‘মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের’ নির্দেশে রিজেন্ট ও জেকেজি’র সঙ্গে চুক্তি : স্বাস্থ্য অধিদপ্তর
উত্তরদক্ষিণ । শনিবার, ১১ জুলাই ২০২০ । ২২:৩৭
নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সন্তোষজনক জবাব না দিয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর পাল্টা অভিযোগ করে বলছে, “ইদানিং কোনো কোনো স্বার্থান্বেষী মহল কল্পিত ও মিথ্যা তথ্য দিয়ে গণমাধ্যমকে বিভ্রান্ত করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সুনাম নষ্ট করার প্রয়াস চালাচ্ছেন। ”
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ডা. মো. জাহাঙ্গীর কবির স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা বলা হয়।
বিবৃতিতে রিজেন্ট হাসপাতাল ও জেকেজি হেলথ কেয়ারের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে সমালোচনার মুখে থাকা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ‘ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের’ নির্দেশে মোহাম্মদ সাহেদের ওই হাসপাতালের সঙ্গে চুক্তি করেছিলেন তারা।
অপরদিকে জেকেজির বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বক্তব্য হচ্ছে, আগে থেকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কাজে জড়িত ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠান ওভাল গ্রুপ লিমিটেডের মালিক আরিফুল চৌধুরী ও তার স্ত্রী ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরীর ওই প্রতিষ্ঠান (জেকেজি) এভাবে প্রতারণা করবে তা তাদের (স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের) ধারণায় ছিল না।

বিবৃতিতে বলা হয়, “রিজেন্ট হাসপাতালের প্রতিষ্ঠানটির স্বত্ত্বাধিকারী মো. সাহেদ করিমের বিভিন্ন প্রতারণার বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আগে অবহিত ছিল না। দেশে কোভিড-১৯ রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেলে কোনো বেসরকারি হাসপাতাল কোভিড রোগী ভর্তি করতে চাইছিল না। এ অবস্থায় রিজেন্ট হাসপাতাল উত্তরা ও মিরপুরে অবস্থিত ওই নামের দুটি ক্লিনিককে কোভিড হাসপাতাল হিসেবে ডেডিকেটেড করার আগ্রহ প্রকাশ করে।”
এতে আরও বলা হয়, “মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হাসপাতাল বিভাগ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেয়। ক্লিনিক দুটি পরিদর্শনের সময় চিকিৎসার উপযুক্ত পরিবেশ দেখলেও লাইসেন্স নবায়ন ছিল না। বেসরকারি পর্যায়ে কোভিড-১৯ আক্রান্তদের চিকিৎসায় অন্য বেসরকারি হাসপাতালগুলোকেও উৎসাহ দেওয়ার লক্ষ্যে লাইসেন্স নবায়নের শর্ত দিয়ে রিজেন্ট হাসপাতালের সাথে চুক্তি হয়।”

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “২১ মার্চ তারিখে এই সমঝোতা স্বারক স্বাক্ষরের পূর্বে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক পরিচয় থাকা তো দূরের কথা টক শো ছাড়া কখনও মো. সাহেদকে দেখেননি। তবে সমঝোতা স্বারক স্বাক্ষরের পর বেশ কয়েকবার তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে এসেছিলেন। এ সময় মো. সাহেদ তার সাথে বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ আছে এবং তার ক্লিনিকগুলোয় কোন কোন বিশিষ্ট ব্যক্তির আক্রান্ত আত্মীয় ভর্তি আছেন সেসব কথা বলার চেষ্টা করতেন।”
বাংলাদেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণের শুরুর দিকে প্রথম বেসরকারি হাসপাতাল হিসেবে এই রোগের চিকিৎসা দিতে এগিয়ে আসে রিজেন্ট হাসপাতাল। তবে তাদের পরীক্ষা না করেই করোনাভাইরাসের ভুয়া প্রতিবেদন দেওয়ার ‘প্রমাণ পেয়ে’ গত সপ্তাহে ওই হাসপাতালে অভিযান চালায় র্যাব। প্রায় ছয় হাজার ব্যক্তির কাছ থেকে কোটি টাকার বেশি হাতিয়ে তারা এভাবে ভুয়া প্রতিবেদন দেওয়ার প্রমাণ পাওয়ার কথা র্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে।

করোনাভাইরাসের ভুয়া প্রতিবেদন দেওয়া ছাড়াও আরও অনিয়মের প্রমাণ পেয়ে ওই হাসপাতাল সিলগালা করে দেয় র্যাব। পরে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে উত্তরা ও মিরপুরে হাসপাতাল দুটি বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়।
অপরদিকে জোবেদা খাতুন হেলথ কেয়ারকে (জেকেজি) নমুনা সংগ্রহের অনুমতি দেওয়ার ব্যাখ্যায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বিবৃতিতে বলা হয়, “জেকেজির প্রধান সমন্বয়ক আরিফুল চৌধুরী ওভাল গ্রুপ লিমিটেড নামে একটি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট প্রতিষ্ঠানের মালিক। ওভাল গ্রুপ ২০১৮ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা সপ্তাহ ২০১৮, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের একাধিক অনুষ্ঠান আয়োজনের দায়িত্ব পালন করে। কোভিড সঙ্কট শুরু হওয়ার পর আরিফুল হক জানান, জেকেজি গ্রুপ দক্ষিণ কোরিয়ার মডেলে বাংলাদেশে কিছু বুথ স্থাপন করতে চায়। এসব বুথের মাধ্যমে নমুনা সংগ্রহ করে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গবেষণাগারে সরবরাহ করবে। এজন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বা সরকারকে কোনো অর্থ দিতে হবে না। ধারণাটি ভালো এবং কোভিড পরীক্ষার নমুনা সংগ্রহ বৃদ্ধি করার প্রয়োজন এই বিবেচনা থেকে ওভাল গ্রুপের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা থাকায় জেকেজি গ্রুপকে অনুমতি দেওয়া যায় বলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মনে হয়। পরবর্তীতে প্রতারণার অভিযোগ পাওয়ায় বুথ পরিচালনার অনুমতি বাতিল করে।”

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বলছে, “দ্রুত কোভিড-১৯ স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের মূল লক্ষ্য ও সদিচ্ছা নিয়ে জেকেজিকে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটি প্রতারণা করতে পারে এমন ধারণা আদৌ ছিল না।”
কোভিড-১৯ পরীক্ষা নিয়ে কয়েক হাজার মানুষের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগে জেকেজি হেলথ কেয়ারের প্রধান নির্বাহী (সিইও) আরিফুল চৌধুরী গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন।
এই দুই প্রতিষ্ঠানকে করোনাভাইরাসের চিকিৎসা ও নমুনা পরীক্ষার অনুমতি দেওয়া এখন চরিত্র হননের চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

