মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থা ‘চরম সংকটজনক’
শেখফারুক । উত্তরদক্ষিণ : শুক্রবার ১২ জুন ২০২০ । ১৪:১০
হাসপাতালে টানা আট দিন ধরে লাইফ সাপোর্টে থাকা সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমের শারীরিক অবস্থা এখন ‘চরম সংকটজনক’ বলে জানা গেছে। উন্নত চিকিৎসার জন্য পরিবার নাসিমকে সিঙ্গাপুরে নিতে চাইলেও তার বর্তমান শারীরিক অবস্থায় সেটা সম্ভব নয়। এমনকি শ্যামলীর (বর্তমানে যেখানে চিকিতসাধীন) স্পেশালাইজড হাসপাতাল থেকে থেকে সিএমএইচে স্তানান্তরের ঝুঁকিটুকু নেয়া সম্ভব নয়। চিকিতসক, পরিবার ও দলীয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
মোহম্মাদ নাসিম বর্তমানে শ্যামলীর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাকে সেখানে লাইফ সাপোর্টে রেখেই চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন চিকিৎসকেরা। সর্বশেষ অবস্থা মেডিকেল ভাষায় ‘ক্রিটিক্যাল’। তার শারীরিক অবস্থার তেমন কোন উন্নতি পরিলক্ষিত হয়নি এবং তাকে নিয়ে আশঙ্কা কেটে যায়নি।
মোহম্মাদ নাসিমের চিকিৎসায় গঠিত ১৩ সদস্যের মেডিকেল বোর্ডের প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কনক কান্তি বড়ুয়া বৃহস্পতিবার (১১ জুন) তার শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানিয়েছিলেন, “…অবস্থা সঙ্কটাপন্ন, অবস্থার উন্নতি হয়নি, বরং অবনতির দিকে।”
গত শুক্রবার (০৫জুন) ব্রেইন অপারেশনের পরে নাসিমের অবস্থার উন্নতি নি হলেও ‘স্থিতিশীল’ ছিল। কিন্তু গতকাল (বৃহস্পতিবার, ১১ জুন) বিকেল থেকে নাসিমের অবস্থার অবনতি হয়। রক্তচাপ ওঠানামা করতে থাকে। রাতে কিছুটা স্বাভাবিক হলেও সেটা ধারাবাহিক নয়। ‘তেমন উন্নতি হয়েছে’ এমন কথা বলা যায় না।
উন্নত চিকিতসার জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে দেশের বাইরে, সিঙ্গাপুরে বা ব্যাংককে নেয়ার আগ্রহ ছিল। বিশেষতঃ সিঙ্গাপুরে যোগাযোগ করা হয়েছিল। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিয়ে রেখেছে। কিন্তু বর্তমান অবস্থায় তার চিকিতসকরা স্থানান্তরের ঝুঁকি নিতে চাইছেন না।
মোহাম্মদ নাসিমের পরিবারের পক্ষে তার ছেলে ও সাবেক সাংসদ তানভীর শাকিল জয় তার বাবার সুস্থতার জন্য সবার কাছে দোয়া চেয়েছেন।
গত সোম, মঙ্গল ও বুধবার (০৮, ০৯ ও ১০ জুন) তার নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। পরপর ৩ বার তার নমুনা পরীক্ষার ‘নেগেটিভ’ পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রটোকল অনুযায়ী কোভিড-১৯ রোগির উপসর্গ কমে এলে পর পর দুটি পরীক্ষার ফল ‘নেগেটিভ’ এলে ধরে নেওয়া হয়, তার শরীরে আর ভাইরাসের সংক্রমণ নেই। সেই অর্থে মোহাম্মদ নাসিমের শরীরে করোনা ভাইরাসের নেই।
আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী মোহম্মাদ নাসিম গত ০১ জুন থেকে হাসপাতালে চিকিতসাধীন তিনি। জ্বর-কাশিসহ করোনা-ভাইরাসের লক্ষণ নিয়ে ওইদিন (০১ জুন) দুপুরে রাজধানীর শ্যামলীর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। সেখানে করোনা টেস্ট করা হলে ফল ‘পজিটিভ’ আসে। নাসিমের স্ত্রী এবং বাসার ১ জন গৃহকর্মীও করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন।
বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। পরে তার শারিরীক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলেও হাসপাতালে থাকা অবস্থায় গত শুক্রবার (০৫ জুন) সকালে তার ‘ব্রেইন স্ট্রোক’ হলে সেখানেই তার মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার করা হয়।
শুক্রবার (০৫ জুন) সকালে হঠাত মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হওয়ায় তার অবস্থার অবনতি ঘটে। পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনা করে (পারিবারিক অনুমতি নিয়ে) চিকিতসকরা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে তার অপারেশন করেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. রাজিউল হকের নেতৃত্বে তার মস্তিষ্কে সফল অস্ত্রোপচার করা হয়।
আওয়ামী লীগ সূত্রে জানা যায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে মোহম্মাদ নাসিমকে উন্নততর চিকিতসার জন্য সিএমএইচে স্তানান্তরের উদ্যোগ নেয়া হলেও তার শারিরীক অবস্থার কারণে সম্ভব হয়নি। তার অবস্থা এতোটাই ‘ক্রিটিক্যাল’ হয়ে পড়ে যে সিএমএইচে নেয়া স্থগিত করে তাতক্ষণিকভাবে বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালেই তার অপারেশন হয়।
অপারেশন সফল হলেও নাসিমের শারিরীক অবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি।
তারপর থেকে তিনি চিকিতসকদের ‘গভীর পর্যবেক্ষণে’ রয়েছেন। ‘ডীপ কোমা’ বা গভীর কোমায় থাকা নাসিমকে নিয়ে তারা কোন নিশ্চয়তা বা আশা দিচ্ছেন না, আবার আশা ছাড়ছেনও না।
অস্ত্রোপচারের পর নিবিড় পর্যবেক্ষণে থাকা নাসিমের শারীরিক অবস্থা অবনতির দিকে গেলে ১৩ সদস্যের এই মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়। নাসিমকে নেওয়া হয় লাইফ সাপোর্টে।
‘লাইফ-সাপোর্টে’র মধ্যে একটা ভালো খবর মিলেছিল গত মঙ্গলবার (০৯ জুন), তার নতুন করোনা টেস্টের ফল ‘নেগেটিভ’। তবে তার শারীরিক অবস্থার তেমন কোন উন্নতি হয়নি। আগের মত ‘সংকটজনক’ পর্যায়ে রয়েছে। তবুও এই ভালো খবরটি (করোনা নেগেটিভ) কিছুটা আশার আলো জাগিয়ে রাখলো।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) উপাচার্য ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া্র নেতৃত্বাধীন ১৩ সদস্যের একটি মেডিকেল বোর্ডের মাধ্যমে নাসিমের চিকিতসা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিয়মিত খোঁজখবর রাখছেন।
তিনি হাসপাতালে চিকিতসকদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। তিনি গভীর কোমায় রয়েছেন। প্রথমে ৪৮ ঘন্টা পর্যবেক্ষণের বললেও পরে সংশ্লিষ্ট চিকিতসকরা ৭২ ঘন্টার কথা বলেন। এখন ৭২ ঘন্টাও পেরিয়ে গেছে। ‘পর্যবেক্ষণ’ দীর্ঘ হতে পারে বলে জানা গেছে। একটি সূত্রে জানা যায়, ‘অপেক্ষা’ করা ছাড়া আপাততঃ কিছু করার নেই।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একাধিকবার নাসিমের ছেলে তানভীর শাকিল জয় এবং সংশিল্ট চিকিৎসকের সঙ্গে ফোন করে সাবেক এই স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সর্বশেষ শারীরিক অবস্থার বিষয়ে খোঁজ-খবর নেন।
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর কারাগারে নিহত জাতীয় চার নেতার একজন শহীদ এম মনসুর আলীর ছেলে মোহাম্মদ নাসিম আওয়ামী লীগের ১৯৯৬-২০০১ সরকারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ছিলেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর প্রথমে মন্ত্রিসভায় না থাকলেও পরের মেয়াদে তাকে স্বাস্থ্যমন্ত্রী করা হয়।
আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম বর্তমান সরকারের খাদ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি। এ ছাড়া আওয়ামী নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের মুখপাত্রও তিনি।

