ঈদুল ফিতর: ধর্মীয়, অর্থনৈতিক ও সামাজিক তাৎপর্য

ঈদুল ফিতর: ধর্মীয়, অর্থনৈতিক ও সামাজিক তাৎপর্য

উত্তরদক্ষিণ রবিবার ২৪ মে ২০২০। ১৯:৪৫

মোহাম্মদ শিহাব: ঈদ মানে আনন্দ, ঈদ মানে খুশি। আভিধানিক অর্থে ঈদ হচ্ছে- পুনরাগমন বা বারবার ফিরে আসা। তাইতো প্রতিবছর মুসলমানদের জীবনে ফিরে আসে ঈদ আনন্দ। দীর্ঘ এক মাস সিয়াম সাধনার পর মুসলিমদের জীবনে আসে ঈদুল ফিতর। এটি মুসলিমদের ধর্মীয় উৎসব হলেও বাংলাদেশের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে পুরো বাঙালির জীবনে আসে আনন্দের বার্তা নিয়ে। ফলে সামাজিকভাবেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ ঈদুল ফিতর।

ঈদুল ফিতরে নতুন পোশাক, প্রত্যেক বাড়িতে বাহারী খাবারের আয়োজন, আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে ঈদ উপহার প্রেরণ, গরিব-দুঃখী মানুষের জন্য সাদাকাতুল ফিতর ও যাকাত বিতরণ- এসবগুলো বিষয় ধর্মীয় তাৎপর্যের পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বহন করে। ঈদ বৈষম্যহীন সাম্য, শান্তি তথা সমতার বাণী নিয়ে আসে আমাদের জাতীয় জীবনে। মানুষের মধ্যে তৈরি করে ভ্রাতিত্ববোধ। হিংসা, বিদ্বেষ, ধনী-গরিবের ভেদাভেদ ভুলে ঈদের জামাতে এক কাতারে সবাইকে সামিল হওয়ার সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করে ঈদ।

অবশ্য এবার করোনাময় পৃথিবীতে ঈদের আনন্দ ও উৎসবের ধরণ কিছুটা ভিন্ন হতে বাধ্য। এটি পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল ঘটনা। কারণ, করোনা সংক্রমণের আশঙ্কায় স্বাস্থ্যবিধির কথা বিবেচনা করে এবার ঈদে নতুন পোশাক কেনা থেকে বিরত থেকেছেন অধিকাংশ মানুষ। ঈদের নামাজও উম্মুক্ত ময়দানে হচ্ছে না। তবে সংক্ষিপ্ত পরিসরে মসজিদে ছোট ছোট জামাত আয়োজন করার ব্যবস্থা থাকবে। করোনা সংক্রমণের কথা চিন্তা করে ঈদে কোলাকুলি বা আলিঙ্গন করা, হ্যান্ডসেক করা থেকে সবাইকে বিরত থাকতে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা নির্দেশনা দিয়েছেন। এমনকি বাসায় একাকি ঈদের নামাজ আদায় করতে কোনও কোনও ধর্মীয় পন্ডিত মত দিচ্ছেন। এক কথায় করোনা নামক এক মহাদুর্যোগ মানুষের মধ্যে যে সামাজিক দূরত্ব তৈরি করেছে, ঈদুল ফিতরেও তা মেনে চলতে হবে সবাইকে।

এবার ঈদে আত্মীয় স্বজনদের বাড়ি বেড়ানো, পর্যটন কেন্দ্রে ঘুরতে যাওয়ার পরিবেশ নেই। তাইতো স্বচ্ছলদের অনেকেই ঈদে নতুন কাপড় না কিনে করোনা ও আম্পান দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত, অভাবী ও কর্মহীন অস্বচ্ছলদেরকে সেই অর্থ দিচ্ছেন। এটি বাঙালির মানবিকতা ও মহানুভবতারই পরিচয় বহন করে। যদিও অনেক ক্ষেত্রে করোনা মহামারির মধ্যে কতিপয় মানুষের নিষ্ঠুর আচরণ, মনুসত্বহীন কর্মকাণ্ডও প্রকাশ পেয়েছে। সিয়াম ও ঈদের শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে সবাই মানবিক আচরণে সচেষ্ট হবো- সেটাই প্রত্যাশা।

ঈদুল ফিতরের ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক তাৎপর্য
ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে প্রতিবারই ঈদের বাজার চাঙা হয়ে ওঠে। এতে একই সঙ্গে চাঙা হয়ে ওঠে দেশের অর্থনীতি। পুরো অর্থব্যবস্থা আবর্তিত হয় মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম সবচেয়ে বড় এ ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঈদের বাজার প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা কমবেশি লেনদেন হয়েছে বলে অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা যাচ্ছে। দারিদ্র্য হ্রাস, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের ফলে ঈদকেন্দ্রিক লেনদেন প্রতি বছর বাড়ে। ঈদ উপলক্ষে প্রবাসীরা বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্স দেশে পাঠান। ঈদের সময় বৈদেশিক আয়ের প্রবাহ বেড়ে যাওয়া গ্রামীণ অর্থনীতিও চাঙা হয়ে ওঠে। চাঙা হয়ে ওঠে ব্যাংক খাতও। এ উপলক্ষে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে অন্য সময়ের চেয়ে প্রায় ১০ গুণ বেশি লেনদেন হয়। যদিও এবার করোনার কারণে সেই দৃশ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন।

সামাজিক তাৎপর্য
মুসলমানদের জীবনের ঈদের তাৎপর্য অনেক। ঈদ অর্থ খুশি এবং ফিতর এসেছে ফিতরা থেকে। সুতরাং ঈদুল ফিতরের অর্থ দাঁড়ায় দান-খয়রাতের মাধ্যমে পবিত্র ঈদের উৎসবকে আনন্দে উদ্ভাসিত করে তোলা। জাকাত-ফিতরার মাধ্যমে ধনী ও গরিবের মধ্যকার ভেদাভেদ দূরীভূত হয়। আর এতেই হয় মুসলিম হৃদয় উদ্বেলিত। ঈদুল ফিতরের যাবতীয় আনুষ্ঠানিকতায় পরস্পরের শুভেচ্ছা, আন্তরিকতা ও সহমর্মিতা বিনিময়ের মাধ্যমে মানবিক ও সামাজিক সুসম্পর্ক গড়ে ওঠে। এটা হলো ঈদুল ফিতরের সামাজিক তাৎপর্য। সমগ্র বিশ্বের প্রত্যেক মুসলমান যাতে ঈদুল ফিতরের আনন্দ উপভোগ করতে পারেন, সেজন্য রমজান মাসে বেশি হারে দান-খয়রাত, জাকাত ও ফিতরা প্রদানের কথা বলা হয়েছে। এটা হলো ঈদুল ফিতরের অর্থনৈতিক তাৎপর্য। ধনী-গরিব, শিক্ষিত-অশিক্ষিত, সাদা-কালো নির্বিশেষে একই কাতারে মিলিত হওয়া মানব সম্প্রীতির এক অনন্য নিদর্শন পবিত্র ঈদ।

বাঙালির ঈদ উৎযাপন
বাঙালি মুসলিম পরিবারগুলো যার যার সাধ্যানুযায়ী ঈদুল ফিতরের দিন ভালো পোশাক পরে। ঘরে ঘরে উন্নত মানের খাবারের আয়োজন করা হয়। আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশীরাও এ আনন্দের অংশীদার হয়। দরিদ্র ও গরিবাও এদিনটিকে যথাযোগ্য মর্যাদা ও আনন্দের সঙ্গে পালন করে। মুসলমানরা এদিন কৃতজ্ঞচিত্তে খুতবাসহ ঈদের দুই রাকাত নামাজ আদায় করেন। আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে কুশলবিনিময় করেন। ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই কোলাকুলিসহ সালাম ও শুভেচ্ছার হাত বাড়িয়ে দেন। ঈদকার্ড বিনিময় বাঙালির জাতীয় ও রাজনৈতিক তথা সামাজিক জীবনে একটি জনপ্রিয় প্রথায় পরিণত হয়েছে।

তথ্যপ্রযুক্তির উৎকর্ষতার এ যুগে বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় আনন্দ-খুশি ও ঈদের আবেগ ভাগাভাগি করে থাকেন অনেকে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ের জন্য ফেসবুকসহ সোশ্যাল প্লাটফর্মকেই বেশি ব্যবহার করে থাকেন। করোনাময় পৃথিবীতে এবারের ঈদের আনন্দ ভাগাভাগিতে সেই প্রযুক্তির ব্যবহার আরও গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে।

পবিত্র মাহে রমজানের ধৈর্য, সংযম ও নৈতিক শিক্ষা এবং ঈদুল ফিতরের বৈষম্যহীন সাম্য, শান্তির বার্তা আমাদের জাতীয় জীবনে বয়ে আনুক সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি। কেটে যাক করোনা বা কভিড-১৯ নামক পৃথিবীর বুকে জেকে বসা অদৃশ্য দুর্যোাগ। ঈদের আনন্দ আমাদের জীবনে আসুক প্রতিটি দিন। সব ভেদাভেদ ভুলে বাঙালি জাতি উন্নতি, সমৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত সাম্য-শান্তির স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণে ঐক্যবদ্ধ হোক, সেই প্রত্যাশাই সচেতন ও বিবেকবান দেশবাসীর। আমাদের প্রত্যাশাও সেটাই। সবাইকে ঈদুল ফিতরের শুভেচ্ছা- ঈদ মোবারাক।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading