সময় এখন এগিয়ে যাওয়ার, দেশকে এগিয়ে নেওয়ার
উত্তরদক্ষিণ | বুধবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০২০ | আপডেট: ০০:০১
আজ ১৬ ডিসেম্বর। মহান বিজয় দিবস। বাঙালি জাতির ইতিহাসে সর্বোচ্চ অর্জনের ও আত্মগৌরবের একটি দিন। ১৯৭১ সালের এই দিনে মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাঙালি বিজয় ছিনিয়ে আনে। ৩০ লাখ শহীদ আর দু’লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার সাক্ষর এবারের বিজয় দিবস করোনা আবহের মধ্যেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে নানা অনুষ্ঠানের মধ্যদিয়ে পালিত হচ্ছে।
১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের শুরু থেকেই মুক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা আক্রমণ আর ইন্ডিয়ান মিত্রবাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনীর জল, স্থল আর আকাশপথে সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে বর্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পরাজয়ের খবর চারদিক থেকে ভেসে আসতে থাকে।
এ বছরেরই ১৬ ডিসেম্বর ঢাকার ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়। যেখান থেকে ৭ মার্চ স্বাধীনতার স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম,’ বলে স্বাধীনতার ডাক দেন, সেখানেই পরাজয়ের দলিলে স্বাক্ষর করেন পাকিস্তানি জেনারেল নিয়াজী। ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়। আর জাতি অর্জন করে হাজার বছরের স্বপ্নের স্বাধীনতা।
’৭১ এর ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি জল্লাদ বাহিনী নিরস্ত্র জনগণের উপর অতর্কিতে সশস্ত্র আক্রমণ চালিয়ে হাজার হাজার মানুষ হত্যা করে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর এক অসম যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়। বঙ্গবন্ধু একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে পাক বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হবার আগে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন এবং তার ডাকে সাড়া দিয়ে বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধভাবে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ২৫ মার্চ রাতেই রাজারবাগ পুলিশ লাইনে সশস্ত্র প্রতিরোধের সম্মুখীন হয় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। দীর্ঘ ৯ মাসের এই যুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদ এবং ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানির বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর জাতির চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়।
এত ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতার ৪৯ বছর পর আজ আমরা যদি রাষ্ট্রের দৃশ্যমান অর্জনের দিকে নজর দিই, সেখানে স্বস্তির বার্তা খুঁজে পাই। পাকিস্তান নামক যে রাষ্ট্র থেকে এ দেশের জন্ম হয়েছিল, সে রাষ্ট্রই এখন সক্ষমতার প্রায় সব সূচকেই আমাদের পেছনে।
মানব উন্নয়ন, নাগরিক সক্ষমতা, শাসনব্যবস্থা কিংবা মানবাধিকার- সবক্ষেত্রেই দেশ অনেক এগিয়ে। পাকিস্তানের আইনসভাতেও হতাশার সেই সুর বেজে উঠেছে। উন্নয়নের অনেক মাপকাঠিতে প্রতিবেশী ইন্ডিয়াও এখন আমাদের পাশে ম্লান। পরিবর্তনের আভাস এখন সবখানেই। গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র।
শিক্ষা-স্বাস্থ্য, শিল্প-কৃষি, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, রাস্তা-ঘাট, ব্যবসা-বাণিজ্য; এমন কী প্রাতিষ্ঠানিক সামর্থ্যরে প্রশ্নেও অগ্রগতির নমুনা আছে। দুর্নীতির বিস্তার ঘটলেও দুর্নীতি দমনে সাফল্য আছে। প্রিন্ট-ইলেকট্রনিক মিডিয়া যথেষ্টই স্বাধীনতা ভোগ করছে। এ বিষয়ে হয়তো সবাই একমত- দেশ স্বাধীন না হলে ব্যক্তি, পরিবার, রাষ্ট্র কিংবা বিশ্ব পরিসর; সর্বত্রই আমরা যে মর্যাদা, স্বাচ্ছন্দ্য ও সক্ষমতার নজির রেখে চলেছি, তা কখনই সম্ভব হতো না। একটি বৈষম্যহীন মুক্তসমাজ গঠনের অব্যাহত আকাঙ্ক্ষার ফসল বাংলাদেশ।
এখন উন্নয়নশীল দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার শর্ত পূরণ করেছে বাংলাদেশ। এই বিজয়ের মাসেই এসে দৃশ্যমান স্বপ্নের পদ্মা সেতু। বাংলাদেশ এখন প্রস্তুত হচ্ছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের জন্য। দেশের সামনে এখন সম্ভাবনা অসীম। কেউ অস্বীকার করতে পারবে না, দেশ এগিয়েছে অনেকটা পথ। করোনাকালেও দেশের অর্থনীতি তার অন্তর্গত সামর্থ্য প্রমাণ করেছে। তবে এই উন্নয়নকে টেকসই করতে হলে সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। নৈতিক অবক্ষয়, অসহিষ্ণুতা কিংবা উগ্রবাদের বিস্তার রুখে দেয়ার জন্য প্রয়োজন জনগণের ঐক্য। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি।
সময় এখন এগিয়ে যাওয়ার, দেশকে এগিয়ে নেওয়ার। দেশের সকল নাগরিকের উচিৎ, ঘৃণা ও প্রতিহিংসার সংস্কৃতি ত্যাগ করে একটি সম্ভাবনাময় দেশকে এগিয়ে নেয়ার জন্য শুভবুদ্ধি ও দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেয়া। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে সব সমস্যা মোকাবেলায় সচেষ্ট হলে আমাদের অগ্রগতি ঘটবে দ্রুত। বিভেদ ভুলে আমরা সে পথেই অগ্রসর হব, এই হোক এবারের বিজয় দিবসের অঙ্গীকার।

