বটমূলে ছায়ানট নেই, চারুকলার শোভাযাত্রা নেই..
উত্তরদক্ষিণ ১৩ এপ্রিল ২০২০ । ২৩ঃ১৮
চৈত্রের শেষে প্রকৃতি তার সব রং নিয়ে হাজির হলেও বৈশ্বিক মহামারীতে রূপ নেওয়া নভেল করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বর্ণহীন হয়ে পড়েছে বাঙালির সার্বজনীন উৎসব পহেলা বৈশাখ উদযাপনেও করোনা ভাইরাসের থাবা বসেছে। সব আয়োজন বাতিল।
ঐতিহ্যবাহী মঙ্গল শোভাযাত্রা বাতিল।
ছায়ানটের বর্ষবরণও হচ্ছে না।
সব কিছুই যেন বর্ণহীন।

সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে বাতিল করা হয়েছে বর্ষবরণের সব আনুষ্ঠানিকতা এক্স আয়োজন। বিকল্প মাধ্যমে নববর্ষের ঐতিহ্য অনুযায়ী ভিন্ন মাত্রায় উতসবের আমেজ আর মানুষের মাঝে অভয় দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
পহেলা বৈশাখের নতুন সূর্যোদয়ের সাথে সাথে রমনার বটমূলে প্রভাতী আয়োজনের মাধ্যমে বর্ষবরণের সকাল শুরু করা বাঙালির নিজস্ব সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠেছে।
রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণও হচ্ছে না

১৯৬৭ সাল থেকে এ আয়োজন করে আসছে ছায়ানট। ১৯৭১ সাল মুক্তিযুদ্ধের বছর ছাড়া প্রতিবছরই এই পরিবেশনা হয়েছে। দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের হার বাড়তে থাকায় অনুষ্ঠান বাতিলের কথা জানিয়েছে ছায়ানট। তবে ভিন্ন পরিস্থিতিতে টেলিভিশন চ্যানেল ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সীমিতভাবে বৈশাখী আয়োজনের কথা জানিয়েছেন ছায়ানটের সভাপতি সনজিদা খাতুন।
শনিবার এক বিবৃতিতে সঞ্জিদা খাতুন বলেন, “বর্তমান মহামারীতে বিশ্বজুড়ে অগণিত মানুষের জীবনাবসান ও জীবন শঙ্কার ক্রান্তিলগ্নে ছায়ানট তাই ‘উৎসব নয়, সময় এখন দুর্যোগ প্রতিরোধের’ এই অঙ্গীকার নিয়ে সীমিত আকারে নববর্ষ পালনের উদ্যোগ নিয়েছে।’’ এবারের অনুষ্ঠানের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ দুর্গত মানুষ, বিশেষ করে বিপদগ্রস্ত শিল্পীদের দেওয়া হবে বলে জানান তিনি।

ছায়ানটের বিকল্প আয়োজন
অবরুদ্ধ সময়ে মানুষকে সাহস যোগাতে পারে, এমন সব গান নিয়ে থাকবে ছায়ানটের এবারের বিকল্প উপস্থাপনা।
পহেলা বৈশাখে সকাল ৭টা থেকে অনুষ্ঠানগুলো বিটিভিসহ ছায়ানটের ওয়েবসাইট ও ফেইসবুক পেইজে সম্প্রচার করা হবে। অনুষ্ঠান শেষে ছায়ানটের সভাপতি সনজিদা খাতুন এবারের নববর্ষের পটভূমিতে বক্তব্য রাখবেন।
ইউনেস্কো স্বীকৃত
চারুকলার ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ এবার বাতিল
বাঙালির বর্ষবরণের অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা। বৈশাখের প্রথম দিন ঢাকার রাস্তায় মুখোশ, ফানুসসহ নানা শিল্পকর্মে নিজস্ব সংস্কৃতির বার্তায় আঁধার তাড়ানোর মঙ্গল আয়োজনে ভিড় নামে সর্বস্তরের মানুষের।

১৯৮৯ সালে স্বৈরাচারবিরোধী ভাবমূর্তি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে শুরু হয় এই আনন্দ শোভাযাত্রা, যা ১৯৯৬ সালে পরিচিতি পায় ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামে।
সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের নানা অনুষঙ্গ মেশানো মঙ্গল শোভাযাত্রা এখন ইউনেস্কোর ‘ইনটেনজিবল হেরিটেজ’ এর অংশ।
গত তিন দশকে নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও নিরবচ্ছিন্নভাবে এই আয়োজন হয়েছে মঙ্গল কামনা ও শুভবোধ জাগ্রত করার বার্তায়।
এবার পরিকল্পনা থাকলেও সেই ধারাবাহিকতায় দাড়ি ফেলেছে নভেল করোনাভাইরাস। ফলে চৈত্রের শেষ দিকে চারুকলায় বর্ষবরণ প্রস্তুতির যে ব্যস্ততা থাকে, এবার আর তা দেখা যায়নি।
চারুকলা’র ভিন্ন আয়োজন
বে বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে ভয় জয়ের আহ্বান জানিয়ে মঙ্গল শোভাযাত্রার পোস্টার তুলে ধরছেন আয়োজকরা। চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, “পোস্টারে প্রতিবছরই একটি থিম থাকে, থিমটাকে ধরে পোস্টারটা করা হয়। এই বছরও আমরা পোস্টারটা রেখেছি। পোস্টারটি প্রিন্ট করা সম্ভব না, সব দোকান বন্ধ। এ কারণে সফট কপিটা সব জায়গায় দিচ্ছি। পোস্টারে এই বছরের বার্তাটিও দিচ্ছি আমরা।”

কালো রংয়ের পোস্টারে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ‘দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’ উপন্যাসের সংলাপ ‘মানুষ ধ্বংস হতে পারে, কিন্তু পরাজিত হয় না’ স্লোগান তুলে ধরা হয়েছে।
আর এবারের প্রতিপাদ্য করা হয়েছে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘মুক্ত করো ভয়, আপনা মাঝে শক্তি ধরো, নিজেরে করো জয়’ পঙক্তিকে।
নতুন বছরটি যেন মঙ্গলময় হয়- সেই চিন্তা থেকেই মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রস্তুতি শুরু হলেও করোনাভাইরাসের কারণে বিশেষ পরিস্থিতিতে এবার সবাইকে পরস্পর থেকে দূরত্বে থাকার পরামর্শ দিয়েছেন অধ্যাপক নিসার হোসেন।
“আমাদের একসাথে মিলিত হওয়া যাবে না, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। এটা ছাড়া মানুষকে বাঁচানো যাবে না, পৃথিবীকে রক্ষা করা যাবে না।”
মানুষ বেঁচে থাকলে আগামীতে নতুন উদ্যমে বর্ষবরণ করা যাবে মন্তব্য করে সবাইকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং সরকারের নির্দেশনাগুলো মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন নিসার হোসেন।
এই অধ্যাপক বলেন, “আমাদের পোস্টারের মাঝে একটা কথা আছে, আপনা মাঝে শক্তি ধরো, নিজেরে করো জয়। সুতরাং কোনো অলৌকিক বিশ্বাসের ওপর বসে আমরা রাস্তায় বেরিয়ে যাব না বা একসাথে জমায়েত হব না। যেভাবে লকডাউনে জীবনযাপন করতে বলা হচ্ছে, সেভাবে জীবনযাপন করতে হবে। এটি না পারলে নিজে তো বিলীন হবই, গোটা মানবজাতিকে বিলীনের ব্যবস্থা করে দেব।”
সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল আয়োজন
এদিকে এবার প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী ডিজিটাল পদ্ধতিতে পহেলা বৈশাখ উদযাপনের ব্যবস্থা নিয়েছে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ও। ১লা বৈশাখের দিন সকাল সাড়ে ৮টা থেকে সব সরকারি-বেসরকারি সব টেলিভিশনে বৈশাখের অনুষ্ঠান একযোগে সম্প্রচার করা হবে বলে মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ তথ্য কর্মকর্তা ফয়সল হাসান জানিয়েছেন।
উত্তরদক্ষিণ/বিডিনিউজ২৪

