সীমা হত্যা : ৩ মাসে বিচার নিষ্পত্তির নির্দেশ হাই কোর্টের
উত্তরদক্ষিণ | বুধবার, ০৭ অক্টোবর, ২০২০ | আপডেট : ১৮:১১
তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে থাকা সীমা হত্যা মামলার বিচার তিন মাসের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশ দিয়েছে হাই কোর্ট। মামলাটির বিচারে দীর্ঘসূত্রিতার বিষয়টি নজরে আসার পর বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মোস্তাফিজুর রহমানের বেঞ্চ বুধবার স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে এ আদেশ দেয়। পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন যুক্ত করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইসরাত হাসান লিখিতভাবে বিষয়টি আদালতের নজরে আনেন।
তখন বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক এম ইনায়েতুর রহিম উষ্মা প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের নির্দেশনা তো কেউ মানে না। … আবার আদেশ দিলে সংশ্লিষ্ট অনেকেই মাইন্ড করে। নারী ও শিশু নির্যাতন নিয়েও আমাদের নির্দেশনা রয়েছে।”
৩২ বছরেও মামলার বিচারকাজ শেষ না হওয়ায় তিনি বিষ্ময় প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের (আদালতের) কি দেখার কোনো দায়িত্ব নেই! আইনে তো বিধান আছে সাক্ষীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার।” পরে তিন মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয় আদালত।
আদেশের পর আইনজীবী ইশরাত হাসান বলেন, ময়না তদন্তকারী চিকিৎসকের সাক্ষ্যের জন্য মামলাটির বিচারকাজ ঝুলে আছে। আদালত বলেছে, তার সাক্ষ্য পাওয়া না গেলে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তিন মাসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করে বিচারককে হাই কোর্টে প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে। “মামলা নিষ্পত্তি করে প্রতিপালন প্রতিবেদন দিতে ব্যর্থ হলে বিচারকের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে বলেছেন আদালত।”
‘সাক্ষ্য দিচ্ছেন না ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক, ৩২ বছর ঝুলে আছে সীমা হত্যার বিচার’ শিরোনামে মঙ্গলবার প্রতিবেদন প্রকাশ করে দৈনিক যুগান্তর।
তাতে বলা হয়, পুরান ঢাকার জগন্নাথ সাহা রোডে ১৯৮৮ সালের ২৬ এপ্রিল খুন হন সীমা মোহাম্মদী (২০)। বাড়িতে ঢুকে ছুরিকাঘাত করে সীমাকে হত্যা করে মোহাম্মদ আহমদ ওরফে আমিন নামে এক যুবক।
ঘটনার পরপরই ওই যুবকের বিরুদ্ধে লালবাগ থানায় হত্যা মামলা করেন সীমার মা ইজহার মোহাম্মদী। দুই মাস পর ২৫ জুন পলাতক আমিনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। তদন্তে উঠে আসে সীমাকে বিয়ে করতে না পেরে সে এ হত্যাকাণ্ড ঘটায়। আদালত থেকে আসামিকে হাজিরের জন্য ১৯৯৯ সালের ২২ জুন পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়।
২০০১ সালের ২৯ এপ্রিল অভিযোগ গঠনের পরও সাক্ষ্য দিতে তদন্তকারী পুলিশ কর্মকর্তা ও ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের অনীহার কারণে মামলার বিচারকাজ বারবার পিছিয়ে যায়।
এ পর্যন্ত অর্ধশত অজামিনযোগ্য গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হলেও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের তৎকালীন প্রভাষক আনোয়ার হোসেন সাক্ষ্য দিতে অদ্যাবধি আদালতে হাজির হননি। মামলাটি এখন ঢাকার জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক চমন বেগম চৌধুরীর আদালতে বিচারাধীন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য এ পর্যন্ত মামলার তারিখ পড়েছে ১১২ বার। ১১ জন বিচারক বদল হয়েছেন। সরকার পাল্টেছে ১০ বার। মামলার একমাত্র আসামি আমিন এখনও পলাতক। এদিকে মামলার বাদী সীমার মা বিচারের অপেক্ষায় থেকে শেষ পর্যন্ত মারা গেছেন। বাবারও মৃত্যু হয়েছে।
সীমার পরিবারের সদস্য ও রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, আসামি ধরতে পুলিশ প্রশাসনের কোনো উদ্যোগ নেই। একই সঙ্গে ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের সাক্ষ্য দেওয়ার অনীহায় বিচারকাজ আরও বিলম্বিত হচ্ছে।
একের পর এক সমন জারির পরও বিচারিক আদালতে তাকে হাজির করা সম্ভব হচ্ছে না। সাক্ষীকে হাজির করতে বিচারক বেশ কয়েকটি আদেশও দিয়েছেন। সর্বশেষ গত সোমবার ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক ডা. মো. আনোয়ার হোসেনের সাক্ষ্য দেওয়ার তারিখ ছিল। ওইদিনও তিনি হাজির না হওয়ায় ১৮ নভেম্বর সাক্ষ্য গ্রহণের পরবর্তী তারিখ রেখে আদালত চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ফের সমন জারি করেছে।
অজ্ঞাত সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনেক আগেই ডা. আনোয়ার অবসরে গেছেন। এখন একটি বেসরকারি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি চাকরি করছেন। ওই ঠিকানায় আদালতের সমন পৌঁছে কি না, তা-ও কেউ বলতে পারছেন না।
পলাতক আমিন গত বছর উচ্চ আদালতে আগাম জামিনের জন্য আবেদন করে। পরে আবেদনটি কার্যতালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, আসামি আমিন একজন আটকে পড়া পাকিস্তানি। তার বাবার নাম জামিল। বাংলাদেশে তার কোনো স্থায়ী ঠিকানা নেই। ঘটনার ২ মাস আগে তিনি তেজগাঁওয়ের উর্দু রোডের আল আমিন বোর্ডিংয়ের ৫৫ নম্বর রুমে দৈনিক ২৮ টাকা ভাড়ায় থাকতেন। সীমাকে খুন করার পর ওই বোর্ডিংয়ে আর যাননি আমিন। এরপর থেকে আর তার কোনো হদিস পায়নি পুলিশ।

