লাদাখ সীমান্তে চীনের সঙ্গে সংঘর্ষ, সর্বদলীয় বৈঠকে মোদী’র উল্টো সুর!

লাদাখ সীমান্তে চীনের সঙ্গে সংঘর্ষ, সর্বদলীয় বৈঠকে মোদী’র উল্টো সুর!
ইন্ডিয়ার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি

উত্তরদক্ষিণ । শনিবার ২০ জুন ২০২০ । আপডেট ১৬:৪৩

লাদাখ সীমান্তে চীনের সঙ্গে সংঘর্ষে সেনা হতাহতের ঘটনা নিয়ে ইন্ডিয়ার রাজনীতি এখন গরম। এই ঘটনা নিয়ে ইন্ডিয়ার প্রধানমন্ত্রী বরেন্দ্র মোদি সর্ব্দলীয় বৈঠকে বসেছিলেন শুক্রবার (১৯ জুন) সন্ধ্যায়। সেখানে মোদি বলেছেন, ‘‘ওখানে (লাদাখে) আমাদের সীমান্ত পেরিয়ে কেউ (চীন) ঢুকে আসেনি। ওখানে আমাদের এলাকায় কেউ (চীন) ঢুকেও বসে নেই।’’

মোদি ওই বক্তব্যের পর প্রশ্ন ওঠেছে, চীনের সেনা ভারতের এলাকায় না ঢুকলে কী ভাবে ২০ জন জওয়ানের মৃত্যু হল? কী ভাবে ৭৬ জন আহত হলেন? ভারতের ১০ জন জওয়ানকেই বা চীন কীভাবে আটকে রাখল বা ফেরত দিল?

ব্যস, এরপর মোদির বক্তব্য নিয়ে তোলপাড়। তার বক্তব্যের বিরুদ্ধে একের পর এক সমালোচনার তীর ছুটছে। মোদি কিছুটা বেকায়দায় পড়েছেন বটে।

Rahul Gandhi and Amit Shah
রাহুল গান্ধী ও অমিত শাহ

চীন এ দেশে না ঢুকলে ভারতীয় সেনার মৃত্যু হল কেন? কোন এলাকায় মৃত্যু হল তাঁদের? চীনা আগ্রাসন নিয়ে সর্বদল বৈঠকের পর, শনিবার (২০ জুন) সকালে প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে এমনই ঝাঁঝালো প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছিলেন রাহুল গাঁধী। বেলা গড়াতেই মুখ খুললেন বিজেপি নেতা ও ইন্ডিয়ার কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। কিন্তু রাহুলের প্রশ্নের সরাসরি জবাব মিলল না। জওয়ানের বাবার বক্তব্যের ভিডিয়ো জুড়ে অমিত শাহ পাল্টা আক্রমণ করেছেন— রাহুল গাঁধীর উচিত দেশের সংহতির স্বার্থে ক্ষুদ্র রাজনৈতিক গণ্ডির ঊর্ধ্বে উঠে আসা। রাহুলের কথার উত্তর তার কাছে নেই। দেশপ্রেমের আবেগ দিয়ে ঢাকতে চাইছেন।

রাহুল গান্ধী প্রশ্ন তুলেছেন, ‘‘ প্রধানমন্ত্রী ভারতীয় ভূখণ্ড চিনের আগ্রাসনের সামনে সমর্পণ করে দিয়েছেন। যদি ওই ভূখণ্ড চিনেরই হয়, তা হলে আমাদের সেনার মৃত্যু হল কেন? সেনাদের মৃত্যু হল কোন জায়গায়?’’

লাদাখ সীমান্তে চীনের সঙ্গে সংঘর্ষ হয় ১৫ জুন। এর প্রেক্ষিতে শুক্রবার (১৯ জুন) সর্বদলীয় বৈঠকের ডাক দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বৈঠকে তিনি দাবি করেন, চীন থেকে লাদাখে কেউ ভারতের এলাকাতে ঢোকেনি।

বৈঠকে মোদি স্পষ্টতঃ বলেন, ‘ওখানে আমাদের সীমান্ত পেরিয়ে কেউ ঢুকে আসেনি। ওখানে আমাদের এলাকায় কেউ ঢুকেও বসে নেই।’’

‘ওখানে’ অর্থাৎ লাদাখে। ‘কেউ’ অর্থাৎ চীনের সেনাবাহিনী।

লাদাখে চিনের সেনার হাতে ২০ জন ভারতীয় জওয়ানের মৃত্যুর পরে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সর্বদলীয় বৈঠকে চিন বা চিনের সেনার নাম সরাসরি না করেই ওই দাবি করলেন। সঙ্চীগে এটাও বললেন, ‘‘আমাদের কোনও সেনা চৌকিও অন্য কারও (চীনের) দখলে নেই।’’

চীনের নাম না করেই তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন, ‘‘সামরিক বাহিনীকে যথোচিত পদক্ষেপের জন্য অনুমতি দিয়ে রাখা হয়েছে।’’

মোদির গোটা বক্তব্যেই নামের বদলে সর্বনামের ছড়াছড়ি।

সর্বদলীয় বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর এই দাবির পরে বিরোধী শিবির এবং প্রাক্তন সেনাকর্তাদের একাংশের প্রশ্ন, চীনের সেনা ভারতের এলাকায় না ঢুকলে কী ভাবে ২০ জন জওয়ানের মৃত্যু হল? কী ভাবে ৭৬ জন আহত হলেন? ভারতের ১০ জন জওয়ানকেই বা চীন কীভাবে আটকে রাখল বা ফেরত দিল?

সিপিএম নেতা সীতারাম ইয়েচুরির কথায়, ‘‘তা হলে তো কোনও সংঘাতই নেই! আমাদের সাহসী যোদ্ধারা শহিদ হলেন কী করে?  সর্বদল বৈঠকই বা ডাকা হল কেন?’

modi
সর্বদলীয় বৈঠকে মোদী। ছবি: পিটিআই

বিরোধীরা বলছেন, নরেন্দ্র মোদীর কথার সঙ্গে তাঁর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বৃহস্পতিবারের (১৮ জুন) বিবৃতিই মিলছে না। ১৫ জুন রাতে গালওয়ান উপত্যকায় দু’দেশের জওয়ানদের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা নিয়ে বৃহস্পতিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেছিলেন, ‘‘আমাদের কাছে স্পষ্ট যে আমাদের যাবতীয় কার্যকলাপ প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখায় ভারতের দিকেই ঘটেছিল।’’ যার অর্থ, চীনই প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা পেরিয়ে ভারতের দিকে ঢুকে এসেছিল। 

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে এ-ও বলা হয়েছিল, ‘চীন গালওয়ান উপত্যকায় প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখা মানবে, এই ঐকমত্য থেকে সরে এসেছিল। চীন একতরফা স্থিতাবস্থা বদলাতে চাইছিল বলেই ১৫ জুন হিংসাত্মক সংঘর্ষ ঘটে। চীন নিয়ন্ত্রণ রেখায় ভারতের দিকে কাঠামো তৈরির চেষ্টা করায় ভারত  বাধা দেয়।’ বিরোধীরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, চীন যে শুধু গালওয়ান উপত্যকা এবং প্যাগং  হ্রদ এলাকায় ভারতের ভূখণ্ড দখল করে বসে রয়েছে, তা নয়। ওটা তাদেরই এলাকা বলে চিনের বিদেশ মন্ত্রক জানিয়েছে।

কিন্তু চীন ভারতের এলাকায় বসে নেই বলে প্রধানমন্ত্রীর দাবির পরে বিরোধী শিবিরের প্রশ্ন, তা হলে কি মোদী মেনে নিচ্ছেন, চীনের সেনা গালওয়ানে যেখানে রয়েছে, সেটা চিনেরই এলাকা? বস্তুত এ দিনও চীনা বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র দাবি করেন, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখার কাছে যে এলাকা চিনের হাতে রয়েছে গালওয়ান উপত্যকা সেখানেই।

লাদাখ নিয়ে প্রথম থেকেই বিরোধীদের অভিযোগ ছিল, চীনের সেনা ভারতের এলাকা দখল করে বসে থাকলেও মোদী সরকার তা অস্বীকার করছে। গোটা দেশকে অন্ধকারে রেখেছে। আজ সর্বদলীয় বৈঠকেও কংগ্রেস সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী বলেছেন, গত ৫ মে লাদাখে চীনা অনুপ্রবেশের খবর পাওয়ার পরেই সরকারের সর্বদলীয় বৈঠক ডাকা উচিত ছিল।

পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও আজ বার্তা দিয়েছেন, চীন স্বৈরতান্ত্রিক দেশ হলেও সরকারের সর্বদলীয় বৈঠক ডাকা উচিত ছিল। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও আজ বার্তা দিয়েছেন, চীন স্বৈরতান্ত্রিক দেশ হলেও ভারত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। সবাইকে সঙ্গে নিয়েই চলতে হবে সরকারকে।

বৈঠকের শুরুতে ইন্ডিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিংহ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রী এস জয়শঙ্কর পরিস্থিতি সম্পর্কে জানান।

কিন্তু সিপিএম নেতা সীতারাম ইয়েচুরির অভিযোগ, এপ্রিল থেকে জুনের মধ্যে লাদাখে কী ঘটেছে, তার কোনও তথ্য মেলেনি। সনিয়া বৈঠকে কড়া ভাষায় প্রশ্ন তোলেন, ‘‘এখনও আমরা অনেক বিষয়ে অন্ধকারে। চীনের সেনা কবে লাদাখে ঢুকেছিল? কবে তা সরকার জানতে পারে? ৫ মে না তার আগে? সরকার কি সীমান্তের স্যাটেলাইট ছবি নিয়মিত পায় না? গুপ্তচর সংস্থা কি প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখায় অস্বাভাবিক পরিস্থিতি নিয়ে কিছু জানায়নি? সেনা গোয়েন্দা সতর্ক করেনি? সরকার কি গোয়েন্দা ব্যর্থতা ছিল বলে মনে করে?’’

কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তাঁর জবাবি বক্তৃতায় বলেন, ‘‘আমি আশ্বস্ত করছি, সেনা সীমান্তের সুরক্ষায় সক্ষম। আমাদের কাছে এখন সেই ক্ষমতা রয়েছে, যে এক ইঞ্চি জমির দিকে কেউ চোখ তুলেও তাকায় না।’’ লাদাখের জওয়ানদের মৃত্যু নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীদের বৈঠকে মোদী বলেছিলেন, জওয়ানরা মারতে মারতে মরেছেন। আজ তিনি বলেন, ‘‘লাদাখে আমাদের ২০ জন সাহসী শহিদ হয়েছেন। কিন্তু যারা ভারতমাতাকে ভয় দেখাতে চেয়েছিল, তাদের উচিত শিক্ষা দিয়ে গিয়েছেন।’’

মোদী বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ রেখায় পরিকাঠামো তৈরি, নজরদারি বৃদ্ধির ফলেই বিবাদ হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘‘আগে যাদের কেউ কোনও প্রশ্ন করত না, কেউ বাধা দিত না, এখন আমাদের জওয়ান প্রতি পদে তাদের বাধা দিচ্ছে। বাধা দিলেও সংঘাত বাড়ে।’’

আদিও ইন্ডিয়ার সরকারি সূত্রের দাবি, মোদী সরকার যে ভাবে পরিস্থিতি সামলাচ্ছে, অধিকাংশ দলের নেতাই আজ তাতে আস্থা জানান। সকলেই সরকারের সঙ্গে এককাট্টা থাকার বার্তা দেন।

তথ্য সহায়তাঃ আনন্দবাজার, হিন্দুস্তান টাইমস

SekFaruk

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading