ডাক্তার কি সম্মানের জিনিস?

ডাক্তার কি সম্মানের জিনিস?

উত্তরদক্ষিণ । রবিবার ২১ জুন ২০২০ । আপডেট ২২:০০

নাজিয়া জামান তৃষা: আমার হাজবেন্ড একজন সরকারি ডাক্তার। স্কুল, কলেজে ভালো ছাত্র ছিলো। ম্যাথে তুখোড়। ইচ্ছা ছিলো ম্যাথ রিলেটেড পড়ালেখা করবে। সেইটা হয় নাই। বাপের ইচ্ছায় ডাক্তারি পড়ে। হাতে টাকা পাইলে যদি অন্য কোওে কোচিংয়ে ভর্তি হয়ে যায়, সেই ভয়ে তার বাপে তারে নিজ উদ্যোগে ঢাকায় যাইয়া মেডিকেল কোচিং-এ ভর্তি করিয়ে দেন।

আমাদের বাপ মায়েদের উপরে কোনও ডিসিশান নেওয়া যায় না, এমনই মেন্টাল প্রেশার তারা ক্রিয়েট করে ফেলে। কোনদিন আমার বাপ মাকে আমি বলতে শুনি নাই, “তৃষা, তোমার যা হইতে মনে চায়, তাই হও।” বাপ মায়ের প্রত্যাশার পাহাড় কোনো কোনো শক্তিশালী বাচ্চা ঠেলতে পারে, অধিকাংশই পারে না। তারা আমার মতো জগাখিচুড়ি হয়ে যায়, যাদের জীবনের কোনও স্টেপেই স্যাটিসফেকশনটা ঠিকঠাক আসে না।

তো, যা বলতেসিলাম, আমার হাজবেন্ড। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করে, খ্যাপ মাইরা মাইরা বিরাট অংকের টাকা জোগাড় করতে হয় তারে বিভিন্ন কোর্স (!) করে উপযুক্ত হওয়ার জন্য। তার মধ্যেই চলে এফসিপিএসের পড়ালেখা। পার্ট ওয়ান হয়ে গেলে তারে টেম্পোরারি চাকরিটা ছাড়তে হয়, পার্ট টু এর অনারারি ট্রেনিংয়ের জন্য। আর আগের চাকরির জমায় রাখা টাকা দিয়া চলতে হয়। ও, এর মাঝে তো আবার বিসিএস-ও দিতে হয়।

বিসিএসের পড়ালেখা, ট্র্যাকের সম্পূর্ণ বাইরে। ২৭তম বিসিএস, ইতিহাসের দীর্ঘতম বিসিএস পরীক্ষা। দুইবার করে ভাইভা। কোন রকম মামা চাচা, কোটামোটা ছাড়া এই ছেলে দুইবারই মেধাতালিকায় টিকে। প্রথমবার ৮০’র ঘরে প্লেস, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলের ভাইভাতে তো ৬০-এর ঘরে।

ডাক্তার রাখসিলো ফার্স্ট চয়েস, নির্বোধ হইলে যা হয় আর কী। এরপরে জয়েন করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে চলে যাওয়া লাগে চাকরিটা নিয়ে। যেখানে সার্ভিস দিতে হবে ঠিকই, কিন্তু সার্ভিসটা এফসিপিএসের পার্ট টু এর ৫ বছরের ট্রেনিং হিসেবে কাউন্ট হবে না। এই পড়া, সেই পড়া, আজ চাকরির পরীক্ষা তো কাল ডিগ্রির পরীক্ষা, এমডি রেসিডেন্সি ৫ বছর, ২০০৬ থেকে ২০২০। পাস করার পর থেকে এমডি নেওয়া পর্যন্ত।

আমি বুঝি না, ঠিক কতো বছর বয়স হইলে একটা ডাক্তার পড়ালেখা শেষ করে একটা স্থির লাইফ লিড করতে পারে? তাও তো সে প্রতিটা পরীক্ষায় প্রথম বসায় পাস। যদি সেইটা না হইতো? না হওয়াটাই তো স্বাভাবিক ছিলো। হয়ে গেছে, এইটা মনে হয় চরম সৌভাগ্যই বলা যায়।

একজন ডাক্তারের মানসিক ক্ষত আপনারা হয়তো কোনওদিনও অনুধাবন করার চেষ্টাও করেন নাই। কাছ থেকে না দেখলে কোনওদিন বুঝবেনও না। এই অমানুষিক পরিশ্রম আর পড়ালেখা করার যে ব্রত, আর কোন চাকরিতে আছে ভাই? আমার জানা নাই। তার চরম প্রতিদানই দেন আপনারা। নিদারুণ সম্মান আর ভালোবাসার নমুনা রেখে যান, প্রতিটা পদক্ষেপেই।

এই যে, এই ছবিটা দেখতেসেন, এইটা একজন ডাক্তাররে খাইতে দেওয়া হইসে এ্যাম্নে। আপনাদের তো অনেক ভাল্লাগতেসে তাই না, এইভাবে খাওন দেওয়া দেইখা? আফটার অল “কসাই” বইলা কথা! খাইতে দিসে এইটাই তো ম্যালা, শোকর গুজার করা উচিৎ। আবার মানসম্মানও চাইয়া বসতে হবে ক্যান? ডাক্তার কি সম্মানের জিনিস? ডাক্তার তো গাইল দেওয়া আর পিটায়া মাইরা ফেলার জাত।

৫ দিন টানা কোভিড ডিউটি করার পরে, চুক্তি অনুযায়ী বগুড়ার ম্যাক্স মোটেলে ডাক্তারদের আইসোলেশনে রাখা হয়। ৪-৫ দিন ওখানে রেখে তারপর ওদের নমুনা সংগ্রহ করে টেস্ট করা হয়। রিপোর্ট নেগেটিভ হলে বাসায় চলে আসবে। তো, আজ ৫ম দিনের ডিউটি শেষে ডাক্তার বাবু সরকার কর্তৃক নির্বাচিত সুন্দর মোটেলে গিয়ে উঠে এভাবে খাবার পেলেন।

দরজার সামনে চেয়ারের ভাঙ্গা অংশে খাবারটা এভাবে মাটিতে রেখে গেছে। একটা ছোট টেবিল বা চেয়ারও রাখার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে নাই মোটেল কর্তৃপক্ষ। এটাই আসল চেহারা বাংলাদেশের। আপনারা এভাবেই অসম্মানের চোখে দেখেন প্রতিনিয়ত তাদেরকে, যারা নিজেদের এবং তাদের পরিবারের জীবনগুলোকে হুমকির মুখে ফেলে প্রতিনিয়ত আপনাদের সেবা করে যাচ্ছে।

সরকার থেকে বারবার মানা করার পরেও, ফ্যা ফ্যা করে গায়ে বাতাস লাগিয়ে রাস্তায় ঘুরেফিরে কোভিড বাঁধিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে ডাক্তারদের উপরে ‘কুত্তার’ মতো চিল্লানো পাবলিকগুলাকেও হাসিমুখে চিকিৎসা দিয়ে যেতে হয়। আর তার উত্তম প্রতিদান আপনারা এভাবে দ্যান। ধন্য রাষ্ট্র, ধন্য দেশ। এম্নে কইরা খাওন যে দিসে, এটাই তো বিরাট সৌভাগ্য, বাপের আশা পূরণ কইরা ডাক্তার হওয়া প্রজাতন্ত্রের একজন চাকরের তো এইটাই পরম প্রাপ্তি। (ফেইসবুক থেকে নেয়া।)

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading