বুলেটের আঘাতে একটি ফুল কুড়িতেই শেষ: প্রধানমন্ত্রী

বুলেটের আঘাতে একটি ফুল কুড়িতেই শেষ: প্রধানমন্ত্রী

উত্তরদক্ষিণ | রবিবার, ১৮ অক্টোবর, ২০২০ | আপডেট: ১৯:৫০

ঘাতকের হাতে নিহত সর্বকনিষ্ঠ ভাই শেখ রাসেলের স্মৃতিচারণ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, বুলেটের আঘাতে একটি ফুল কুড়িতেই শেষ হয়ে যায়। রবিবার (১৮ অক্টোবর) জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কনিষ্ঠ পুত্র শহিদ শেখ রাসেলের ৫৬তম জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে যুক্ত হয়ে তিনি একথা বলেন।

১৯৭৫ সালের ১৫ই অগাস্ট ঘাতকের নির্মম বুলেটের আঘাতে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। ভয়াল সেই রাতে জাতির পিতার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যদের সঙ্গে প্রায় ১১ বছর বয়সী শেখ রাসেলকেও প্রাণ দিতে হয়েছিল।

শেখ হাসিনা বলেন, “১৯৬৪ সালে রাসেলের জন্ম হয়েছিল। কিন্তু তার জীবনটা শেষ হয়ে যায় ..একটি ফুল কুড়িতেই শেষ হয়ে যায় আর তা ফুটতে পারেনি।

শেখ রাসেলের জন্মের ক্ষণটি ঘিরে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে উত্তেজনাকর সেই মুহূর্তগুলো স্মরণ করে বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, “একটা ছোট্ট শিশু আসবে আমাদের পরিবারে। আমি, কামাল, জামাল, রেহানা- আমরা সবাই খুব, খুব উৎসাহিত এবং বেশ উত্তেজিত ছিলাম যে কখন সেই শিশুর কান্নাটা আমরা শুনব,কখন তার আওয়াজটা পাব, কখন তাকে কোলে তুলে নেব। আর সেই ক্ষণটি যখন এল তা আমাদের জন্য অত্যন্ত একটা আনন্দের সময় ছিল।”

সেই মুহূর্তে নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যস্ততার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, “তিনি ওই মুহূর্তে চট্টগ্রামে ছিলেন। সাথে সাথে আমরা টেলিফোন কল করে আব্বাকে জানালাম।”

ব্রিটিশ দার্শনিক বারট্রান্ড রাসেলের প্রতি বঙ্গবন্ধুর ভক্তি ও তার সম্পর্কে জেনে শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব এই দার্শনিকের নামে তাদের ছোট ছেলের নাম রাখেন বলেও তিনি জানান।

শেখ হাসিনা বলেন, “ছোট্ট শিশুটি আমাদের চোখের মনি ছিল। কিন্তু কী দুর্ভাগ্য তার, ১৯৬৪ সালের ১৮ই অক্টোবরে তার জন্ম। এরপর ১৯৬৬ সালে যখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আমার বাবা ছয় দফা দিলেন, তিনি খুব ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। ওই ৬৬ সালেই তিনি মে মাসে বন্দি হয়ে গেলেন। ছোট্ট রাসেল তার কোনো কিছু বুঝে উঠার আগেই বাবা কারাগারে। প্রকৃতপক্ষে তার সাক্ষাৎ হলো কারাগারেই।” তিনি বলেন, বাবার সঙ্গে কারাগারে দেখা করতে গেলে তাকে সেখান থেকে নিয়ে নিয়ে যাওয়া জন্য রাসেল কান্নাকাটি করতো।

“১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে যখন বাবা মুক্তি পান তখন যেই জিনিসটা সব সময় দেখতাম রাসেল সর্বক্ষণ, মনে হয় ওর ভেতরে একটা ভয় ছিল যে কোনো মুহূর্তে বুঝি বাবাকে হারাবে। তাই তিনি যেখানেই যেতেন যেই কাজই করতেন খেলা ছলে ছলে কিছুক্ষণ পরপরই একবার করে সে দেখে আসতো যে বাবা ঠিক আছে তো।”

রাসেলের সৈনিক হওয়ার স্বপ্নের কথা তুলে ধরে তার বড় বোন হাসিনা বলেন, “যখন আমরা গ্রামে বেড়াতে যেতাম, গ্রামের যত শিশু তার বয়সী সবাইকে সে একত্রিত করতো এবং তাদেরকে দিয়ে সে প্যারেড করাতো। আর শুধু প্যারেড করিয়ে খালি হাতে ফেরাতো না। প্রত্যেকে যারা প্যারেড করতো তাদেরকে সে টাকা দিতো আর তাদেরকে কাপড়-চোপড় কিনে দিতে হতো।”

সেজন্য তাদের মা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব শিশুদের অনেক কাপড়-চোপড় কিনে নিয়ে টুঙ্গিপাড়ায় যেতেন এবং সেগুলো রাসেলের ইচ্ছামত প্রত্যেকটা শিশুকে দেওয়া হতো বলে জানান শেখ হাসিনা।

“রাসেল ছোট ছোট গরিব শিশুদেরকে.. সে প্রতিবার..যতবার টুঙ্গিপাড়া যাবে প্রতিবার এই শিশুদের সে কাপড় বিতরণ করবে। কারণ তার মনটা ছিল অনেক উদার।”

ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে শহিদ শেখ রাসেলে ‘ম্যুরাল’ নির্মাণ করে শেখ রাসেলের স্মৃতিকে ধরে রাখার চেষ্টা করায় সবাইকে ধন্যবাদও জানান শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, “রাসেল আজ আমাদের মাঝে নেই। ওই স্কুলের ছাত্র ছাত্রী যুগ যুগ ধরে যারা পড়াশোনা করবে তারা এইটুকুই শিখবে, এইটুকুই জানবে যে একটা ছোট শিশু ছিল এই স্কুলে কিন্তু সেই শিশুটাকে বাঁচতে দেওয়া হয় নাই। তাকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। এই ধরনের ঘটনা আর না ঘটুক সেটাই আমরা চাই।”

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যেসব কর্মসূচিতে যুক্ত হয়েছেন সেগুলো হলো হলো- শহিদ শেখ রাসেল- এনিমেটেড ডকুমেন্টরি ‘বুবুর দেশ’ প্রদর্শনীর উদ্বোধন, শেখ রাসেল এর জীবনীর উপর প্রকাশিত বই ‘শেখ রাসেল আমাদের আবেগ, আমাদের ভালবাসা’ এর মোড়ক উন্মোচন ও ছবি প্রদর্শনীর উদ্বোধন, ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল এন্ড কলেজ প্রাঙ্গণে শহিদ শেখ রাসেল এর ‘ম্যুরাল’ উন্মোচন ও ‘শহিদ শেখ রাসেল ভবন’ উদ্বোধন, শেখ রাসেল জাতীয় শিশু-কিশোর পরিষদের কার্যক্রম সংক্রান্ত ভিডিও চিত্র অবলোকন ‘স্মৃতির পাতায় শেখ রাসেল’ শীর্ষক বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত ছাত্র-ছাত্রীদের পুরস্কার বিতরণ, শিক্ষাবৃত্তি প্রদান এবং দরিদ্র ও মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে ল্যাপটপ বিতরণসহ অন্যান্য কার্যক্রম।

ওই সময় গণভবন প্রান্তে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আহমদ কায়কাউস, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিমসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। ঢাকার শেখ রাসেল রোলার স্কেটিং কমপ্লেক্স প্রান্ত থেকে ৮ বছরের নীলকাব্য শহিদ শেখ রাসেলের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন।

ভিডিও কনফারেন্সে ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুল ও কলেজ প্রাঙ্গণ প্রান্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ত্রান ও সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী উপস্থিত ছিলেন।

এছাড়াও বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র প্রান্তে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুরাইদ আহমেদ পলক, শেখ রাসেল জাতীয় শিশু কিশোর পরিষদের প্রতিষ্ঠাকালীন চেয়ারম্যান রকিবুর রহমান, সংগঠনটির মহাসচিব ও সংসদ সদস্য মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরীসহ সংগঠনের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading