আগামীকাল ভয়াল ২৫ মার্চ
উত্তরদক্ষিণ অনলাইন । ২৪ মার্চ ২০২০ । আপডেট ২১:৩৫
আগামীকাল ভয়াল ২৫ মার্চ। ১৯৭১ সালের এইদিনে মধ্যরাতে বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের পূর্ব পরিকল্পিত অপারেশন সার্চ লাইটের নীলনকশা অনুযায়ী বাঙালিদের কণ্ঠ চিরতরে স্তব্ধ করে দেয়ার ঘৃণ্য লক্ষ্যে রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর অত্যাধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। দিনটি উপলক্ষে প্রতিবছর ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হলেও করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারনে এবার সকল কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে।
মার্কিন সাংবাদিক রবার্ট পেইন ২৫ মার্চ রাত সম্পর্কে লিখেছেন, ‘সে রাতে ৭০০০ মানুষকে হত্যা করা হয়, গ্রেফতার হলো আরো ৩০০০ লোক। ঢাকায় ঘটনার শুরু মাত্র হয়েছিল। সমস্ত পূর্ব পাকিস্তান জুড়ে সৈন্যরা বাড়িয়ে চললো মৃতের সংখ্যা। জ্বালাতে শুরু করলো ঘর-বাড়ি, দোকান-পাট লুট আর ধ্বংস তাদের নেশায় পরিণত হলো যেন। রাস্তায় রাস্তায় পড়ে থাকা মৃতদেহগুলো কাক-শেয়ালের খাবারে পরিণত হলো। সমস্ত বাংলাদেশ হয়ে উঠলো শকুন তাড়িত শ্মশান ভূমি।’
পাইকারি এই গণহত্যার স্বীকৃতি খোদ পাকিস্তান সরকার প্রকাশিত দলিলেও রয়েছে। পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্কট সম্পর্কে যে শ্বেতপত্র পাকিস্তানি সরকার মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রকাশ করেছিল, তাতে বলা হয় : ‘১৯৭১ সালের পয়লা মার্চ থেকে ২৫ মার্চ রাত পর্যন্ত এক লাখেরও বেশি মানুষের জীবননাশ হয়েছিল।’
১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে জয়লাভ করা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগের কাছে পাকিস্তানি জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তর না করার ফলে সৃষ্ট রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনের প্রক্রিয়া চলাকালে পাকিস্তানি সেনারা কুখ্যাত ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নাম দিয়ে নিরীহ বাঙালি বেসামরিক লোকজনের ওপর গণহত্যা শুরু করে। তাদের এ অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল আওয়ামী লীগসহ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতা-কর্মীসহ সকল সচেতন নাগরিককে নির্বিচারে হত্যা করা।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান এবং লেফটেন্যান্ট জেনারেল এএকে নিয়াজীর জনসংযোগ অফিসারের দায়িত্বে থাকা সিদ্দিক সালিক-এর ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ গ্রন্থেও এ সংক্রান্ত একটি বিবরণ পাওয়া যায়। সিদ্দিক সালিক বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় জেনারেল নিয়াজীর পাশেই ছিলেন। বাংলাদেশের মানুষের বিরুদ্ধে অনুগত পাকিস্তানি হিসাবে পাক সামরিক জান্তার চক্রান্ত তিনি খুব কাছে থেকেই দেখেছেন। ২৫ মার্চ, অপারেশন সার্চ লাইট শুরুর মুহূর্ত নিয়ে তিনি লিখেন “এভাবে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই সামরিক কার্যক্রম শুরু হয়ে যায়। এমন আঘাত হানার নির্ধারিত মুহূর্ত (এইচ-আওয়ার) পর্যন্ত স্থির থাকার চিহ্ন বিলুপ্ত হয়ে গেল। নরকের দরজা উন্মুক্ত হয়ে গেল।”
পাকিস্তানি হায়েনাদের কাছ থেকে রক্ষা পায়নি রোকেয়া হলের ছাত্রীরাও। ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব ও জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য, ড. মনিরুজ্জামানসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের ৯ জন শিক্ষককে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। ঢাবির জগন্নাথ হলে চলে নৃশংসতম হত্যার সবচেয়ে বড় ঘটনাটি। এখানে হত্যাযজ্ঞ চলে রাত থেকে সকাল পর্যন্ত।
বিশিষ্ট নজরুল গবেষক ও বাংলা একাডেমীর সাবেক পরিচালক অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম থাকতেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নীলক্ষেত আবাসনের ২৪নং বাড়িতে। ওই বাড়ির নিচে দুপায়ে গুলিবিদ্ধ দুই মা তাদের শিশু সন্তানকে নিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সিঁড়ি ভেসে যাচ্ছিল তাদের রক্তে। পাক হানাদাররা ভেবেছিল অন্য কোন দল হয়ত অপারেশন শেষ করে গেছে। তাই তারা আর ওই বাড়িতে ঢোকেনি। অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম তখন প্রাণে বেঁচে যান।
সেই সময়ের স্মৃতিচারণ করে অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম আরো বলেন, তাদের বাড়ির নিচে আর একজন অবাঙালি অধ্যাপক থাকলেও তিনি ২৫ মার্চের আগে কাউকে না জানিয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে যান। শুধু তাই নয়- বিশ্ববিদ্যালয় আবাসিক এলাকার সব অবাঙালি পরিবার তাই করেছিলেন। এ থেকেই ধারণা করা যায়- ২৫ মার্চের এই হত্যাযজ্ঞের পূর্বাভাস অবাঙালিরা জানতো।
প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান অপারেশন সার্চ লাইট পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সকল পদক্ষেপ চূড়ান্ত করে গোপনে ঢাকা ত্যাগ করে করাচি চলে যান। সেনা অভিযানের শুরুতেই হানাদার বাহিনী বাঙালি জাতির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে তাঁর ধানমন্ডির বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের আগে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং যে কোন মূল্যে শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহবান জানান।
বঙ্গবন্ধুর এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে বাঙালি পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং দীর্ঘ ৯ মাস সশস্ত্র লড়াই শেষে একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর পূর্ণ বিজয় অর্জন করে। বিশ্বের মানচিত্রে অভ্যুদয় ঘটে নতুন রাষ্ট্র বাংলাদেশের। বাসস
করোনায় সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পাশে ‘উৎসর্গ’
উত্তরদক্ষিণ অনলাইন । ২৪ মার্চ ২০২০ । আপডেট ১৭:৪৫
সারা বিশ্বে এখন করোনাভাইরাস (কভিড-১৯) এক মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশেও করোনার আক্রমণ হয়েছে। এরই মধ্যে দেশে কভিড-১৯ রোগে আক্রান্ত হয়েছেন সরকারি হিসাবে ৩৯ জন, যাদের মধ্যে মারা গেছেন ৪ জন। এছাড়াও করোনার উপসর্গ নিয়ে অন্তত ৪ জন মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। যাদের করোনা পরীক্ষা করার আগেই মৃত্যু হয়।
করোনাভাইরাস থেকে জীবন রক্ষায় সাবান দিয়ে হাত ধোয়া ও হ্যান্ডস্যানিটাইজার ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পক্ষে যেখানে নিয়মিত খাবার সংগ্রহ করতে গিয়ে হিমশিত খেতে হয়, সেখানে তাদের পক্ষে সাবান কেনা বা হ্যান্ডস্যানিটাইজার ব্যবহার অকল্পনীয় ব্যাপার। তাছাড়া পরিস্থিতি জটিল হওয়ায় সরকারের পক্ষ থেকে পর্যান্ত পরিমাণ সরবরহ করা সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি করোনা নিয়ন্ত্রণে সেবামূলক কাজে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, তথ্য সংগ্রহে নিয়োজিত সাংবাদিক এবং করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসায় যারা জড়িত- সেই চিকিৎসক-নার্সরাও অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতাল থেকে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার উপকরণ পাচ্ছেন না। সেই সঙ্গে পরিবহন শ্রমিকরাও রয়েছেন স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে।
এমন প্রেক্ষাপটে করোনাভাইরাসের বিস্তররোধে সমাজের সুবিধাবঞ্চিতসহ মানবসেবায় নিয়োজিত বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে ‘উৎসর্গ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ’। করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষিত থাকার জন্য সামাজিক সচেতনতার পাশাপাশি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সাংবাদিক ও আইনশৃংখলা বাহিনীর সদস্যসরা ক্লান্তিহীন সেবা দিয়ে যাচ্ছেন আমাদের জন্য। এই মানবিক মানুষগুলোর সুরক্ষার জন্য উৎসর্গ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ নিজস্ব অর্থায়নে বিনামূল্যে বিতরণের জন্য প্রস্তুত করছে ৫০০০ হ্যান্ডস্যানিটাইজার।
সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইমরুল কায়েস বলেন, এই সংকটময় মুহূর্তে মানুষের মাঝে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। আমরা আমাদের অবস্থান থেকে চেষ্টা করছি সমাজের বিভিন্ন পেশার মানুষ ও নিম্ন আয়ের মানুষ, পথশিশু, বস্তিবাসীদের পাশে দাঁড়ানোর। তিনি বলেন, আমরা ঢাকা ও বিভিন্ন জেলাসমূহে কয়েক হাজার মানুষকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করছি। উৎসর্গ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। সংগঠনটি দেশের ৫৫ জেলায় প্রায় ৩৫ হাজার স্বেচ্ছাসেবক স্বেচ্ছায় রক্তদান, মাদকবিরোধী সচেতনতা, ছিন্নমূল শিশুদের স্বাস্থ্য ও শিক্ষা এবং বাল্যবিবাহরোধসহ বিভিন্নভাবে বিগত চারবছর যাবৎ নিরলসভাবে সেচ্ছাসেবা দিয়ে আসছে। করোনাভাইরাস প্রতিরোধেও সামাজিক সেই দায়িত্ববোধ থেকে সামর্থানুযায়ী মানুষের কল্যাণে এগিয়ে এসেছে প্রতিষ্ঠানটি।

