সারাদেশে দ্রুতই বাড়ছে সংক্রমণ, চিকিৎসা সুবিধা অপ্রতুল

সারাদেশে দ্রুতই বাড়ছে সংক্রমণ, চিকিৎসা সুবিধা অপ্রতুল

উত্তরদক্ষিণ ২২ এপ্রিল ২০২০ । ১০:০০

হিল্লোল বাউলিয়া: বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও করোনা এখন মহামারি রূপ নিয়েছে। দ্রুতই বাড়ছে কভিড-১৯ সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা। ৮ মার্চ দেশে প্রথম কভিড-১৯ রোগী শনাক্ত হওয়ার পর আক্রান্তের সংখ্যা হাজারে পৌঁছে ৩৮ দিনে। সেটি ২ হাজারে পৌঁছায় মাত্র ৪ দিনে। আর ৩ হাজার ছাড়ালো পরবর্তী ৩ দিনে।

অপরদিকে, দেশে করোনায় প্রথম একজনের মৃত্যু হয় ১৮ মার্চ। অর্থাৎ শনাক্ত হওয়ার ১০দিন পর। এই সংখ্যা দশের কোটা পার হতে সময় লাগে ২০ দিন। অর্থাৎ ৬ এপ্রিল মৃত্যু সংখ্যা দাঁড়ায় ১২ জনে। আর শতকের ঘর পার হয় পরবর্তী ১৪ দিনে। এখন প্রতিদিনই গড়ে প্রায় ১০ জন করে মৃত্যুর সংখ্যা যোগ হচ্ছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশেই কেবল মৃত্যুর চেয়ে সুস্থ হওয়া রোগীর সংখ্যা কম।

মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সবশেষ প্রকাশিত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট মৃত্যু হয়েছে ১১০ জন। আর সুস্থ হওয়ার সংখ্যা ৮৭ জন। এ পর্যন্ত মোট আক্রান্ত ৩ হাজার ৩৮২ জন। আক্রান্ত ও মৃত্যুর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রাজধানী ঢাকা ও এর আশপাশের জেলাগুলোতে হলেও এরই মধ্যে অন্তত ৫৪টি জেলায় ছড়িয়েছে করোনার সংক্রমণ। নতুন আক্রান্ত ও মৃত্যুর এই সংখ্যা ঢাকায় যেমন বাড়ছে, একই সঙ্গে সমানভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে অন্য জেলাগুলোতেও। তাছাড়া ভালো থাকা জেলাগুলোও ঝুঁকি মুক্ত নয়।

এমন পরিস্থিতিতে করোনা চিকিৎসা নিয়ে নানা বিতর্ক আছে। এর মধ্যে রাজধানীর কয়েকটি হাসপাতালে করোনা বা কভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসায় সরকার সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিত করার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। তবে ঢাকার বাইরে পরীক্ষার সুযোগ বাড়লেও এখন পর্যন্ত জেলাগুলোতে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করা যায়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এমনটা জানা গেছে। এ নিয়ে বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন নিম্নে তুলে ধরা হলো-

ঢাকার বাইরে করোনা চিকিৎসার অভাব
ঢাকার বাইরের জেলাগুলোয় করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। তবে এই ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর যে ধরণের চিকিৎসা সুবিধার প্রয়োজন হতে পারে তার প্রচণ্ড অভাব দেখা যাচ্ছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ – এসব জেলা কোভিড-১৯ বিস্তারের নতুন কেন্দ্র হয়ে উঠছে। কিন্তু বিবিসি বাংলার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব জেলায় যথেষ্ট পরিমাণে নিবিড় সেবা ইউনিট বা আইসিইউ, ভেন্টিলেশন এবং আইসোলেশন শয্যা নেই। গুরুতর রোগী হলেই তাদের ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন একাধিক জেলার চিকিৎসকরা।

ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে আর কোন শহরে ভেন্টিলেশন সুবিধা সম্বলিত পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ নেই। যেমন কিশোরগঞ্জে দু’জন চিকিৎসকের করোনাভাইরাস ধরা পড়ার পর আইসিইউ সুবিধার জন্য তাদের ঢাকায় পাঠিয়ে দেয়া হয়। কারণ, ওই জেলা বা আশেপাশের জেলাগুলোয় আইসিইউ সুবিধা সম্বলিত কোনও হাসপাতাল নেই। সিলেটে আইসিইউ থাকলেও, সেখানকার একজন চিকিৎসক সেখানে ভেন্টিলেশন সুবিধা না পেয়ে ঢাকায় আসতে বাধ্য হন। বাংলাদেশের করোনাভাইরাসে আক্রান্ত প্রথম কোন চিকিৎসক হিসেবে ঢাকায় তার মৃত্যু হয়।

বাড়িতে রেখে চিকিৎসা
একাধিক জেলার স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিভাগীয় শহরগুলোর বাইরে জেলা শহরে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের জন্য আইসিইউ সুবিধার ব্যবস্থা নেই। সুনামগঞ্জের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন চিকিৎসক জানিয়েছেন, রোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী গুরুতর মনে হলেই তাকে অন্য হাসপাতালে পাঠিয়ে দেয়ার নির্দেশনা রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের এখানে একটি আইসোলেশন ইউনিট আছে। তবে বেশিরভাগ রোগীকে বাড়িতে রেখেই চিকিৎসা করা হচ্ছে। এখানে আইসিইউ সুবিধা নেই। তাই যাদের করোনাভাইরাসের সঙ্গে হৃদরোগ, কিডনি সমস্যা বা অন্য কোন জটিলতা রয়েছে, তাদের সবাইকে করোনাভাইরাসের চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত হাসপাতালগুলোয় পাঠিয়ে দেয়ার জন্য আমাদের ওপর নির্দেশনা আছে’- তিনি জানান।

কয়েকটি জেলার স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত জেলা শহরগুলোয় যেসব রোগী পাওয়া যাচ্ছে, তাদের বেশিরভাগকে বাড়িতে রেখে বা হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব হচ্ছে। যাদের বাড়িতে থাকা সমস্যা, কিংবা জ্বর বা অন্য কোন জটিলতা রয়েছে, তাদের হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে।

গাইবান্ধার একজন রোগী বলেন, ‘হাসপাতালে ভালো সুবিধাই পেয়েছি। নার্সরা ততোটা কাছে আসেনি। কিন্তু টেলিফোনে চিকিৎসকরা নিয়মিত খোঁজ খবর নিয়েছেন। খাবার ভালো ছিল।’

তবে এখনো জেলা শহরগুলোয় যে সংখ্যায় আইসোলেশন শয্যা প্রস্তুত রাখা হয়েছে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা তার চেয়ে কম। ফলে হাসপাতাল গুলোয় এখনো অনেক আইসোলেশন শয্যা ফাঁকা রয়েছে। কিন্তু রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেলেই সংকট শুরু হওয়ার আশঙ্কা করছেন কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন মোঃ মুজিবুর রহমানের মতো অনেক কর্মকর্তা। মুজিবুর রহমান বলেন, কিশোরগঞ্জে আইসিইউ সুবিধার কোনও হাসপাতাল নেই। ফলে সেরকম গুরুতর কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লে স্বাভাবিকভাবেই তাদের ঢাকায় পাঠাতে হবে।

চিকিৎসক সংকটের আশঙ্কা
চিকিৎসকরা বলছেন, করোনাভাইরাসের লক্ষণ থাকার পরেও অনেক রোগী সেটা লুকিয়ে রেখে চিকিৎসা নিচ্ছেন, যার ফলে চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীরাও করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে পড়ছেন। কিশোরগঞ্জ জেলার চারশো’ স্বাস্থ্যকর্মীর মধ্যে ৪১ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। একাধিক চিকিৎসক জানিয়েছেন, তারা প্রয়োজন অনুযায়ী পিপিই পাননি। ফলে তাদেরই আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading