আজিমপুরে চিরনিদ্রায় শায়িত আনিসুজ্জামান

আজিমপুরে চিরনিদ্রায় শায়িত আনিসুজ্জামান

উত্তরদক্ষিণ শুক্রবার ১৫ মে ২০২০। ১২:৪৮

রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানে চির নিদ্রায় শায়িত হলেন জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান। শুক্রবার (১৫ মে) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আজিমপুর কবরস্থানে বাবার কবরে তার মরদেহ দাফন করা হয়েছে। এর আগে ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামানের প্রতি গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।

করোনায় মারা যাওয়ায় দাফনের আগে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সীমিত পরিসরে অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় তার ছেলে আনন্দ জামান, ভাই আক্তারুজ্জামানসহ পরিবারের সদস্য ও নিকটাত্মীয়রা অংশগ্রহণ করেন। এর আগে বৃহস্পতিবার (১৪ মে) বিকেল ৪টা ৫৫ মিনিটে অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

বাংলা একাডেমির আজীবন সভাপতি অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। হৃদরোগ, কিডনি ও ফুসফুসে জটিলতা, পারকিনসন্স ডিজিজ এবং প্রোস্টেটের সমস্যার পাশাপাশি শেষ দিকে তার রক্তেও ইনফেকশন দেখা দিয়েছিল। তার মৃত্যুর কারণ হিসেবে করোনা বা কভিড১৯ সংক্রমণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে সিএমএইচর ছাড়পত্রে।

তবে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, তার দীর্ঘদিনের অসুস্থতা বাড়তে থাকায় গত ২৭ এপ্রিল তাকে রাজধানীর ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় ৯ মে তাকে নেয়া হয়েছিল ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে।
ইমেরিটাস অধ্যাপক আনিসুজ্জামান দেশের বরেণ্য শিক্ষাবিদ, লেখক ও গবেষক, ভাষাসংগ্রামী, মহান মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণকারী, সংবিধানের অনুবাদক, দেশের সব প্রগতিশীল আন্দোলনের অগ্রবর্তী মানুষ।

জাতির বিবেকসম এ মানুষটি ১৯৩৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার বশিরহাটে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইমেরিটাস অধ্যাপক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন আনিসুজ্জামান। ১৯৮৫ সালে তিনি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। এই ভূখন্ডে ধর্মান্ধতা ও মৌলবাদবিরোধী নানা আন্দোলনে তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল। শহীদ জননী জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে গঠিত গণআদালতে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান ও ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। এছাড়াও, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে ড. কুদরাত-এ-খুদাকে প্রধান করে গঠিত জাতীয় শিক্ষা কমিশনের তিনি সদস্য ছিলেন। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস নিয়ে তার গবেষণা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

আনিসুজ্জামান শিক্ষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য একাধিক পুরস্কার লাভ করেছেন। প্রবন্ধ গবেষণায় অবদানের জন্য ১৯৭০ সালে তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। শিক্ষায় অবদানের জন্য তাকে ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশ সরকার প্রদত্ত দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদকে ভূষিত করা হয়। শিক্ষা ও সাহিত্যে অবদানের জন্য তাকে ভারত সরকার কর্তৃক প্রদত্ত তৃতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা পদ্মভূষণ পদক প্রদান করা হয়। সাহিত্যে অবদানের জন্য ২০১৫ সালে বাংলাদেশ সরকার তাকে সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার প্রদান করে।

এছাড়া, তিনি ১৯৯৩ ও ২০১৭ সালে দুইবার আনন্দবাজার পত্রিকা কর্তৃক প্রদত্ত আনন্দ পুরস্কার, ২০০৫ সালে রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডি. লিট. ডিগ্রি এবং ২০১৮ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে জগত্তারিণী পদক লাভ করেন। ২০১৮ সালের ১৯ জুন বাংলাদেশ সরকার তাকে জাতীয় অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেয়। আনিসুজ্জামানের রচিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা শতাধিক। উল্লেখযোগ্য রচনাবলির মধ্যে রয়েছে- ‘মুসলিম মানস ও বাংলা সাহিত্য’, ‘স্বরূপের সন্ধানে’, ‘পুরোনো বাংলা গদ্য’, ‘আঠারো শতকের বাংলা চিঠি’, ‘কালনিরবধি’, ‘বিপুলা পৃথিবী’, ‘আমার একাত্তর’, ‘স্মৃতিপটে সিরাজুদ্দীন হোসেন’, ‘শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ স্মারকগ্রন্থ’, ‘নারীর কথা’, ‘মধুদা, ফতোয়া’, ‘ওগুস্তে ওসাঁর বাংলা-ফারসি শব্দসংগ্রহ’ ও আইন-শব্দকোষ।

বাংলা সাহিত্যে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি অলক্ত পুরস্কার, আলাওল সাহিত্য পুরস্কারসহ নানা পুরস্কার ও ডিগ্রিতে ভূষিত হয়েছেন। তথ্য সহায়তা বাসস।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading