ২৫ ও ৩১ ধারার বিষয়ে রুল জারি করেছেন আদালত।
আইনটির ২৫ ধারায় বলা হয়েছে-
‘(১) যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে-
(ক) ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে, এমন কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ করেন, যাহা আক্রমণাত্মক বা ভীতি প্রদর্শক অথবা মিথ্যা বলিয়া জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও, কোনো ব্যক্তিকে বিরক্ত, অপমান, অপদস্থ বা হেয় প্রতিপন্ন করিবার অভিপ্রায়ে কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ বা প্রচার করেন, বা
(খ) রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম ক্ষুণ্ণু করিবার, বা বিভ্রান্তি ছড়াইবার, বা তদুদ্দেশ্যে, অপপ্রচার বা মিথ্যা বলিয়া জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও, কোনো তথ্য সম্পূর্ণ বা আংশিক বিকৃত আকারে প্রকাশ, বা প্রচার করেন বা করিতে সহায়তা করেন,
তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।
(২) যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এর অধীন কোনো অপরাধ সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক ৩ (তিন) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ৩ (তিন) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।
(৩) যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এ উল্লিখিত অপরাধ দ্বিতীয় বার বা পুনঃপুন সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক ৫ (পাঁচ) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ১০ (দশ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।
৩১ ধারায় বলা হয়েছে-
(১) যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে ওয়েবসাইট বা ডিজিটাল বিন্যাসে এমন কিছু প্রকাশ বা সম্প্রচার করেন বা করান, যাহা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন শ্রেণি বা সম্প্রদায়ের মধ্যে শত্রুতা, ঘৃণা বা বিদ্বেষ সৃষ্টি করে বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে বা অস্থিরতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে অথবা আইন-শৃঙ্খলার অবনতি ঘটায় বা ঘটিবার উপক্রম হয়, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।
(২) যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এর অধীন কোনো অপরাধ সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক ৭ (সাত) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ৫ (পাঁচ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।
(৩) যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এ উল্লিখিত অপরাধ দ্বিতীয় বার বা পুনঃপুন সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক ১০ (দশ) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ১০ (দশ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।
রিটে ২৮, ২৯ ধারাও চ্যালেঞ্জ করা হয়েছিল, এ দুটি ধারার চ্যালেঞ্জ আদালত কেন গণ্য করেনি, এ প্রশ্নে আইনজীবী শিশির মনির বলেন, আমরা আদালতে বলেছিলাম, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৮, ২৯ ধারায় যে অপরাধের কথা উল্লেখ আছে, দণ্ডবিধিতে তার যে সাজা দেওয়া আছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে এসব অপরাধের সাজা বেশি দেওয়া হয়েছে।
তখন আদালত বললেন সংসদ চাইলে বেশি সাজা দিতে পারেন। কারণ ডিজিটাল মাধ্যমে যখন একটি খবর বা তথ্য প্রকাশ হয়, তখন তা সারা বিশ্বের কাছে উন্মুক্ত হয়ে যায়। এই যুক্তিতে আদালত এ দুই ধারায় রুল দেয়নি।

