নারায়ণগঞ্জের কিশোরী জিসা ধর্ষণ ও হত্যার ‘লোমহর্ষক’ কাহিনী!
উত্তরদক্ষিণ । সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২০ । আপডেট: ১৮:৩৫
রেখা আক্তার। স্বামীর অভাবের সংসারে সুখের রেখা টানতে সেলাই মেশিনে বাসায় বসে কাজ করেন। হোসিয়ারি গার্মেন্টসে স্বামী কাজ করে যা রোজগার করেন তা দিয়ে সংসার চালানো অনেক কষ্টের। দুই মেয়ে লেখাপড়া করে। কোন ছেলে নেই তাদের। বড় মেয়ে এবার এসএসসি পাশ করেছে। ছোট মেয়ে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। ছেলে না থাকলেও মেয়েদেরকে কোন কাজে দেননি তারা। মাঝে মাঝে অভাবের সংসারে বড় মেয়ে পড়ালেখা ছেড়ে মায়ের সাথে কাজ করতে চাইতো। কিন্তু রেখা আক্তার সুস্থ থাকতে সেটা করতে দিতে রাজি হন না। রাতে যখন নিস্তব্ধ শহর, তখনও রেখা সেলাই মেশিনে সুতার রেখা টেনে চলেন কাপড়ে। তবে আজকের গল্পটা অন্যরকম রোমহর্ষক।
আদরের দুই মেয়ে জেরিন ও জিসা। ছোট্ট সংসারে অভাব থাকলেও সুখ ছিল। খুব বেশি চাওয়া নেই তাদের। করোনার কারণে গার্মেন্টস বন্ধ হলেও রেখা ঠিকই সংসার সামলেছেন দিন-রাত কাজ করে। ছোট্ট ঘরে চারটি প্রাণ নিয়ে কখনও কারো নিকট হাত পাতেননি। করোনার কারণে যে গার্মেন্টস বন্ধ ছিল তা এখন খোলা হয়েছে। স্বামী জাহাঙ্গীর কাজ করে উপার্জন করছে। এখন তাদের অভাব নেই। তবে ঘটনার শুরু ৪ জুলাই, সন্ধ্যার পর থেকে। ছোট মেয়ে জিসা (১৪) কে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কোথায় গিয়েছে, কার সাথে গিয়েছে কিছুই জানে না পরিবার। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী এমন কারো ঘর নেই যেখানে খোঁজা হয়নি তাকে। কিন্তু তারা জানেনা কেউ হারিয়ে গেলে নিকটস্থ থানায় সংবাদ দিতে হয়। কেউ একজন বলেছিল থানায় জিডি করতে। জিসানের মা-বাবা খুব বেশি কর্ণপাত করেনি সে কথায়।
অবশেষে ১৭ জুলাই নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানায় গিয়ে মেয়ের নিখোঁজ জিডি করেন দেওভোগ এলাকার রেখা আক্তার। তদন্তকারী অফিসার এসআই শামীম আল মামুন। ঘটনার ১৩ দিন পর জিডি হলেও থেমে থাকেননি তিনি। বারবার রেখা আক্তারের পরিবারের সদস্যদের জিজ্ঞাসাবাদ ও গোপন অনুসন্ধান অব্যাহত রাখেন। জিসা কোন মোবাইল ফোন ব্যবহার করত না। শুধুমাত্র রেখা আক্তারের একটি মোবাইল ফোন ব্যবহার করত পরিবারের সকল সদস্য। তথ্য প্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে কোন ফল পাওয়া যাবে কিনা সেটাও ছিল অনিশ্চিত। তবুও এগিয়ে যান তদন্তকারী অফিসার।
তথ্য প্রযুক্তির সহায়তা এবং বিভিন্ন সোর্স থেকে তথ্য সংগ্রহ করে সন্দেহ করা হয় অটো রিক্সা চালক রকিবকে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাকে নেয়া হয় থানায়। পাওয়া যায় ঘটনার কিছু সূত্র। সে অনুযায়ী ৬ আগস্ট অপহরণ মামলা রুজু হয় থানায়। অতঃপর আটক করা হয় আব্দুল্লাহকে। এদের কাউকে চিনে না জিসার মা রেখা আক্তার ও পরিবারের অন্যরা। তাদের সাথে কোনও পূর্ব শত্রুতাও নেই। তবে তারা কেন অপহরণ করবে জিসাকে? প্রশ্ন থেকেই যায়। এগুতে হবে তদন্তকারী দলকে।
রকিব ও আব্দুল্লাহকে বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে দুই দিনের পুলিশ রিমান্ডে আনা হয়। এবার নতুন তথ্য পাওয়া যায় আব্দুল্লাহর নিকট থেকে। ঘটনার সময় নারায়ণগঞ্জ ইস্পাহানী ঘাট থেকে জিসাকে নিয়ে আব্দুল্লাহ একটি ছোট বৈঠা চালিত নৌকা ভাড়া করেছিল। তখন রাত অনুমান ৯টা। রাত ১২টার দিকে ফিরে এসেছিল আব্দুল্লাহ। তবে ফিরে আসেনি জিসা। আর তার পুরো ঘটনা জানতে হলে যেতে হবে সেই মাঝির নিকট। তবে সে মাঝির নাম জানে না আব্দুল্লাহ। পুলিশ সুপার নারায়ণগঞ্জ নির্দেশে নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার টিম ও সংশ্লিষ্ট সার্কেল অফিসার একসাথে কাজ শুরু করেন পুরো রহস্য উদ্ঘাটনে।
ইস্পাহানী ঘাটে থাকা বৈঠা দ্বারা চালিত ১২টি নৌকার মাঝিকে একযোগে জিজ্ঞসাবাদের জন্য আটক করা হয়। হাজির করা হয় আব্দুল্লাহর সামনে। এক এক করে মাঝিকে দেখানো হয় তাকে। এবার খুঁজে পাওয়া যায় সেই মাঝিকে, নাম খলিলুর রহমান ওরফে খলিল। এরপর আটক করা হয় তাকেও। গ্রেপ্তারকৃত তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসে ঘটনার আদ্যোপান্ত।
জিসা খুব সহজ সরল এবং চরম বিশ্বাস প্রবণ একটি মেয়ে। সবাইকে খুব সহজেই বিশ্বাস করত। আব্দুল্লাহ’র কোনও নির্দিষ্ট পেশা নেই। অনেকটা ভবঘুরে স্বভাবের। জিসাদের বাড়ির পাশে একটি চায়ের দোকানে কাজ করেছে কিছুদিন। সেখান থেকেই পরিচয় হওয়ার পর জিসা তাকে দিয়েছিল তার মায়ের মোবাইল নম্বর। আব্দুল্লাহর নিজের কোনও মোবাইল নেই। এরপর সুযোগ পেলে অন্য কোনও মোবাইল থেকে তাদের কথা হতো মাঝে মাঝে। ঘটনার দিন সন্ধ্যায় আব্দুল্লাহ অটো রিক্সা চালক রকিবের মোবাইল ফোন থেকে ফোন দিয়ে কথা বলে জিসার সাথে। ঘুরতে যাওয়ার কথা বলে রকিবের অটোতে শহরের বিভিন্ন স্থানে ঘুরে রাত ৯টায় ইস্পাহানী ঘাটে যায় তারা।
রকিব তাদেরকে নামিয়ে দিয়ে চলে আসে। রাতের নদীতে ভ্রমণের আনন্দ নিতে খলিলের নৌকা ৩০০ টাকায় ভাড়া করে আব্দুল্লাহ। নদীর মাঝে ঘুরতে ঘুরতে একসময় আব্দুল্লাহ ঝাঁপিয়ে পড়ে জিসার উপর। নিজেকে রক্ষা করতে প্রাণপণে চেষ্টা করে জিসা। কিন্তু জিসার শক্তির সাথে পেরে ওঠে না আব্দুল্লাহ। সাহায্য করে মাঝি খলিল। জিসা’র দুপা ধরে রাখে সে। আর আব্দুল্লাহ জোর পূর্বক ধর্ষণ করে রক্তাক্ত করে জিসাকে। তার গগণবিদারী হাহাকার রাতের আঁধারের নদীতে কেউ শোনেনি। মুখ বন্ধ করে ধরে রাখে আব্দুল্লাহ। তারপর রক্তাক্ত দেহে আবার ধর্ষণ করে মাঝি খলিল। জিসা তখন ক্লান্ত ও অবসন্ন। ধর্ষণের আঘাতে চরম ক্ষতিগ্রস্ত তার শরীর। যন্ত্রণায় কাতর জিসা শুধু বলে বাড়িতে গিয়ে সব বলে দিবে। এমন কথায় ভয় পেয়ে যায় আব্দুল্লাহ ও খলিল।
এবার নতুন মিশনে নামে তারা দু’জন। জিসার গলা টিপে ধরে আব্দুল্লাহ আর পা চেপে রাখে খলিল। একসময় নিস্তেজ হয়ে যায় জিসার দেহ। প্রাণ চলে যায় দূর আকাশে। পড়ে থাকে দেহ রাতের আঁধারে নদীর বুকে খলিল মাঝির নৌকায়। স্রোতাস্বিনী শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেয় জিসা’র মরদেহ।
৯ আগস্ট বিজ্ঞ আদালতে নির্মম এ খুনের রোমহর্ষক বর্ণনা দিয়ে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছে গ্রেপ্তারকৃত আসামি আব্দুল্লাহ (২২), রকিব (১৯) ও খলিলুর রহমান (৩৬)। পুলিশ সদরদপ্তর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, আদালতের নির্দেশে আসামিরা এখন জেলখানায় বন্দি। মা রেখার জীবনে আর ফিরে আসবে না জিসা। এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি জিসার লাশ। শেষ দেখাও হবে কিনা জিসার মুখটা তাও অনিশ্চিত। তবে জিসার পরিবার কখনো ভাবতে পারেনি তাদের জিসা এমন নির্মম ধর্ষণ ও খুনের শিকার হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে জিসা আর নেই পৃথিবীতে। এখন তার পরিবার ধর্ষক ও হত্যাকারীদের উপযুক্ত শাস্তিই দাবি করছেন শুধু। এছাড়া তাদের আর কিবা চাওয়ার আছে!

