দেয়ালের আস্তরের নিচে কঙ্কাল : তদন্তে পুলিশ
উত্তরদক্ষিণ | সোমবার, ০৫ অক্টোবর, ২০২০ | আপডেট: ১২:৩৭
রাজধানীর শ্যাওড়াপাড়ায় এক বাড়িতে দেয়ালের আস্তরের নিচে একটি কঙ্কাল পাওয়া গেছে। লাশ গুম করার এই কৌশল পুলিশকে ভাবিয়ে তুলেছে। ওই ব্যক্তি কে? তিনি নারী, নাকি পুরুষ? কীভাবে তিনি মারা গেলেন? কে লাশটি এভাবে গুম করল?- তার কিছুই এখনও জানা যায়নি। গত ১৭ সেপ্টেম্বর কঙ্কালটি উদ্ধারের পর তার ডিএনএ পরীক্ষা করতে দেওয়া হয়েছে, সেই পরীক্ষার প্রতিবেদনের অপেক্ষায় আছে পুলিশ।
আর বাড়িওয়ালাও কোনো তথ্য দিতে না পারায় পাঁচতলা ওই বাড়ির নিচ তলার ফ্ল্যাটে এর আগে কারা কারা ভাড়া ছিলেন, পুলিশ নেমেছে তাদের খুঁজতে। কঙ্কালটি পাওয়া গেছে পশ্চিম শেওড়াপাড়ার ৩৮৯ নম্বর বাড়ির নিচতলার বাথরুমের ফলস্ সিলিংয়ে।
মিরপুর মডেল থানার এসআই শফিকুল ইসলাম বলেন, লাশটি প্লাস্টিকে মোড়ানোর পর ফলস ছাদের দেয়ালে গর্ত করে তা রেখে উপরে সিমেন্ট-সুড়কি দিয়ে প্লাস্টার করে দেওয়া হয়েছিল।
কঙ্কাল উদ্ধারের পর পুলিশ বাদী হয়ে একটি হত্যা মামলা করেছে, তার তদন্ত করছেন এসআই শফিকুল। তিনি বলেন, “হত্যার পর খুনি শুধু পলিথিন দিয়ে লাশ মোড়ায়নি, চা পাতাও দিয়ে রেখেছিল। ফলে লাশের গন্ধ বের হয়নি। কঙ্কালের পাশে কোনো কাপড় বা এমন কিছু পাওয়া যায়নি, যা তদন্তের জন্য সহায়ক হতে পারত।”
পাঁচতলা ও্ই বাড়ির মালিক হানিফ সরকার জানান, এটি নির্মাণ কাজ ১৯৯০ সালের দিকে শুরু করেছিলেন। নিচতলার কাজ শেষ হলে ১৯৯৩ সালে তিনি নিজেই পরিবার নিয়ে ওঠেন। দোতলা হলে ১৯৯৬ সালে নিচতলা থেকে তিনি দোতলায় ওঠেন। তারপর থেকে নিচতলায় ভাড়াটিয়ারাই থাকছেন।
বর্তমান ভাড়াটিয়া শ্যামল খান সম্প্রতি পানির সমস্যায় পড়ার কথা বাড়িওয়ালাকে জানালে তিনি মিস্ত্রি পাঠান। হানিফ বলেন, “মিস্ত্রি পানির সমস্যা বুঝতে বাথরুমের ফলস্ সিলিং’র উপরে উঠে একটু ভেতরে দেয়াল কাটতে গিয়ে সিমেন্ট, সুড়কি দিয়ে রীতিমত প্লাস্টার করা কঙ্কাল দেখতে পান।”
এরপরেই বিষয়ট নিয়ে হৈ চৈ শুরু হয়। পুলিশ এসে কঙ্কাল উদ্ধার করে সোহরাওয়াদী মেডিকেল কলেজ মর্গে পাঠান। যার কঙ্কাল, সেই ব্যক্তি কত দিন আগে মারা যেতে পারেন- জানতে চাইলে সোহরাওয়ার্দীর ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সেলিম রেজা বলেন, কমপক্ষে তিন মাস না হলে মৃত মানুষের দেহ এমন কঙ্কালে রুপ ধারণ করে না।
বাড়িওয়ালা হানিফ জানান, ২৪ বছর আগে তিনি নিচ তলা ছাড়ার পর এক ভাড়াটিয়া ৩/৪ মাস ছিল। এরপর আদম আলী নামে এক ব্যাংকার পরিবার নিয়ে ওঠেন, তারা ছিলেন ২০ বছরের মতো। ২০১৬ সালের দিকে আদম আলী বাসা ছেড়ে দেওয়ার পর সংস্কার কাজের জন্য বেশ কিছুদিন বাড়িটি ফাঁকা ছিল। তখন মিস্ত্রিরা কাজ করেছিল। পরে নোমান নামে এক ব্যক্তি সপরিবারে ছিলেন নয় মাসের মতো। এরপর বর্তমান ভাড়াটিয়া ওই বাসায় ওঠেন।
তদন্ত কর্মকর্তা শফিকুল বলেন, প্রথম ভাড়াটিয়ার কোনো তথ্য পাওযা যায়নি। পরের দুজন এবং বর্তমান ভাড়াটিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তাদের বিষয়ে খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া যে ভাড়াটিয়া প্রথম ছিলেন, তাকেও খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, “যে ভাড়াটিয়া দীর্ঘ সময় ছিলেন, তিনি চলে যাওয়ার পর ফ্ল্যাটটি সংস্কার করা হয়। সে সময়ও শ্রমিকরা কাজ করেছে। সে বিষয়গুলোও তদন্তে আসছে।”
এক প্রশ্নের জবাবে এসআই শফিকুল বলেন, কঙ্কালের ডিএনএ প্রতিবেদন আসার পর প্রয়োজনে বাড়িওয়ালাসহ সব ভাড়াটিযার ডিএনএ নমুনা নেওয়া হবে। এরই মধ্যে থানা পুলিশের পাশপাশি ডিবি, সিআইডিও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করছে।
সিআইডির ঢাকা মেট্রো (পশ্চিম) বিশেষ পুলিশ সুপার সামসুন্নাহার বলেন, “প্রাথমিকভাবে কঙ্কালটি মহিলার বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ডিএনএ নমুনার প্রতিবেদন আসলে পরিষ্কার হওয়া যাবে।”
“হত্যার পর লাশ গুম করে রাখার বিষয়টি দেখে মনে হয়েছে, এ বিষয়ে হত্যাকারীর ভালো অভিজ্ঞতা আছে,” বলেন তিনি। তদন্তের প্রয়োজনে যার কঙ্কাল তার বয়স, কতদিন আগের ঘটনা, নারী না পুরুষ, এ বিষয়গুলোর সুরাহা হওয়া প্রয়োজন।
শামসুন্নাহার বলেন, “এজন্যই অপেক্ষায় আছি ডিএনএ প্রতিবেদনের জন্য।” সোহরাওয়ার্দীর ফরেনসিক বিভাগের প্রধান সেলিম রেজা বলেন, “আমরা শুধু হাড়গুলো পেয়েছি। এগুলো ডিএনএ পরীক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট শাখায় পাঠানো হয়েছে। প্রতিবেদন না আসা পর্ন্ত কিছু বলা যাচ্ছে না। “পুরো বিষয়টি ডিএনএ প্রতিবেদনের উপর নির্ভর করছে। এরপরেই পরের ধাপগুলো নিয়ে কাজ করা যাবে।”

