শুভ জন্মদিন পিতা

শুভ জন্মদিন পিতা
মুজিব শতবর্ষ

উত্তরদক্ষিণ অনলাইন । ১৭ মার্চ ২০২০ । আপডেট ১২:৩০

হিল্লোল বাউলিয়া: বাংলা, বাঙালি, স্বাধীনতা ও বাংলাদেশ। এসবের অপর নাম- জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। লাল-সবুজের পতাকায় যার অম্লান প্রতিচ্ছবি চির ভাস্মর। তিনি ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন চিরকাল বাঙালির হূদয় মন্দিরে, মনিকোঠায়। তার জন্ম, জীবন আর বাংলাদেশের জন্ম, এগিয়ে চলা- এসব একাকার হয়ে আছে দেশপ্রেমিক বাঙালির কাছে। যতদিন বাংলাদেশ নামের এই স্বাধীন ভূ-খণ্ড বিশ্বের মানচিত্রে টিকে থাকবে ততদিন তিনি বেঁচে থাকবেন মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে। দিন যত যাচ্ছে তার অবদান, বীরত্ব, সৈর্য্য-বীর্যের ও মহত্বের কথা বাঙালির নতুন প্রজন্মসহ বিশ্ববাসী ততই জানার সুযোগ পাচ্ছেন। সেইসঙ্গে দেশে-বিদেশে তার আদর্শের অনুসারী বৃদ্ধি পাচ্ছে। বৃদ্ধি পাচ্ছে তার প্রতি মানুষের হূদয়ে ভালোবাসা, শ্রদ্ধাবোধ।

ক্ষণজন্মা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এই বাঙালির কথা বিশ্বনেতারা যতই জানার সুযোগ পাচ্ছেন ততই তার গুণকৃতনে পঞ্চমুখ হচ্ছেন। অনেকে ঈর্ষাণ্বিত হচ্ছেন বঙ্গবন্ধুর আকাশচুম্বি জনপ্রিয়তা ও গণমুখী নেতৃত্বের গুণাবলীর কারণে। একটি অবহেলিত, নির্যাতিত, শোষিত, নিষ্পেশিত, ভাগ্যাহত জাতিকে বঙ্গবন্ধু একক নেতৃত্বে জাগিয়ে তুলে ছিলেন মুক্তির মন্ত্রে। শুধু তাই নয়, রম্যকাহিনী হেমিলনের বাঁশিওয়ালার ন্যায় একটি জাতিকে তার জাদুকরী বক্তৃতার সম্মোহনী শক্তি দিয়ে বের করে এনে ছিলেন রাজপথে। বিনিময়ে জাতিকে তিনি উপহার দিয়ে গেছেন একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র, বাংলাদেশ।

শতবছর পূর্বে একটি অজপাড়া গাঁয়ে জন্ম নেয়া ‘খোকা’ ছেলেটি একদিন হয়ে উঠলেন ‘বঙ্গবন্ধু’। এখানেই শেষ নয়, তিনি পেয়েছেন জাতির পিতার স্বীকৃতি ও মর্যাদা। সঙ্গতকারণেই পৃথিবীর ইতিহাসে হাজার বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালির তোকমাটিও অর্জন করেছেন তিনি। তবে এ সবই তার অর্জন, কারো কৃপা নয়। জীবন বাজি রেখে আমৃত্যু তিনি যে বাঙালি জাতির মুক্তি ও সমৃদ্ধির জন্য লড়াই- সংগ্রাম করেছেন তার বিনিময়ে এসব স্বীকৃতি ও মর্যাদা তিনি পেছেন।

বাঙালি জাতিকে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তির পর তিনি তাদেরকে স্বপ্ন দেখিয়ে ছিলেন ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত সমৃদ্ধ সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠার। কিন্তু পিতার সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের আগে তিনি ঘাতকদের নির্মম বুলেটের আঘাতের শিকার হয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাত্র ৪ বছরের মধ্যে পৃথিবী থেকে লোকচক্ষুর অন্তরালে হারিয়ে যান। একইসঙ্গে সেদিন নরপিচাশদের নির্মমতার শিকার হন জতির পিতার পরিবারের ছোট্ট শিশু শেখ রাসেলসহ সবাই। অবশ্য বিদেশে থাকায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই কালোরাতের নিষ্ঠুরতা থেকে জীবনে রক্ষা পেয়েছেন জাতির পিতার স্নেহ ও মমতায় সিক্ত তার দুই কন্যা তথা আজকের ডিজিটাল ও উন্নত সমৃদ্ধ সোনার বাংলা বিনির্মাণের কারিগর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ছোট বোন শেখ রেহানা। জাতির পিতার সুযোগ্য জ্যেষ্ঠকন্যা শেখ হাসিনা পিতার অসমাপ্ত কাজ ও স্বপ্ন বাস্তবানে কাজ করে যাচ্ছেন। ছোট বোন শেখ রেহানা তাতে বড় বোনকে সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছেন। তাইতো জাতির পিতা লোকচক্ষুর অন্তরালে হারিয়ে গেলেও তিনি আজ ১৭ কোটি বাঙালির হূদয় মন্দিরে অমর হয়ে আছেন। তার আদর্শের অসংখ্য অনুসারীরা আজ তার জাতির পিতার স্বপ্ন বাস্তবায়নে তার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সহযোগিতা করছেন নিরলসভাবে।

জাতির পিতাকে হত্যার পর যারা তার অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত সোনার বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন ও আদর্শকে মুছে ফেলতে চেয়েছিল তারা আজ ইতিহাস থেকে নিশ্চিহ্ন হতে চলেছে। জাতির কাছে তারা ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়েছে। আর বঙ্গবন্ধুর আদর্শ তরুণ প্রজন্মের কাছে এক চিত্তাকর্ষক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে।

১৯২০ সালের আজকের এই দিনে বাঙালির আলোর দিশারী, মুক্তির দূত ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জন্ম নিয়ে ছিলেন। তার জন্ম না হলে বাঙালি জাতির মুক্তি হতো না। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের সৃষ্টি হতো না। তাইতো বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে প্রয়াত কবি শামসুর রাহমান লিখেছিলেন ‘ধন্য সেই পুরুষ’ কবিতা।

কবির ভাষায়, ধন্য সেই পুরুষ, নদীর সাঁতার পানি থেকে যে উঠে আসে

সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে;

ধন্য সেই পুরুষ, নীল পাহাড়ের চূড়া থেকে যে নেমে আসে

প্রজাপতিময় সবুজ গালিচার মতো উপত্যকায়;

ধন্য সেই পুরুষ, হৈমন্তিক বিল থেকে সে উঠে আসে

রঙ-বেরঙের পাখি ওড়াতে ওড়াতে।

ধন্য সেই পুরুষ, কাহাতের পর মই-দেয়া ক্ষেত থেকে যে ছুটে আসে

ফসলের স্বপ্ন দেখতে দেখতে…।

বঙ্গবন্ধু শুধু নিজেই স্বপ্ন দেখতে না। তিনি যে স্বপ্ন দেখতেন সেই স্বপ্ন ৭ কোটি বাঙালির হূদয় মাঝেও জাগিয়ে তুলে ছিলেন। তিনি যা বিশ্বাস করতে, তাই বলতেন এবং করতেন। বাঙালির মুক্তির মহানায়ক এ জন্য নিজের জীবনকে বিপন্ন করতেও পিছ পা হতেন না। সে কারণেই তিনি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ভাষা আন্দোলন ও বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলন ও লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে জীবেনর উল্লেখযোগ্য অংশ কারাগারে কাটিয়েছেন। কিন্তু জীবনে তিনি কোনো দিনও অন্যায়ের সঙ্গে আপষ করেননি, শোষকদের কাছে নতি স্বীকার করেননি। মাথা উঁচু করে সারা জীবন তিনি ন্যায়ের পথে, সত্যের পথে, শোষকের বিরুদ্ধে শাষিতের মুক্তির পক্ষে লড়াই করেছেন। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ আজ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষণের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে। তিনি ছিলেন মূলত একজন কথার জাদুকর ও কবি। তার প্রতিটি শব্দচয়ন, বাচনভঙ্গি বাঙালির হূদয়ে আলোরণ সৃষ্টি করেছিল। আজও তার বক্তৃতা বিশ্বের নির্যাতিত, শোষিত মানুষকে মুক্তির দিশা দিচ্ছে। তাইতো তিনি শুধু বাঙালির মুক্তির দূত নন, বিশ্বের মুক্তিকামী মানুষেরও অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছেন।

পিতার জন্মশতবার্ষিকী: স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মবার্ষিকী আজ, ১৭ মার্চ মঙ্গলবার। জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীকে স্মরণীয় ও বরণীয় করে রাখতে জাতির পিতার কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার এই বর্ষটিকে ‘মুজিববর্ষ’ হিসেবে পালন করার উদ্যোগ নিয়েছে। জাতির পিতার জন্মের আজকের এই মাহেন্দ্রক্ষণে শুরু হবে বছরব্যাপী সেই উদযান অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিকতা।

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, নির্যাতিত মানুষের মুক্তির দূত, বিংশ শতাব্দীর বিশ্বের অন্যতম অবিসংবিদত নেতা বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান আজ থেকে ঠিক একশ বছর পূর্বে গোপালগঞ্জের টুঙ্গীপাড়ায় ঐহিতাসিক শেখ পরিবারে রাত ৮টায় জন্ম নিয়ে ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর সেই জন্মক্ষণে আজ (১৭ মার্চ) রাত ৮টায় রাজধানীর ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আতশবাজীর মধ্য দিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীর ‘মুজিববর্ষ’ কর্মসূচির উদ্বোধন করা হবে। জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী উদযাপনে বছরব্যাপী অনুষ্ঠান মালার মধ্যে থাকছে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিবস ঘিরে কর্মসূচির পাশাপাশি পুরো বছরে বিভিন্ন আয়োজন। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির পিতার শততম জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন।

ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ তদানীন্তন ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়ায় পিতা শেখ লুত্ফর রহমান এবং মাতা সায়েরা খাতুনের ঘর আলোকিত করে জন্মগ্রহণ করেন শেখ মুজিবুর রহমান। চার বোন এবং দুই ভাইয়ের মধ্যে শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন তৃতীয়। জাতির পিতার ভূ-প্রিষ্ঠে এই আগমন উপলক্ষে পিতার প্রতি উত্তরদক্ষিণ পরিবারের পক্ষ থেকে বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি, শুভ জন্মদিন পিতা।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading