গণস্বাস্থ্যের কিট ‘অকার্যকর’
উত্তরদক্ষিণ । বুধবার ১৭ জুন ২০২০ । ১২:২৬
বঙ্গবন্ধু মেডিকেল হাসপাতালের পক্ষ থেকে বুধবার (১৭ জুন) আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে যে, করোনাভাইরাসের নমুনা পরীক্ষার জন্য যে র্যাপিড টেস্ট কিট গণস্বাস্থ্য দিয়েছিলো পরীক্ষায় সেগুলো ‘কার্যকর বলে প্রমাণ হয়নি’। বিএসএমএমইউ’র উপাচার্য কনক কান্তি বড়ুয়া এক সংবাদ সম্মেলনে অবশ্য বলেন, যেসব এলাকায় পিসিআর সুবিধা নেই সেখানে একটি সহায়ক হতে পারে।
এর আগে উপচার্যের কাছে প্রতিবেদন দিয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএসএমএমইউ) মূল্যায়ন কমিটি। প্রতিবেদনে মূল্যায়ন কমিটি বলেছে, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র উদ্ভাবিত ‘জিআর কোভিড-১৯ ডট ব্লট কিট’ করোনাভাইরাস শনাক্তে ‘কার্যকর নয়’। মূল্যায়ন কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক কনক কান্তি বড়ুয়া বুধবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ওই কিট দিয়ে সর্বোচ্চ ৪০ শতাংশ রোগীর সংক্রমণ শনাক্ত করা সম্ভব।
অধ্যাপক কনক কান্তি বড়ুয়া বলেন, উপসর্গের প্রথম দুই সাপ্তাহে তাদের কিট ব্যবহার করে শুধুমাত্র ১১ থেকে ৪০ শতাংশ রোগীর করোনাভাইরাস শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এই কিট করোনাভাইরাস শনাক্তে কার্যকর নয়।

তিনি বলেন, “দেশীয় একটি প্রতিষ্ঠানের তৈরি করা কিটের মূল্যায়ন করতে পেরে আমরা আনন্দিত। যারা এ কিটের আবিষ্কার করেছে তাদের ধন্যবাদ জানাই”। তিনি জানান, ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তর বঙ্গবন্ধু মেডিকেলকে এক বছর সময় দিলেও বাস্তবতার নিরিখে এক মাসের মধ্যে গবেষণা শেষ করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ শুরু করে গবেষণা দল। মোট ৫০৯টি রক্ত স্যাম্পল পরীক্ষার মাধ্যমে এক মাস সময়ের মধ্যে বঙ্গবন্ধু মেডিকেলের গবেষণা দলের কার্যক্রম শেষ হয় বলে জানান তিনি।
গণস্বাস্থ্য ১২ মে প্রথমে দুশোটি কিট দিয়েছিলো পরীক্ষার জন্য। যদিও পরে আবার ১৯ মে রক্তের পরিবর্তে রোগীর লাল সংগ্রহের অনুরোধ জানান।
জানা গেছে, ওই ‘র্যাপিড’ কিটের কার্যকারিতা পরীক্ষার জন্য গঠিত এই কমিটির প্রধান অধ্যাপক শাহিনা তাবাসসুম বুধবার দুপুরে উপাচার্যের কাছে তাদের মূল্যায়ন প্রতিবেদন জমা দেন।
বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সঙ্কটের শুরুর দিকে যখন কিট সঙ্কট প্রকট হয়ে দেখা দিয়েছিল, তখনই দেশীয় প্রতিষ্ঠান গণস্বাস্থ্য ফার্মাসিউটিক্যালসের প্রধান বিজ্ঞানী ও গণবিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বিজন কুমার শীল কোভিড-১৯ রোগ শনাক্তে কিট উদ্ভাবনের খবর দেন। এরপর চীন থেকে কাঁচামাল (রি-এজেন্ট) এনে কিটের স্যাম্পল তৈরির কাজ শুরু করেন তারা। গণস্বাস্থ্যের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তাদের এই ‘জিআর কোভিড-১৯ ডট ব্লট কিট দিয়ে ৫ মিনিটে করোনাভাইরাস পরীক্ষার ফল পাওয়া যাবে, খরচ হবে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় শুরু থেকেই বলে আসছে, এ ধরনের কিটে পরীক্ষার ক্ষেত্রে অনেক বেশি ‘ফলস পজেটিভ কিংবা ফলস নেগেটিভ’ রেজাল্ট আসে। মহামারীর এই সময়ে এরকম ভুল ফলাফল মারাত্মক পরিণতি ডেকে আনতে পারে, কারণ ফলস নেগেটিভ রেজাল্ট পেয়ে কেউ নিজেকে ভাইরাসমুক্ত মনে করলেও বাস্তবে তিনি হয়ত বহু মানুষকে আক্রান্ত করবেন।
এর মধ্যেই গত ২৫ এপ্রিল গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র তাদের উদ্ভাবিত টেস্টিং কিটের নমুনা হস্তান্তর অনুষ্ঠানের আয়োজন করে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজেস কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশনের (সিডিসি) প্রতিনিধির কাছে কিটের নমুনা তুলে দেওয়া হয়। তবে সরকারের কোনো প্রতিনিধি সেখানে ছিলেন না।
গণস্বাস্থ্যের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী পরদিন সংবাদ সম্মেলন করে কিট অনুমোদনে গড়িমসির অভিযোগ আনেন। এর জবাবে ২৭ এপ্রিল ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মাহবুবুর রহমান ‘অপপ্রচার’ না করতে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতি আহ্বান জানান।
দীর্ঘ বিতর্কের পর ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর গত ৩০ এপ্রিল গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রকে তাদের উদ্ভাবিত ‘র্যাপিড ডট ব্লট’ কিটের কার্যকারিতা পরীক্ষার জন্য বিএসএমএমইউ অথবা আইসিডিডিআরবিতে নমুনা জমা দেওয়ার অনুমতি দেয়। এরপর গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র ২ মে কিটের কার্যকারিতা পরীক্ষার জন্য ৬ সদস্যের কমিটি করে এবং ১৩ মে তাদের উদ্ভাবিত ২০০ কিট বিএসএমএমইউতে জমা দেয়। ৩৪ দিন পর বিএসএমএমইউ কর্তৃপক্ষ তাদের সিদ্ধান্ত জানাল। এ বিষয়ে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিক্রিয়া তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।

