দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের দায়িত্ববান আচরণ কাম্য
উত্তরদক্ষিণ অনলাইন । ২১ মার্চ ২০২০ । আপডেট ২২:৫০
হানজালা শিহাব: নভেলা করোনাভাইরাসে পৃথিবী বিপর্যস্ত। জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির মধ্যে। বিশ্ব অর্থনীতি হুমকির মুখে। মানুষের দৈনন্দিন কাজ-কর্মে পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও সংকোচন করা হচ্ছে। বদলে গেছে পৃথিবীর যোগাযোগ ও সম্পর্কের রীতি-নীতি। ধর্মীয় কিংবা সামাজিক, কোনো নিয়ম এখন মানা হচ্ছে না। আতঙ্ক বা সতর্কতা অবলম্ব করতে গিয়ে এই পরিবর্তন সারা দুনিয়ায়। কারণ, মহামারি আকারে পৃথিবীর অন্তত ১৬০টি দেশে ছড়িয়ে পড়া নভেলা করোনাভাইরাস বা কভিড-১৯ রোগের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে চায় সবাই। এজন্য স্বাস্থ্য বিজ্ঞানী ও গবেষক তথা চিকিৎসকদের দেয়া পরামর্শ মেনে চলতে সর্ব সাধারণকে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে সর্বোত্র। এরই মধ্যে করোনায় আক্রান্ত ১৬০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশও যুক্ত হয়েছে। শুধু আক্রান্তই নয়, সর্বশেষ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে শনিবার (২১ মার্চ) পর্যন্ত কভিড-১৯ রোগে কমপক্ষে দুজনের মৃত্যু হয়েছে, আক্রান্ত সংখ্যা অন্তত ২৪ জন। অবশ্য ৩ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১৯ জন।
এছাড়াও কয়েক হাজার আছেন প্রাতিষ্ঠানিক বা হোম কোয়ারেন্টাইন ও সাইসোলেশনে। সামনের দিনে পরিস্থিতির যে আরও অবনতি হতে পারে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পরিস্থিতি উপলব্ধি করে সরকার জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানমালায় অনেক ছাটকাট করেছে। দেশের ইতিহাসে সম্ভবত এবার প্রথম ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের সব অনুষ্ঠান বাতিল করার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এর আগে ৩১ মার্চ পর্যন্ত দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়। বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ১০টি রুটে উড়োজাহাজ চলাচল। সেইসঙ্গে দেশের সব পর্যটন কেন্দ্র, বিনোদন কেন্দ্র, প্রেক্ষাগৃহ, পার্ক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। এরই মধ্যে দেশের একটি উপজেলা লকডাইন করা হয়েছে। রাজধানী ঢাকাকে লকডাইন বা সারাদেশে জরুরি অবস্থা জারির বিষয়টিও সামনে এসেছে। কিন্তু সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে যখন এসব সতর্কতামূলক ব্যবস্থার সিদ্ধান্ত ও ঘোষণা আসছে, ঠিক একই সময় রাষ্ট্র ও সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কতিপয় ব্যক্তির আচরণ নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
ইসির কর্মকাণ্ড: জনগণের জীবন যখন ঝুঁকির মধ্যে তখন নির্বাচনের সিদ্ধান্তে অনঢ় থেকে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠান- নির্বাচন কমিশন (ইসি)। শনিবার ঢাকা-১০ আসনসহ তিনটি সংসদীয় আসনে ভোটগ্রহণ করা হয়েছে নানা সমালোচনা উপেক্ষা করে। বিশেষ করে ঢাকা-১০ আসনে ভোটগ্রহণ করা হয় ইভিএমে, যা নভেলা করোনাভাইরাস ছড়ানোর অন্যতম হাতিয়ার হতে পারে বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু ভোট স্থগিত করা হয়নি। শেষ পর্যন্ত দেখা গেছে এই নির্বাচনে মাত্র ৫ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন। এই ফল কতটা গ্রহণযোগ্য হবে- তা নিয়ে প্রশ্ন উঠা অস্বাভাবিক নয়। অবশ্য শনিবার তিনটি আসনে উপনির্বাচনের পর ২৯ মার্চে পূর্বঘোষিত চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনসহ দুটি সংসদীয় আসনের উপনির্বাচন স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নেই ইসি। ২৯ তারিখের নির্বাচন স্থগিত করায় সংশ্লিষ্ট এলাকার ভোটারসহ দেশবাসীর মধ্যে এক ধরনের স্বস্থি ফিরে এসেছে। যদিও এ সিদ্ধান্ত আরও আগে নিতে পারতো নির্বাচন কমিশন। এবং ২১ মার্চ তড়িঘড়ি করে তিনটি আসনে উপনির্বাচন না করলেও বড় ধরনের কোনো সমস্যা হতো না।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলন: স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক শনিবার দুপুরে ঢাকার মহাখালীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে কভিড-১৯ মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় কমিটির বৈঠকের পর জনাকীর্ণ এক সংবাদ সম্মেলন করেন। এ নিয়ে নতুন প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ থেকে বাঁচতে দূরত্ব বজায় রাখা, জনসমাগম না করা, হাঁচি-কাশি শিষ্টাচার মেনে চলাসহ নানা পরামর্শ যখন সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে দেওয়া হচ্ছে, তখন বিশাল কর্মীবাহিনী নিয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক নিজেরই সংবাদ সম্মেলন করা কতটা যৌক্তিক বা গ্রহণযোগ্য? এমন প্রশ্ন উঠেছে বিভিন্ন মহলে।
এদিকে, বৈশ্বিক মহামারীতে রূপ নেওয়া কভিড-১৯ রোগ বাংলাদেশে সংক্রমিত হওয়ায় সর্বশেষ পরিস্থিতি এবং সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ নিয়ে প্রতিদিনই সাংবাদিকদের মুখোমুখি হচ্ছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। যার ধারাবাহিকতায় শনিবার দুপুরে ঢাকার মহাখালীর স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে কভিড-১৯ মোকাবেলায় গঠিত জাতীয় কমিটির বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলনে আসেন তিনি। এ সময় তার দুপাশে স্বাস্থ্য, স্বরাষ্ট্র ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সচিব, চিকিৎসক নেতাসহ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাশাপাশি অন্যান্য দপ্তরের কর্মকর্তারা ও বিপুল সংখ্য সংবাদকর্মী উপস্থিত ছিলেন। দুপুর ১টায় সংবাদ সম্মেলনের সময় নির্ধারিত ছিল। এজন্য বিভিন্ন গণমাধ্যমের শতাধিক কর্মীও সম্মেলন কক্ষের বাইরে অবস্থান নেন। তবে সংবাদ সম্মেলন শুরু হয় দুপুর সোয়া ২টায়।
সংবাদ সম্মেলন শুরু হলে সংবাদকর্মীরা সম্মেলন কক্ষে ঢুকলে ভিড় বেড়ে যায় সেখানে। অনেকে গাদাগাদি করে কক্ষে দাঁড়িয়ে থাকেন। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পেছনেই গাদাগাদি করে দাঁড়িয়েছিলেন অন্তত ৩৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। জনসমাগম এড়িয়ে চলার পরামর্শের মধ্যে এভাবে সংবাদ সম্মেলন আয়োজন কতটা যৌক্তিক এবং তা অনলাইনে করা যায় কি না- সাংবাদিকরা সে প্রশ্ন রাখেন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে। তখন তিনি বলেন, যুদ্ধাবস্থা যখন থাকে, তখন কিন্তু সব সিস্টেম মেনে চলা সম্ভব হয় না। আমরা বুঝি, আপনারাও বোঝেন আমাদের সবারই নিরাপত্তার দরকার আছে। তারপরও দেশের তাগিদে, দেশের মানুষের তাগিদে কাজ করতে হয়। আজকে ছুটির দিন আপনারা কষ্ট করে এসেছেন, আমাদের সব কর্মীরাও এসেছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, এটা যেন আরও সংক্ষিপ্ত আকারে করা যায়, সে চেষ্টা করা হবে। আইসিটির সহায়তা নিয়ে কিভাবে করা যায়, যাতে এত লোকের সমাগম লাগবে না সে চেষ্টাও আমরা অবশ্যই করব। স্বাস্থ্যমন্ত্রী এর আগে ঢাকা শিশু হাসপাতালে জনসমাগম ঘটিয়ে একটি অনুষ্ঠান করেও সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন।
নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের প্রেক্ষাপটে শুক্রবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদ্রোস আধানম গ্যাব্রিয়েসাস প্রেস ব্রিফিং করেছিলেন অনলাইনে। এই পরিস্থিতিতে তথ্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে দৈনন্দিন কার্যক্রম কিভাবে পরিচালনা করা যায়, সে বিষয়ে শুক্রবার সংবাদ সম্মেলনটি ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে করেছেন তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। গবেষণা সংস্থা সিপিডি শনিবার (২১ মার্চ) তাদের সংবাদ সম্মেলন করেছে ভার্চুয়ালি; ফেসবুক লাইভের মাধ্যমে। একইভাবে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো ভার্চুয়াল মাধ্যমে তথ্য প্রদান করলে সবার জন্য সেটিই হবে প্রত্যাশিত, ইতিবাচক ও কাঙ্খিত। সবার নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগসহ সরকারি ও বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানকে এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত বলেই মত দিয়েছেন সচেতন মহল।
কামরানের কাণ্ড: এর আগে সিলেটের সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগের নেতা বদরুদ্দীন কামরান ব্রিটেন থেকে ফিরে জনসমাবেশে উপস্থিত হন। এমনকি ১৭ মার্চে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে দলের অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে দেখা যায় তাকে। যেই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী নিজেও উপস্থিত ছিলেন। কামরানের ভাষ্য, তিনি পুরোপুরি সুস্থ। তার শরীরে করোনারভাইরাস নেই। বিমানবন্দর থেকে তাকে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে বলা হয়নি। অথচ গত ১৪ মার্চ মন্ত্রিসভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, যে কেউ বিদেশে থেকে আসলে তাকে বাধ্যতামূলক ১৪ দিন হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হবে। যদি কেউ এই নির্দেশ অমাণ্য করে তাকে অর্থদণ্ড বা জেল কিংবা উভয় দণ্ড দেয়া যাবে। মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অমাণ্য করায় দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রবাসীদের অর্থদণ্ডও দেয়া হয়েছে। কিন্তু কামরানের মতো একজন নেতা ও জনপ্রতিনিধির ভাষ্য, তাকে এয়ারপোর্ট থেকে বাসায় থাকতে বলা হয়নি। দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কাছ থেকে এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন কথাবার্তা জাতি আশা করে না বলেই মত বিশ্লেষকদের। অবশ্য তিনি ৩/৪দিন প্রকাশ্যে ঘোরাঘুরির পর গণমাধ্যমের চাপে পড়ে শেষ পর্যন্ত ১৯ মার্চ থেকে হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকার ঘোষণা দিয়েছেন। অবশ্য তিনি সেই নিয়ম আদৌ মানছেন কিনা এখন তা পরে আর জানা সম্ভব হয়নি।
কারো একটি ভুলের কারণে যদি পুরো জাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, সেই দায় কে নেবে? তাও যদি হয় দায়িত্বশীল পর্যায়ের কোনো ব্যক্তির কারণে, তাহলে জাতির কাছে তার কী জবাব থাকবে? সুতরাং কোনো রাজনীতি নয়, শোডাইন বা লোক দেখানো কর্মকাণ্ড নয়। এসব বাদ দিয়ে প্রকৃতভাবে যাতে জনগণের কল্যাণ ও উপকার হয় এমন আচরণ দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের থেকে এ মুহূর্তে জাতির একমাত্র কাম্য।

