ধর্ষণ-নিপীড়নের বিরুদ্ধে শাহবাগে ‘মহাসমাবেশের’ ডাক
উত্তরদক্ষিণ | বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর, ২০২০ | আপডেট: ১৭:০৬
ধর্ষণ ও নিপীড়ন বন্ধে সরকারের বিরুদ্ধে ‘নিষ্ক্রিয়তার’ অভিযোগ এনে শুক্রবার বিকালে রাজধানীর জাতীয় জাদুঘরের সামনে ‘মহাসমাবেশের’ ডাক দিয়েছে বাম ছাত্রসংগঠনগুলোর প্ল্যাটফর্ম ‘ধর্ষণের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ’। বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) দুপুরে শাহবাগে ধর্ষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে অবস্থান কর্মসূচি থেকে এই মহাসমাবেশের ডাক দেন এ প্ল্যাটফর্মের অন্যতম আহ্বায়ক ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক অনিক রায়।
শুক্রবার একই স্থানে, একই সময়ে ‘মহাসমাবেশের’ ডাক দিয়েছে ছাত্র অধিকার পরিষদের নতুন প্ল্যাটফর্ম ‘ধর্ষণ ও নিপীড়ন বিরোধী ছাত্র জনতার মঞ্চ’। এছাড়া সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট শুক্রবার বিকালে সারা দেশে সব শহীদ মিনারে ধর্ষণবিরোধী সমাবেশের ডাক দিয়েছে।
অনিক রায় বলেন, “আমরা মনে করি সরকার যদি যথাযথ ভূমিকা পালন করত, তাহলে দেশে ধর্ষণের মত ঘটনা ঘটতো না। আমরা এখনো আশা করি আমাদের সেই আন্দোলনের ফলে সরকার নিশ্চয়ই তাদের যে দায়িত্বগুলো আছে, তা বুঝবে, তা পালন করবে। প্রথমেই আমরা ধর্ষণকে চিরদিনের মত বাংলাদেশ থেকে বিদায় করতে পারব।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ফ্রন্টের কর্মী আরাফাত সাদ এ কর্মসূচিতে বলেন, “আমাদের সংগ্রাম শুধু বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে নয়, একই সঙ্গে তা সমাজ কাঠামোর বদলের সংগ্রাম। আমরা আন্দোলনের মাধ্যমে এমন একটি সমাজ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, যে সমাজব্যবস্থা নারীদের অনুকূলে আসবে।”
নোয়াখালীতে বিবস্ত্র করে নির্যাতন, সিলেটের এমসি কলেজে তুলে নিয়ে ধর্ষণসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া যৌন নিপীড়নের প্রতিবাদে এবং দোষীদের শাস্তির দাবিতে গত মঙ্গলবার থেকেই শাহবাগে বিভিন্ন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন সংগঠন।
বৃহস্পতিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে শাহবাগে ‘ধর্ষণের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ’ প্ল্যাটফর্মের অবস্থান কর্মসূচি শুরু হয়।
সেখানে স্লোগান ওঠে- ‘ধর্ষকদের আস্তানা জ্বালিয়ে দাও, পুড়িয়ে দাও’, ‘আমার মাটি, আমার মা, ধর্ষক তোদের হবে না’, ‘বুকের ভিতর দারুণ ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর’, ‘মুক্তিযুদ্ধের বাংলায় ধর্ষকদের ঠাঁই নাই’, ‘এক দুই তিন চার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গদি ছাড়’।
স্লোগানের পাশাপাশি সেখানে প্রতিবাদী চিত্রাঙ্কন কর্মসূচিও চালিয়ে যায় এ আন্দোলনে যুক্তরা।
নানা রঙে তারা ব্যানারে লেখেন, ‘ ধর্ষণ ও বিচারহীনতার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ’, ‘মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসুন, ‘ ধর্ষকদের বিরুদ্ধে জোট বাঁধো, তৈরি হও’,’ জিরো টলারেন্স টুওয়ার্ডস রেইপ’, ‘উই নিড সেক্স এডুকেশন, ‘ব্লেইম দ্য রেপিস্ট নট দ্য ভিকটিম’।
ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাজিফা জান্নাত বলেন, “আজকে আমাদের প্রতিবাদ ধর্ষণের বিরুদ্ধে। এ সমাজ, এ রাষ্ট্র আজ নারীদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়। আমরা চাই সরকার ধর্ষকদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স ঘোষণা করুক। ব্যানার, ফেস্টুন এঁকে আমরা সেই প্রতিবাদ করছি।”
ঢাবি শিক্ষক সমিতির মানববন্ধন : সারা দেশে অব্যাহত ধর্ষণ, নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতনের দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে মানববন্ধন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি। বৃহস্পতিবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে এই মানববন্ধনের আয়োজন করা হয়।
সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক সাদেকা হালিম বলেন, “আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা না হওয়ার কারণে, সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ার কারণে ধর্ষণ আজ মহামারী আকারে দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশে এক হাজার ধর্ষণের মধ্যে চারজন বিচার পাচ্ছে। অর্থাৎ সামাজিক সমস্যার সঙ্গে আইনগত সমস্যাগুলো আছে, সেগুলোও প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
তিনি বলেন, সামাজিক সমস্যায় পরিবারেরও দায় থাকে। একজন নারীর নিরাপত্তার জন্য শুধু সমাজকে সচেতন করলে হবে না, রাষ্ট্রকেও দায়িত্ব নিতে হবে। “যারা ধর্ষণ করছে, তাদের পেছনে গডফাদাররা আছে, তাদের কিন্তু বিচারের আওতায় আমরা নিয়ে আসছি না। আমরা লক্ষ্য করছি, রাজনীতির একটি অংশ যারা, দুর্বৃত্তায়ন করছে, তাদের আশ্রয়ে বারবার এই ধর্ষকরা ছাড়া পেয়ে যাচ্ছে। তৃণমূল পর্যায়ে যে দেনা-পাওনার রাজনীতি, সেটা আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে। আজকে যে রাজনৈতিক দলটি ক্ষমতায় রয়েছে তারাও কিন্তু ধর্ষকদের ছাড় দিতে চায় না। রাজনীতিবিদদের সেই বার্তা দেওয়া হয়েছে। আমরা আশা করি পরিবর্তন আসবে।”
শিক্ষক সমিতির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অধ্যাপক ড. লুৎফুর রহমান বলেন, “ধর্ষকরা সংখ্যায় কম হলেও, তারা অত্যন্ত শক্তিশালী। তারা রাজনৈতিক এবং পেশীশক্তির মাধ্যমে এসব কাজ করে বেড়ায়। ধর্ষণের আইন সংশোধন করতে সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকর করলে ধর্ষণের মাত্রা কমবে। ছাত্র সংগঠন, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো যেভাবে ধর্ষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছে, সেভাবে আমাদের সবার জেগে উঠা উচিত।”
শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক নিজামুল হক ভূঁইয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাণিজ্য অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আব্দুল মঈন, ক্রিমিনোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান, থিয়েটার অ্যান্ড পাফরমেন্স স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. ইসরাফিল শাহীন, রোকেয়া হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক জিন্নাত হুদা, স্যার এ এফ রহমান হলের প্রভোস্ট সাইফুল ইসলাম খান, সূর্যসেন হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক মকবুল হোসেন ভূঁইয়া, সিন্ডিকেট সদস্য ড. হুমায়ুন কবির, সহাকরী প্রক্টর আবদুর রহিমসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের প্রায় অর্ধশত শিক্ষক এই মানববন্ধনে অংশগ্রহণ করেন।

