মূল্যস্ফীতি রুখে দিতে যথোচিত পদক্ষেপ নিতে হবে

মূল্যস্ফীতি রুখে দিতে যথোচিত পদক্ষেপ নিতে হবে

শিলা আক্তার। বৃহস্পতিবার, ১২ মার্চ, ২০২৬, আপডেট ১২:২৫

দেশে মূল্যস্ফীতি আবারও ৯ শতাংশের ঘরে উঠেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি থাকলে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়। এই অবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগতে পারে, মূল্যস্ফীতি আসলে কী? জনজীবনে এর প্রভাবইবা কী? মূল্যস্ফীতি মূলত পণ্য ও সেবার সামগ্রিক মূল্যবৃদ্ধিকে বোঝায়। এটি অনেকটা পরোক্ষ করের মতো প্রভাব ফেলে। সহজ কথায়, মূল্যস্ফীতি হলো একটি নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য ও সেবার দাম বেড়ে যাওয়ার ফলে টাকার মান কমে যাওয়া প্রবণতা। অর্থাৎ আগের চেয়ে বেশি টাকা দিয়ে একই পরিমাণ পণ্য বা সেবা কিনতে বাধ্য হওয়াই হলো মূল্যস্ফীতি। এর ফলে টাকার মান কমে যায়, বেড়ে যায় জীবনযাত্রার ব্যয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে কোনো পণ্য ও সেবা কিনতে যদি ১০০ টাকা খরচ হতো, তাহলে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে একই জিনিস কিনতে গড়ে ১০৯ টাকা ১৩ পয়সা খরচ করতে হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি ১০০ টাকায় খরচ বেড়েছে ৯ টাকা ১৩ পয়সা।

মূল্যস্ফীতির পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে। প্রধান কারণগুলো হলো চাহিদা বৃদ্ধি, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, অর্থের সরবরাহ বৃদ্ধি, ডলার সংকট ও টাকার অবমূল্যায়ন, সিন্ডিকেট ও মজুতদারি, সরবরাহ ব্যবস্থায় ত্রুটি ইত্যাদি। মানুষের যখন আয় বাড়ে, তখন তার ক্রয় ক্ষমতাও বৃদ্ধি পায়। সে তখন বেশি অথবা অপেক্ষাকৃত দামি পণ্য কিনতে চায়। সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিতে এই বিষয়টির প্রভাব পড়ে। আবার চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমে গেলেও পণ্যের দাম বেড়ে যায়। জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ বা কাঁচামালের দাম বাড়লেও পণ্যের দাম বেড়ে যায়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি টাকা ছাড়লে টাকার মান কমে গিয়ে পণ্যের দাম বেড়ে যায়। আবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ চাপে পড়লে কিংবা বাজারে ডলার সংকট তৈরি হলে টাকার মান কমে গিয়ে আমদানি খরচ বেড়ে যায়। সিন্ডিকেট ও মজুতদারির কারণে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হয়, ফলে পণ্যের দাম বাড়ে।

আগেই বলেছি ফেব্রুয়ারি মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ১৩ শতাংশ হয়েছে। জানুয়ারি মাসে এ হার ছিল ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশ। ফেব্রুয়ারির মূল্যস্ফীতি ১০ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ। স্মরণ করা যেতে পারে, পতিত স্বৈরাচারের শেষ মাসে অর্থাৎ ২০২৪ সালের জুলাইয়ে মূল্যস্ফীতি হয়েছিল ১১ দশমিক ৬৬ শতাংশ, যা ২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের পর সর্বোচ্চ। অন্তর্বর্তী সরকার মুদ্রানীতি বিশেষত নীতিসুদহার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি কমানোর চেষ্টা করে। তবে তা ততটা সফল হয়নি। দীর্ঘ এক বছরের বেশি সময় পর গত বছর নভেম্বরে মূল্যস্ফীতি নেমে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ। এরপর টানা ৯ মাস মূল্যস্ফীতি ৮ শতাংশের ঘরেই থাকে। ৯ মাস পর ফেব্রুয়ারিতে ৯ শতাংশের ওপর গেলো। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে ফেব্রুয়ারিতে খাদ্যে মূল্যস্ফীতি তুলনামূলকভাবে বেশি হয়েছে ৯ দশমিক ৩০ শতাংশ। আর খাদ্যবহির্ভূত খাতে হয়েছে ৯ দশমিক ০১ শতাংশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাস্তবে মূল্যস্ফীতি এর চেয়ে বেশি। ইরান যুদ্ধ যদি প্রলম্বিত হয়, তবে আগামীতে মূল্যস্ফীতি আরো বাড়বে।

উল্লেখ করা আবশ্যক, ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বের দেশে দেশে মূল্যস্ফীতি বাড়তে শুরু করেছে। বিশেজ্ঞদের মতে, মূল্যস্ফীতির এই ধাক্কা সামলিয়ে নাজুক বিশ্ব অর্থনীতির পুনরুদ্ধার অসম্ভবপর হয়ে পড়তে পারে। ধারণা করা হয়েছিল, এ বছর বিশ্ব অর্থনীতি গতি ফিরে পাবে। যুদ্ধ তা বিলম্বিত করতে পারে। বিশ্বকে বলা হয়, গ্লোবাল ভিলেজ। এর কোথাও কোনো সংকট বা সমস্যা দেখা দিলে গোটা বিশ্বেই কমবেশি তার প্রভাব পড়ে। তাছাড়া কোনো দেশেই এককভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। কোনো না কোনো দিক দিয়ে একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল। যেমন, আমাদের দেশ জ্বালানির ব্যাপারে প্রায় শতভাগ অন্যান্য দেশের ওপর নির্ভরশীল। ইরান যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিয়ে যে সংকট ও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে, আমরা তার সবচেয়ে বড় শিকারে পরিণত হয়েছি। জ্বালানি বিশেষ করে তেল-গ্যাস এবং সেইসঙ্গে বিদ্যুৎ এমন উপকরণ যেগুলো ছাড়া চলমান উৎপাদন ব্যবস্থা ও জীবনযাপন পদ্ধতি অচল হয়ে পড়তে বাধ্য।

অর্থনীতিবিদদের এ আশংকা খুবই বাস্তবসম্মত ও সঙ্গত যে, জ্বালানি ও বিদ্যুতের সংকট আমাদের উৎপাদন ব্যবস্থা ও জীবনযাপনে মারাত্মক বিরূপ প্রতিক্রিয়া ফেলবে। অন্যান্য দেশেও এই কারণসহ অন্যান্য কারণে কৃষি ও শিল্পপণ্যের উৎপাদন ব্যাহত ও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সেক্ষেত্রে পণ্যাদির দাম বাড়বে। যুদ্ধের কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যে বাধা ও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলে তার প্রভাবও পণ্যমূল্যে পড়বে। আমাদের দেশ কেবল জ্বালানির ক্ষেত্রে পরনির্ভর নয়, খাদ্যপণ্যসহ দরকারী অনেক পণ্যের ক্ষেত্রেও বিদেশের ওপর নির্ভরশীল। মূল্যস্ফীতির যে উল্লম্ফন ফেব্রুয়ারিতে লক্ষ করা গেছে, বিদ্যমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে তা আরো বৃদ্ধি পাবে, সেটা অনেকটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। তখন দেশে উৎপাদিত পণ্যই নয়, আমদানিকৃত পণ্যও অতিরিক্ত দামে কিনতে হবে। এর মধ্যেই খবর পাওয়া গেছে, যুদ্ধের প্রভাবে খাদ্যপণ্যসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বিশ্বজুড়েই বাড়তে শুরু করেছে।

মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি আমাদের দেশের জন্য আশনি সংকেত বিশেষ। দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ দরিদ্রসীমার নিচে বাস করে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। ধনীর সংখ্যা সীমিত। সাধারণত, মূল্যস্ফীতি বাড়লে দরিদ্র, নিম্ন ও মধ্যবিত্তের মানুষেরই বিপর্যয়কর পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হয়। দেশের কোটি কোটি মানুষের নিশ্চিত কোনো কাজ বা আয় নেই। শিক্ষিত-অশিক্ষিত বেকারের সংখ্যাও বিপুল। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লাখ লাখ শ্রমিক-কর্মী বেকার হয়ে পড়েছে। স্বৈরাচারের আমলে তো বটেই, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও দেশে দারিদ্র্য বেড়েছে। টিসিবির ট্রাকের পেছনে যে বিশাল লাইন প্রতিদিন দেখা যায়, তাতেই বুঝা যায়, দারিদ্র্য ও অভাব কতটা প্রকট আকার নিয়েছে। বহুদিন ধরেই বলা হচ্ছে, মূল্যস্ফীতি দেশের অর্থনীতির জন্য একটা বড় চ্যালেঞ্জ। বাস্তবতা হলো, এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আমরা সফল হতে পারিনি। ব্যর্থতার বৃত্তেই আমাদের ঘুরপাক খেতে হয়েছে। আর এখন তো মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির নতুন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। যাদের কাজ আছে, আয় আছে, কম বেশি ক্রয়ক্ষমতা তাদেরই আছে। যখন খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বাড়ে অথচ উপার্জিত অর্থে তা কেনার ক্ষমতা থাকে না, তখনই মূল্যস্ফীতির চাপটা অনুভব করা যায়। আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ অব্যাহতভাবে মূল্যস্ফীতির চাপের মধ্যে আছে।

নতুন করে মূল্যস্ফীতি বাড়লে বা তার আশংকা দেখা দিলে মানুষের উদ্বেগ-দুশ্চিন্তার অবধি থাকে না। এমনই একটি উদ্বেগ-দুশ্চিন্তার মধ্যে আমরা নিপতিত হয়েছি। আমাদের পণ্য বাজারের দিকে তাকালে দেখতে পাবো ডাল, চাল, তেল, মশলা, শাক-সবজি, মাছ, গোশতসহ এমন কোনো পণ্য নেই, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আছে। আলু বাদে কোনো তরিতরকারির দাম প্রতিকেজি ৮০ থেকে ১৬০ টাকার নিচে নয়। মাছ-গোশত মধ্যবিত্তেরই নাগালের বাইরে; নিম্নবৃত্ত, দরিদ্র, হতদরিদ্রের তো তা স্পর্শ করারই ক্ষমতা নেই। এহেন বাস্তবতায় অধিকাংশ মানুষের প্রয়োজনের তুলনায় কম কিনতে হচ্ছে, কম খেতে হচ্ছে। বাসাভাড়াসহ এমন কিছু খরচ আছে, যা কমানোর কোনো উপায় নেই। নির্দিষ্ট আয়ের মানুষকে তাই খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, শিক্ষা ইত্যাদি খাতের খরচ কমাতে বাধ্য হতে হচ্ছে।

মূল্যস্ফীতির খড়গ থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষা করার দায়িত্ব অবশ্যই সরকারের। যুদ্ধ ও অন্যান্য কারণে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির যে আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, তা কীভাবে শামাল দেয়া যায়, সরকারের নীতিনির্ধারকদের এখনই ভাবতে হবে। শুধু ভাবলেই হবে না, দ্রুত প্রয়োজনীয় কার্যব্যবস্থাও নিতে হবে। মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেতন বা মজুরি বৃদ্ধির কোনো ব্যবস্থা আমাদের দেশে নেই। এ ব্যবস্থা কার্যকর থাকলে সংশ্লিষ্টদের ওপর মূল্যস্ফীতি তেমন একটা বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারতো না। যারা কর্মজীবী, তারা তাদের আয় দিয়েই উচ্চমূল্যের পণ্যাদি কিনতে পারতো। অবশ্য যারা এই ব্যবস্থার আওতার বাইরে, তাদের মূল্যস্ফীতির যাঁতাকলে পড়তেই হতো। যেহেতু মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে বেতন বা মজুরি বাড়ানোর ব্যবস্থা আমাদের দেশের নেই, কাজেই মূল্যস্ফীতি মোকাবেলায় ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করতে হবে। প্রথমত, যাতে পণ্যমূল্য না বাড়ে, তার ব্যবস্থা নিতে হবে। চাহিদা মোতোবেক পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

আমাদের দেশের এক শ্রেণির ব্যবসায়ীর স্বভাবচরিত্র এই যে, তারা লোভ ও লাভের বশবর্তী হয়ে পণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে, দাম বাড়িয়ে অতিরিক্ত মুনাফা লুটে নেয়। তাদের রুখতে হবে। দ্বিতীয়ত, ব্যবসায়ীদের একাংশ সিন্ডিকেট করে, চাপ সৃষ্টি করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়। তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিতে হবে। সকল সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে হবে। তৃতীয়ত, কোন পণ্য কী পরিমাণ দেশে মজুদ আছে, তার চাহিদা কতটা, কতটা আমদানি করতে হবে, তার হাল নাগাদ তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। অতঃপর আমদানির প্রয়োজন হলে দ্রুত আমদানির পদক্ষেপ নিতে হবে। দরকারে আমদানি শুল্ক কমাতে হবে। এটা খাদ্যপণ্যসহ সকল পণ্যের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। চতুর্থত, কোনো পণ্যেরই যাতে অপচয় না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। পঞ্চমত, নিয়মিত বাজার তদারকির ব্যবস্থা করতে হবে। জরুরি ও বেশি প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যতালিকাও করে দেয়া যেতে পারে। আমরা আশা করি, সরকার গুরুত্বের সঙ্গে এ বিষয়ে যথোচিত পদক্ষেপ নেবে।

বাংলাদেশ বর্তমানে এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে বৈশ্বিক ভূরাজনীতি এবং জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা সরাসরি দেশের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। জ্বালানি আমদানিনির্ভর অর্থনীতি হওয়ায় এসব ধাক্কা পুরোপুরি এড়ানোর সুযোগ খুব সীমিত। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, শক্তিশালী নীতি সমন্বয়, ডলার বাজার স্থিতিশীল রাখা, খাদ্য ও জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা বাড়াতে পারলে সম্ভাব্য মূল্যস্ফীতির ঝড় কিছুটা হলেও মোকাবিলা করা সম্ভব। আগামী কয়েক মাসে বৈশ্বিক পরিস্থিতির ওপর অনেক কিছু নির্ভর করবে। কিন্তু একটি বিষয় স্পষ্ট- যদি আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে আবারও একটি কঠিন পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হতে পারে।

লেখক : অর্থনীতি বিশ্লেষক।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading