কোরবানির পশুর চাহিদা নিয়ে সংশয়, ক্ষতির আশঙ্কায় খামারিরা
উত্তরদক্ষিণ । শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২০ । আপডেট: ২২:০৫
সানজানা চৌধুরী: করোনাভাইরাস মহামারীর কারণে বড় ধরণের ক্ষতির আশঙ্কায় আছেন বাংলাদেশের প্রান্তিক পর্যায়ের খামারিরা। সারাবছর কসাই খানায় গরু বিক্রির সুযোগ থাকলেও ক্ষুদ্র খামারিদের লক্ষ্য থাকে কোরবানির হাটে বেশি লাভে পশু বিক্রি করার। বিশেষ করে যারা কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে একটি বা হাতে গোনা কয়েকটি গরু লালন পালন করছেন, তারা এ বছর উপযুক্ত দামে গরু বিক্রি করতে পারবেন কিনা, সেটা নিয়ে সংশয়ে আছেন।
মানিকগঞ্জ জেলার ফোর্ডনগর গ্রামের বাসিন্দা আফরোজা আক্তার গত সাত মাস ধরে দুটি গরু লালন পালন করে আসছেন। গরু দুটি তিনি কিনেছিলেন ৭০ হাজার টাকায়। প্রতি মাসে এই গরুর পেছনে তার খরচ হয়েছে চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা। তিনি ভেবেছিলেন এবারের কোরবানির ঈদে ঢাকার পশুর হাটে ভালো দামে তার গরু দুটি বিক্রি করে লাভ তুলে নেবেন। কিন্তু করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণে লাভ তো দূরে থাক, এই গরু বিক্রি করে সারা বছরের খরচটাও তুলতে পারবেন কিনা সেটা নিয়েই সন্দেহে আছেন।
“আমার তো ইচ্ছা ছিল অন্তত দেড় লাখ টাকায় গরু দুটো বেচবো। আগের বছরগুলায় এমন দামেই বিক্রি করসি। কিন্তু করোনার কারণে এবারে ওই দাম পাবো না। কিন্তু বিক্রি তো করতেই হবে। আরও এক বছর এই গরু খাওয়া চালানো সম্ভব না,” বলেন মিসেস আক্তার।
করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে ফেসবুক পেজসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে কোরবানির পশু বেচাকেনার বিষয়টি নতুন করে সামনে এলেও সেটার সেবা প্রান্তিকে পৌঁছাতে পারছে না। সরকারি বেসরকারি উদ্যোগে অনেকেই অনলাইনে ছবি পোস্ট করে এমনকি লাইভ ভিডিও দেখিয়ে কোরবানির পশু বেচাকেনা শুরু করেছে।
এরিমধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পশুর হাট বসবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন। জনস্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে জেলা পর্যায়ের কোরবানির হাটও আগের মতো জমে উঠবে না বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে হাটে না গিয়ে এসব অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছে সরকারের বিভিন্ন মহল। এনিয়ে ব্যাপক প্রচারণা দেখা গেলেও অনলাইনে কোরবানির পশু বেচাকেনার বিষয়টি নিয়ে পরিচিত নন প্রান্তিক খামারিরা। আবার ক্রেতারাও অনলাইনে পশু কেনার ব্যাপারে অভ্যস্ত নন।
এমন অবস্থায় ওই অনলাইন প্ল্যাটফর্মে যারা কাজ করেন, তারা চেষ্টা করছেন ক্ষুদ্র খামারিদের বোঝাতে যে কিভাবে তারা হাটে না গিয়েই পশু বিক্রি করতে পারবেন। কিন্তু প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব থাকায় তারা এই উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও ভরসা করতে পারছেন না।
এমনই এক অনলাইনে গরু বেচাকেনা প্রতিষ্ঠানের নির্বাহী টিটো রহমান বলেন, “আমরা যখন মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের বলি হাটে না গিয়ে ঘরে বসেই গরু বিক্রি করতে পারবেন, ওরা হাসাহাসি করে, কেউ বিশ্বাস করতে চায় না। তাদের কথা হল, এটা কিভাবে সম্ভব।” আবার হাটে যাওয়ার সংস্কৃতি থেকে বেশিরভাগ মানুষ বের হয়ে না আসায় অনলাইনে পশু বিক্রি করতেও বেশ বেগ পেতে হচ্ছে বলে তিনি জানান। “আমাদের দেশের মানুষ হাটে গিয়ে দশটা গরু নেড়েচেড়ে একটা গরু কিনতে চায়। অনলাইনে পশুর বিস্তারিত সব তথ্য দেয়া সত্ত্বেও ন্যায্য দাম রাখা সত্ত্বেও কেউ সেভাবে কিনতে আসছে না,” বলেন টিটো।
চলমান পরিস্থিতিতে অনেক মানুষের আয় কমে যাওয়ায় কোরবানির পশুর চাহিদাও আগের চাইতে কমে আসবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। অনেকে আবার স্বাস্থ্যবিধির কারণে পশু কেনা থেকে বিরত থাকবেন। সব মিলিয়ে ক্ষুদ্র খামারিরা এবার লোকসানের মুখে পড়তে পারেন বলে আশঙ্কা করছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী স ম রেজাউল করিম। কারণ, এই মানুষগুলোর জন্য আলাদা প্রণোদনার কোনও ব্যবস্থা নেই।
তবে বেশিরভাগ খামারি যেন ক্ষতি পুষিয়ে উঠতে পারেন, সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়ার কথা জানান তিনি। মন্ত্রী বলেন, “ক্ষুদ্র খামারিরা যেন তাদের বাড়িতে বসেই অনলাইনে পশু বিক্রি করতে পারে। আমরা সেটাই চেষ্টা করছি। মন্ত্রণালয় চেষ্টা করছে আর্থিক প্রণোদনা দেয়ার। যেটা কখনোই তাদেরকে ফেরত দিতে হবে না।”
করোনাভাইরাসের দুই মাসের বেশি সময় হাট-বাজার বন্ধ থাকায় পশু বেচা-কেনা ছিল একেবারে কম। তাই এবারের বাজারে গবাদি পশু অন্যান্য বছরের চাইতে বেশি উঠবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু সেই পশুর ন্যায্য মূল্য খামারিরা তুলতে পারবেন কিনা, সেটা বলা যাচ্ছে না।
এমন পরিস্থিতিতে স্থানীয় তরুণদের সাহায্যে প্রান্তিক খামারিদের কাছে অনলাইন সেবাটি ছড়িয়ে দেয়ার ওপর জোর দিয়েছেন বাজার বিশ্লেষক সায়মা হক বিদিশা। তিনি বলেন, “এবারে অনেক গরু অবিক্রীত থাকবে কিংবা ন্যায্য মূল্য পাওয়া থেকে খামারি বঞ্চিত হবে। তাই প্রান্তিক পর্যায়ে শিক্ষিত যে তরুণরা আছে, প্রশাসন তাদেরকে কাজে লাগিয়ে এই অনলাইন বেচাকেনা চালু করতে পারে। মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলোকেও এগিয়ে আসতে হবে।”
ক্ষুদ্র খামারিদের জন্য সরকারের আলাদা কোন প্রণোদনা না থাকায় ক্ষুদ্র ঋণ সুবিধাগুলো কার্যকরের ওপর কথা বলছেন তিনি। “কিছু কিছু ঋণের প্রকল্প আছে। এসব প্রকল্পের আওতায় যদি ক্ষুদ্র খামারিদের স্বল্প সুদে ঋণ দেয়া যায়, তাহলে তারা ক্ষতি অনেকটাই পুষিয়ে তুলতে পারবেন,” বলেন মিসেস বিদিশা।
এছাড়া করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণে কোরবানির পশু পরিবহন, বিপণন, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ক্ষেত্রে এ বছর বেশি খরচ হচ্ছে। এই বাড়তি খরচ সরকারকে বহন করার কথাও জানান তিনি। সৌজন্যে: বিবিসি বাংলা।

