বায়ুদূষণের কবলে রাজধানী ঢাকা: দরকার কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়া

বায়ুদূষণের কবলে রাজধানী ঢাকা: দরকার কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়া

সম্পাদকীয় | উত্তরদক্ষিণ
মুদ্রিত সংস্করণ: রবিবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০২০ | আপডেট: ০০:০১

বরাবরের মতো নভেম্বর মাসের শুরু থেকেই বায়ুদূষণের তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং সেই সাথে বৃদ্ধি পাচ্ছে জনউৎকন্ঠা। নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে নিম্ন স্তরে জমা হওয়া কিছু মেঘের কারণে ঢাকা বায়ুদূষণ সূচকে বিশ্বে শীর্ষস্থান দখল করে। বিশ্বজুড়ে মানুষের মৃত্যু ও স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরির অন্যতম কারণ বায়ুদূষণ৷

গত পাঁচ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দূষণ হয়েছে গত এক সপ্তাহে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত উদ্যোগ না নিলে আরও খারাপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। আর পরিবেশ মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, তারা বায়ু দূষণের কারণ হিসেবে ২০টি কারণ চিহ্নিত করেছেন। এসব কারণ চিহ্নিত করে কাজও শুরু হয়েছে।

সম্প্রতি স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) এক পর্যবেক্ষণে ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের ডিসেম্বরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এই পাঁচ বছরের মধ্যে চলতি ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ঢাকায় বায়ু দূষণের মাত্রা সবচেয়ে বেশি।

২০১৯ সালের ডিসেম্বরের প্রথম আট দিনে ঢাকায় বায়ু মান সূচকে দূষণ ছিল ১৭৩, চলতি বছরের প্রথম সপ্তাহে তা বেড়ে ২৩৭ এ গিয়ে দাঁড়িয়েছে। যা ২০১৯ সালের তুলনায় ৩৬ দশমিক ৯৯ ভাগ বেশি।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, বায়ু দূষণের মাত্রা ২০০ ছাড়ালে মারাত্মক অস্বাস্থ্যকর। আর ৩০০ ছাড়ালে বলা হয় ‘দুর্যোগপূর্ণ’।

আমেরিকার হেলথ ইফেক্ট ইন্সটিটিউট এবং গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ প্রজেক্ট-এর সমন্বয়ে প্রস্তুতকৃত স্টেট অব গ্লোবাল এয়ার’ ২০২০ এর রিপোর্ট অনুযায়ী ২০১৯ সালে বায়ুদূষণজনিত কারণে বাংলাদেশে মোট মৃত্যু ঘটে প্রায় ৯০ হাজার জনের।

ডাব্লিউএইচওর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এখন বিশ্বে যেসব শিশু জন্ম নিচ্ছে, গড়ে তারা কাঙ্খিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২০ মাস কম আয়ু পাচ্ছে৷ দক্ষিণ এশিয়ায় যা ৩০ মাস৷ দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা গেলে তাই গড় আয়ুও বাড়বে৷

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানান, সালফার ডাই অক্সাইড, কার্বন মনোক্সাইড, মার্কারি ও লেডের মতো ভারী পদার্থ বাতাসে মিশে যাচ্ছে। দূষণের শিকার দরিদ্র নারী, শিশুরা ব্যাপকভাবে ক্ষতির শিকার হচ্ছে। কারণ তাদের বেশিরভাগই দূষিত এলাকায় বসবাস করেন, যেখানে সীসা দূষণেরও ঝুঁকি রয়েছে এর ফলে শিশুদের বুদ্ধিমত্তা বিকাশে এবং স্নায়ুবিক ক্ষতি হতে পারে। দূষিত এলাকায় বসবাসের ফলে গর্ভবতী মহিলাদের গর্ভপাত ও মৃত শিশু প্রসবের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যেতে পারে।

মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান লরেন্স বের্কলি ন্যাশনাল ল্যাবরেটরি বলছে, রাসায়নিক মিশ্রণ আছে, এমন দূষিত বায়ুর সংস্পর্শে থাকলে চোখ, নাক বা গলার সংক্রমণ বা ক্ষতির কারণ হতে পারে। সেই সঙ্গে ফুসফুসের নানা জটিলতা, যেমন ব্রঙ্কাইটিস বা নিউমোনিয়া, মাথাব্যথা, অ্যাজমা এবং নানাবিধ অ্যালার্জির সমস্যা দেখা দিতে পারে। বায়ু দূষণের সঙ্গে ডায়াবেটিসের সম্পর্ক দেখতে পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন বায়ু দূষণের মধ্যে থাকলে ফুসফুসের ক্যান্সার এবং হৃদরোগ দেখা দিতে পারে। এমনকি সেটা মস্তিষ্ক, লিভার বা কিডনির দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাও তৈরি করতে পারে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে একটি শক্তিশালী বায়ুদূষণ ব্যবস্থাপনা জরুরি। ঢাকা শহরের জন্য এখন পর্যন্ত বড় পরিসরে কোনো সোর্স অ্যাপোশনমেন্ট সমীক্ষা করা হয়নি। যা করা হয়েছে তা প্রায় ১০ বছর পূর্বের ডাটা দিয়ে তৈরি করা এবং সমগ্র শুষ্ক মৌসুমভিত্তিক একটি সমীক্ষা, যা একটি কার্যকরী বায়ুদূষণ ব্যবস্থাপনা প্রণয়ন করার জন্য মোটেও যথেষ্ট নয়। একটি কার্যকরী বায়ুদূষণ ব্যবস্থাপনা প্রণয়ন করতে হলে প্রথমেই আমাদের জানতে হবে যে মূলত কোন উৎস থেকে পিএম২.৫ বাতাসে আসছে এবং আবহাওয়ার বিভিন্ন প্যারামিটারের পরিবর্তনের সাথে শহরব্যাপী পিএম২.৫-এর মাত্রার কিরূপ পরিবর্তন হচ্ছে।

ঢাকা শহরের বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যে একটি আন্তঃবিভাগীয় শক্তিশালী টাস্ক ফোর্স গঠন করা প্রয়োজন। কারণ ঢাকার বায়ুদূষণের সাথে জড়িত রয়েছে শিল্প, অর্থ, আবহাওয়া, যানবাহন, নগর ব্যবস্থাপনা, গবেষণা, ইত্যাদি বিষয়; রয়েছে এনফোর্সমেন্ট ও গবেষণা সক্ষমতা’র বিষয়ও। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বায়ুমানের সার্বক্ষণিক মনিটরিং ও পূর্বাভাস প্রদানে সক্ষম একটি গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন। পর্যাপ্ত তথ্য উৎপাদন ও বিশ্লেষণপূর্বক একটি কার্যকরী ও স্বল্প ব্যয় সাপেক্ষ বায়ুদূষণ ব্যবস্থাপনা প্রণয়ন করে এবং তা বাস্তবায়ন করে ধাপে ধাপে ঢাকার বায়ুমানের উন্নতি করা যেতে পারে। বায়ুদূষণের কারণে একদা হিমশিম খাওয়া বেইজিং শহরের পক্ষে বায়ুমান উন্নতি করা সম্ভব হলে আমাদের পক্ষেও সম্ভব বলে আমরা আশা করতে পারি।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading