অভিনন্দন বাংলাদেশ!

অভিনন্দন বাংলাদেশ!

উপসম্পাদকীয় | উত্তরদক্ষিণ
মুদ্রিত সংস্করণ: রবিবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০২০ | আপডেট: ০০:০১

আল আমীন :: ২০১৫ বা ‘১৬ সালের কথা। বাড়ি থেকে হঠাৎ ফোন এলো- “মা খুব অসুস্থ।” তাকে দ্রুত হাস্পাতালে নেয়া দরকার। আমি বাড়ির বড় ছেলে। জরুরি ভিত্তিতে বাড়ি যাওয়া দরকার। বাড়িতে ছোট ভাই আছে, কিন্তু সেও অতটা বুঝমান নয় তখন। যাইহোক, ছোট ভাইকে বল্লাম, ”তুই আম্মুকে নিয়ে দ্রুত হাস্পাতালে যা। আমি বাড়ি ফিরতেছি।”

কিন্তু ফিরতে চাইলেই তো আর ফেরা যায় না। আমার বাড়ি দক্ষিণবঙ্গে। পাড়ি দিতে হবে পদ্মা। আর সেখানেই যত বিপত্তি। এরপর আবার পথের দূরত্ব তো আছেই…
বিকেল তখন। গাবতলি গিয়ে বিাস পেলাম না। ফিরলাম গুলিস্তানের পথে। গাড়ি পেলাম, মাওয়া ঘাটে পৌঁছাতে রাত ৯টা। ততক্ষণে এদিকে আমার দুইটা ফোনেরই চার্জ শেষ। বাসায় থাকতেই চার্জ কম ছিল। রিচার্জ করার মতো সময়ও পাইনি। গাড়ি ফেরি ঘাটের জ্যামে। ফোন অফ হয়ে গেল। বাড়ির সাথে ডিমকানেক্টেড। ছোট ভাই ওদিকে মাকে হাস্পাতালে নিয়েছে খবর পেয়েছি, এর পরের খবর আর নিতে পারিনি।

এই অবস্থায়ই ওইদিন ফেরি ঘাটের জ্যামে কেটে গেল পুরো রাত। সকাল ৭টার পর ফেরি পেলাম। বাড়ি পৌঁছতে প্রায় দুপুর। ভয়াবহ সেই রাতের ইতিহাস এখনো মনে পড়লে সব কিছু এলোমেলো হয়ে যাই।

পুরো রাত ফেরি ঘাটে বসে থাকার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এর আগে এবং পরেও আছে। এছাড়া লঞ্চে পদ্মা পার হতে গিয়ে প্রলয়ংকরী ঝড়ের কবলে পড়ে কান্নাকাটি জুড়ে দেওয়ার ঘটনা এবং কাগজের নৌকার মতো ভাসতে ভাসতে এসে লঞ্চ কূলে ভেড়ার সেই গায়ে কাটা দেওয়ার স্মৃতি আমার মতো অনেকেরই আছে। যেটা পদ্মা সেতুর শেষ স্প্যান বসানোর পর সোশাল মিডিয়ায় করা অনেকের পোস্টে জানতে পেরেছি। অনেকেই পদ্মা নদী পার হওয়ার বিভিন্ন দুঃসহ স্মৃতি আওড়েছেন। এখন সবাই সেই সব দিনের পুনরাবৃত্তি না দেখার দিনের অপেক্ষায়।

কারণ আমাদের স্বপ্নের পদ্মা সেতুর অবকাঠামো এখন দৃশ্যমান। ১০ ডিসেম্বর, ২০২০, বিজয়ের মাসে ৪১তম স্প্যান বসানোর মধ্য দিয়ে বাস্তব রূপ পেলো ঐতিহাসিক পদ্মা সেতু। আত্মবিশ্বাস আর সক্ষমতার এক উজ্জ্বল নিদর্শন স্থাপন করলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

ডিসেম্বর মাস, বাঙালির বিজয়ের মাস। ১৯৭১ সালের এই মাসেই আমরা অর্জন করেছি মহান স্বাধীনতা। বাঙালি জাতির সুদীর্ঘ স্বাধীনতা সংগ্রাম-এর রাজনৈতিক ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম ঘটনা ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ। আর এ মাসেই বসলো পদ্মা সেতুর শেষ স্প্যানটি। মিললো পদ্মার দুই কূল। রাজধানী শহর ঢাকার সঙ্গে যুক্ত হলো পুরো দক্ষিণবঙ্গ। বাঙালির আরেক বিজয় এই পদ্মা সেতু। দাক্ষিণবঙ্গের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে সমগ্র দেশবাসীর আবেগ।

২০০৮ সালের নির্বাচনি ইশতেহারে স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। নির্বাচনে বিজয়ের পর সরকার গঠন করেই সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেন বঙ্গবন্ধুকন্যা। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, বিশ্বব্যাংক, জাইকা অর্থায়নের প্রতিশ্রুতিও দেয়। কিন্তু ঘুষ দুর্নীতির কাল্পনিক অভিযোগ তুলে পরে ১২০ কোটি ডলারের অঙ্গীকার থেকে সরে যায় বিশ্বব্যাংক। অন্য বিদেশি সংস্থাগুলোও একই পথ অনুসরণ করে।

কঠিন সেই সময়ে অবিচল প্রধানমন্ত্রী দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা দিয়েছিলেন, স্বপ্নের পদ্মা সেতু হবেই এবং তা সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে। দেশ-বিদেশের খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদেরা সে সময় এই ঘোষণায় বিস্মিত হয়েছিলেন। বাংলাদেশের সামর্থ্য নিয়ে তারা প্রশ্ন তুলেছিলেন। তবে তাদের অবিশ্বাসকে মিথ্যা প্রমাণ করে বাংলাদেশের সক্ষমতা, সমৃদ্ধি, অহংকার ও সাহসের প্রতীক হিসেবে পদ্মার বুকে এখন দৃশ্যমান সেতুর মূল কাঠামো।

প্রমত্তা পদ্মায় সেতু নির্মাণ বাংলাদেশকে এক বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড় করিয়েছিল। এ ধরনের বড় সেতু নির্মাণ করার ক্ষেত্রে বেশ কিছু কারিগরি চ্যালেঞ্জ থাকে। সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেই পদ্মা সেতু এখন স্বপ্ন থেকে বাস্তবে বিমূর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে নিজস্ব অবকাঠামোয়। বাংলাদেশ করলো পদ্মা জয়। এ বিজয় জাতির পিতার সুযোগ্য কন্যা আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। দেশি-বিদেশি সব মহলের বাধা, ষড়যন্ত্র, কটাক্ষকে ধুলায় মিশিয়ে দিয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করলেন তিনি। গোটা জাতিকে সঙ্গে নিয়ে বিজয়ের মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আরেকটি বিজয়ের ইতিহাস রচিত হলো বাংলাদেশে। এ বিজয় বাঙালির। গোটা বিশ্বের সামনে এ বিজয় বাংলাদেশের। অভিনন্দন বাংলাদেশ! লেখক: সংবাদকর্মী

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading