কোভিড চিকিৎসকদের আবাসন: সরকারের নতুন সিদ্ধান্তে মিশ্র প্রতিক্রিয়া
উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট ২০২০ । আপডেট: ১৩:৩০
করোনাভাইরাস (কোভিড-১৯) চিকিৎসায় নিয়োজিত চিকিৎসক, নার্সসহ অন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের সরকারি ব্যবস্থাপনায় আবাসিক হোটেলে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা ছিল এতদিন। সরকারের নতুন সিদ্ধান্তে সেই সুযোগ বাতিল করা হয়েছে। অবশ্য আলাদা ভাতার ব্যবস্থা থাকবে এক্ষেত্রে। কিন্তু আবাসন নিজ ব্যবস্থাপনায় ঠিক করে নিতে হবে চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের। আর যে কয়দিন ডিউটি থাকবে ভাতা দেয়া হবে ঠিক ততদিনের। হোম কোয়ারেন্টাইনে থাকতে হলে সে জন্য কোনও বাড়তি সুবিধা মিলবে না সরকার থেকে। এমন সিদ্ধান্তে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। কেউ কেউ ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। বিষয়টি আত্মঘাতী, চিকিৎসকদের জন্য অপমানজনক এ হতাশার বলেও মন্তব্য করেছেন কেউ কেউ। তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় দেখাচ্ছে ভিন্ন যুক্তি।
স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, এখন থেকে যেসব চিকিৎসক হোটেলে অবস্থান করবেন, পরবর্তী সময়ে সরকারের আর্থিক নীতি অনুসরণ করে তাদের নির্ধারিত ভাতা দেওয়া হবে। গত ২৯ জুলাই স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. আবদুল মান্নান স্বাক্ষরিত এ-সংক্রান্ত একটি পরিপত্র জারি করা হয়।
পরিপত্র অনুযায়ী, রাজধানী ঢাকার মধ্যে দায়িত্ব পালনকারী চিকিৎসকরা দৈনিক দুই হাজার টাকা এবং ঢাকার বাইরে এক হাজার ৮০০ টাকা ভাতা পাবেন। একইভাবে নার্সরা ঢাকার মধ্যে এক হাজার ২০০ ও ঢাকার বাইরে এক হাজার টাকা এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী ঢাকার মধ্যে ৮০০ ও ঢাকার বাইরে ৬৫০ টাকা ভাতা পাবেন।

এদিকে, হোটেলে থাকার সুযোগ বন্ধ করে দেওয়াটা ‘আত্মঘাতী’ সিদ্ধান্ত বলে মন্তব্য করেছেন চিকিৎসকদের কেউ কেউ। তাদের ভাষ্য, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দায়িত্ব পালন করার পর এ ধরনের সিদ্ধান্ত আসায় হতাশা কাজ করছে।
এ বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের করোনা ইউনিটে দায়িত্ব পালনরত একজন চিকিৎসক নাম প্রকাশ না করার শর্তে গণমাধ্যমকে বলেন, ‘সরকার নতুন পরিপত্রে বলেছে, হোটেলে আর রাখবে না। নিজ দায়িত্বে থাকতে হবে। নিজ দায়িত্বে থাকাকালীন যে কয়েক দিন ডিউটি থাকবে, সেটার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কিন্তু ডিউটি শেষে ১৪ দিনের কোয়ারেন্টিনে যেতে হবে। এ সময়ের জন্য কোনো বরাদ্দ নেই। তখন আমি বাসায়ও যেতে পারব না। কারণ, আমার বৃদ্ধ বাবা-মা রয়েছেন এবং পরিবার-পরিজন রয়েছে। এটি একটি ‘আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত’।’ তার মতে, ‘জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসকরা সেবা দিবেন। সরকারের উচিত, যেহেতু বরাদ্দ দিতে পারবে না, চিকিৎসকদের করোনা ইউনিটে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা দেওয়া।’
বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ)-এর হিসাব অনুযায়ী, সোমবার (৩ আগস্ট) পর্যন্ত চিকিৎসক, নার্সসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন মোট ৭ হাজার ১২৩ জন। এরমধ্যে চিকিৎসক ২ হাজার ৪৭৫ জন, নার্স ১ হাজার ৮০৭ জন এবং অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী ২ হাজার ৮৪১ জন। আক্রান্তদের মধ্যে এ পর্যন্ত মারা গেছেন ৬৯ জন চিকিৎসক, ১১ জন নার্স এবং ৭ জন অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী।
অপর একটি সূত্র বলছে, দেশে এ পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়ে ও করোনার উপসর্গ নিয়ে অন্তত ১০০ জন চিকিৎসক মারা গেছেন। এর মধ্যে ঈদের দিন মারা গেছেন মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের গাইনি বিভাগের সিনিয়র কনসালটেন্ট ডা. আব্দুল আউয়াল।
চিকিৎসক নেতা ও কোভিড-১৯ বিষয়ক অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান বলেন, ‘বাংলাদেশের তরুণ চিকিৎসকরা অনেকেই একসঙ্গে থাকে মেসের মতো করে। তারপরও যাদের নিজেদের বাসা রয়েছে সেগুলোও এমন নয় যে, একেবারেই আইসোলেশনে গিয়ে তারা থাকতে পারবেন।’ চিকিৎসকদের থাকার ব্যবস্থা বাতিল করার বিষয়টি এভাবে হঠাৎ করে কেন করা হলো প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, ‘আরও চিন্তা ভাবনার দরকার ছিল। সরকারের আর্থিক সাশ্রয়ের অজুহাত তুলে কারা এই পরামর্শ দিলো সেটাও বের করা জরুরি।’
বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ)-এর মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী বলেন, ‘আমরা ঈদের ছুটি শেষ হওয়ার অপেক্ষা করছিলাম। মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) মন্ত্রণালয়ের এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে জরুরি বিশেষ সভা আছে। সেখানেই আমরা আমাদের সিদ্ধান্ত নেবো।’
চিকিৎসকদের সংগঠন ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি রাইটস অ্যান্ড রেসপন্সসিবিলিটি (এফডিএসআর)-এর মহাসচিব ডা. শেখ আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘এটা খুবই অপমানজনক। দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ব্যক্তিগত উদ্যোগে বিকল্প আবাসন কীভাবে করবেন চিকিৎসকরা?’ ডা. মামুন আরও বলেন, ‘কোভিড হাসপাতালে দায়িত্ব পালনকারী চিকিৎসকসহ অন্য স্বাস্থ্যকর্মীরা ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন। তারা মানসিক উৎকণ্ঠার ভেতরে থাকেন। তার ওপর মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্ত তাদের আরও মানসিক এবং শারীরিক ঝুঁকিতে ফেলবে।’
এ বিষয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুল মান্নান বলেন, ‘যিনি যে অবস্থাতেই থাকুন না কেন, সরকারি কর্মচারী বিধি অনুযায়ী তাদের ভাতা দেওয়া হবে।’ চিকিৎসকদের বাসা নিশ্চয়ই এক রুমের নয় জানিয়ে সচিব আব্দুল মান্নান বলেন, ‘ইচ্ছে করলেই তারা মাস্ক পরে আইসোলেটেড থাকতে পারেন। তারতো লক্ষণ নেই। আর ১৫ দিন বাসায় থাকার কথা বলা হচ্ছে। ইচ্ছে করলেই এখন করোনার পরীক্ষা করিয়ে থাকতে পারবেন। এখন তো একদিনেই ফলাফল পাওয়া যায়। টেস্ট করিয়ে নিশ্চিত হতে পারবেন।’

