শেয়ার মার্কেটে তোলপাড় : ব্রোকারেজ হাউসে তালা দিয়ে মালিক লাপাত্তা, বিপদে ২৫ হাজার বিনিয়োগকারী!
উত্তরদক্ষিণ । ২৫ জুন ২০২০ । আপডেট : শুক্রবার ২৬ জুন ২০২০ । ১৫:০০
ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)র এক সদস্য ব্রোকারেজ হাউজের অফিসে তালা ঝুলিয়ে মালিক লাপাত্তা হয়ে গেছে। ওই প্রতিষ্ঠানের ২৫ হাজার বিনিয়োগকারীর মাথায় যেন বাজ পড়েছে। তাদের কোটি কোটি টাকার শেয়ার ও অর্থ কিভাবে উদ্ধার হবে সেটা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশা দেখা দিয়েছে। এ নিয়ে শেয়ার মার্কেটে তোলপাড় চলছে। নিজেদের শেয়ার ও অর্থ নিয়ে মহাবিপদে পড়েছেন ২৫ হাজার বিনিয়োগকারী।
ক্রেস্ট সিকিউরিটিস লিমিটেড নামের ওই ব্রোকারেজ হাউজের হেড অফিস ও ব্রাঞ্চ সহ সব অফিস বন্ধ। মালিকপক্ষের কাউকে পাওয়া যাচ্ছে না। ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নাম মো. শহিদ উল্লাহ। তাকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
ক্রেস্টের মোট গ্রাহক/বিনিয়োগকারীর সংখ্যা ২৫ হাজার। বিনিয়োগকারীরা নিজেদের শেয়ার ও টাকা নিয়ে এখন চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন।
বিনিয়োগকারীদের কোটি কোটি টাকা আত্মসাত হতে পারে অনেকে আশংকা করেছেন।
ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের ডিএসই’র ব্রোকার/ট্রেক হোল্ডার নং-০০৮ এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিস এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)র রেজিস্ট্রেশন নং-৩.১/ডিএসই-০৮/২০০৭/১৪৭।

প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকদের কোনো হদিস না পেয়ে বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) এ বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের পক্ষ থেকে পল্টন থানায় জিডি করা হয়েছে।
ডিএসই ও বিএসইসি’র পক্ষ থেকে দেরিতে হলেও কিছু ‘পদক্ষেপ’ নেয়া হয়েছে।
ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ নামের ওই ব্রোকারেজ হাউসের মাধ্যমে যারা পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করেছেন তারা পড়েছেন মহাবিপদে। হাউসটি আকস্মিক বন্ধ হওয়ায় বিনিয়োগকারী এখন তাদের টাকা তুলতে পারবেন না। এমনকি তাদের শেয়ার বেচাকেনাও করতে পারবেন না। এর ফলে নিজেদের নামে কেনা শেয়ার ও পাওনা অর্থ কিভাবে উদ্ধার হবে এ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন সিকিউরিটিজ হাউজটির বিনিয়োগকারীরা।
ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৬ সাল থেকে তারা শেয়ার মার্কেটে ব্যবসা করছে। হেড অফিস সহ ঢাকায় ৪টি, নারায়ণগঞ্জে ১টি ও কুমিল্লায় ১টি, মোট ৬টি অফিস রয়েছে ক্রেস্টের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ তাদের হেড অফিসসহ সমস্ত ব্রাঞ্চ অফিস বন্ধ করে দেয়ার বিষয়টি তারা জেনেছেন। এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। এক্ষেত্রে বিনিয়োগকারীদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়া হবে।
কোম্পানীর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো শহিদ উল্লাহ’র মোবাইল (০১৭১৩XXXXX6) নম্বরে একাধিকবার ফোন করে সেটা বন্ধ পাওয়া গেছে। ফলে মালিকপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এ অবস্থায় ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ ও এর পরিচালকদের ব্যাংক হিসাব জব্দের জন্য বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও ডিএসইর পক্ষ থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে চিঠি পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
বৃহস্পতিবার (২৫ জুন) এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংককে একটি চিঠি দেয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বিএসইসি।
জানা গেছে, ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের পাশাপাশি এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোঃ শহীদুল্লাহ এবং তার স্ত্রীর নামে থাকা ব্যাংক হিসাবও জব্দ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে বিএসইসির চিঠিতে।
বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে ব্যাংক হিসাব জব্দের এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন বিএসইসির নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মোঃ সাইফুর রহমান।
তিনি বলেছেন, ব্যাংক থেকে যাতে নতুন করে কোনো টাকা তুলে না নিতে পারে সে লক্ষ্যে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রকৃত ঘটনার অনুসন্ধান ও তদন্তের পর বিনিয়োগকারীদের স্বার্থে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ইতোমধ্যে সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ (সিডিবিএল) এ ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের ডিপি একাউন্ট স্থগিত করা হয়েছে, যাতে সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি লেনদেন করতে না পারে অথবা লিংক একাউন্টের মাধ্যমে অন্য ব্রোকারহাউজে শেয়ারে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব না হয়।
গত ২৩ জুন ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ সর্বশেষ লেনদেনে অংশ নেয়। প্রতিষ্ঠানটি ২১ জুন পর্যন্ত লেনদেন নিষ্পত্তি করতে সক্ষম হলেও পরের দুদিনের লেনদেন নিষ্পত্তি হয়নি। নিয়ম অনুসারে, ডিএসই বাজার থেকে শেয়ার কিনে ওই লেনদেন নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করে। এর মধ্যেই বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ব্রোকারহাউজটির প্রধান কার্যালয় ও শাখা অফিস বন্ধ করে দেওয়ার অভিযোগ আসায় ডিএসইতে লেন্দেন নিস্পত্তি হয়নি।
জানা গেছে, আগামী সপ্তাহের শুরুতেই রাজধানীর পল্টনে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয় নিজেদের জিম্মায় দেবে ডিএসই। এরপর বিনিয়োগকারীদের প্রাপ্য টাকা ও শেয়ারের তথ্য জানতে প্রতিষ্ঠানটিতে বিশেষ অডিট চালানো হবে। সিডিবিএলের কাছ থেকেও বিস্তারিত প্রতিবেদন নেবে ডিএসই।
মালিকপক্ষ যোগাযোগ করে সমস্যার সমাধানে এগিয়ে না এলে ডিএসই কর্তৃপক্ষ নিয়ম অনুসারে ক্রেস্ট সিকিউরিটিজের সদস্যপদ ও ট্রেক লাইসেন্স বিক্রি করে বিনিয়োগকারীদের প্রাপ্য টাকা ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিবে বলে ডিএসই সূত্রে জানা গেছে।
করোনাকালীন এই পরিস্থিতিতে বিনিয়োগকারীদের পাওনা অর্থ বকেয়া রেখে ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক আরো বেড়ে গেছে।
একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, ক্রেস্ট সিকিউরিটিজ নিয়ে বিএসইসি ও ডিএসইর কর্মকর্তারদের মধ্যে দফায় আলোচনা হয়েছে। ব্রোকারেজটির পরিচালকেরা যাতে দেশ ছেড়ে পালাতে না পারে সেজন্য বিষয়টি ইমিগ্রেশন পুলিশকে জানানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

