অপ্রতিরোধ্য বাংলাদেশ: বিজয় থেকে বিজয়ে
শব্দনীল | উত্তরদক্ষিণ
মুদ্রিত সংস্করণ: বুধবার, ১৬ ডিসেম্বর, ২০২০ | আপডেট: ০০:০১
বাংলাদেশ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপনের সন্ধিক্ষণে আছে এই মুহূর্তে। স্বাধীনতার উনপঞ্চাশ বছরে এসে অর্থনৈতিক টেকসই উন্নয়নে ইন্ডিয়া ও পাকিস্তান থেকে এগিয়ে বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে যখন দেশ স্বাধীন হয়, সে সময়ে অনেক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে বাংলাদেশ ছিলও ভঙ্গুর অর্থনীতির একটি দেশ। যে দেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে অভিহিত করেছিলেন সেই সময়ের মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার। অনেক বিশ্লেষকদের মতে স্নায়ুযুদ্ধকালে বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও তার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার নিজেদের পরাজয় হিসেবে দেখেছেন। পৃথিবীর সবচেয়ে জনঘনত্বপূর্ণ এদেশ অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হতে পারবে না বলেই অনেকে বিশ্বাস করতেন। স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনীতির যাত্রা শুরু ১৯৭২ সালে। সে সময়ে অর্থনীতির প্রতিটি সূচকে ইন্ডিয়া ও পাকিস্তান এগিয়েছিল। আজ ৪৯ বছর পর প্রায় অনেক সূচকে তারা বাংলাদেশ থেকে পিছিয়ে। এটাই আমাদের স্বাধীনতার বড় অর্জন।
নোবেল বিজয়ী বাঙালি অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন নারী শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নারীর ক্ষমতায়ন, মা ও শিশুমৃত্যুর হার হ্রাসে বাংলাদেশের অগ্রগতির অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছেন। ইকোনমিক ইনটেলিজেন্ট ইউনিটসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে চিহ্নিত করেছে ‘বিস্ময়কর ধাঁধা’ হিসেবে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে বাংলাদেশ তাদের অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইন্ডিয়া ও পাকিস্তান থেকে অনেক এগিয়ে। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের উন্নয়ন সূচক ৩৪ সেখানে ইন্ডিয়ার উন্নয়ন সূচক ৬২ এবং পাকিস্তানের ৫২।
টেকসই উন্নয়ন সূচক:
জাতিসংঘ টেকসই উন্নয়ন প্রতিবেদন ২০২০ প্রকাশিত হয় ৩০ জুন। প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে এসডিজি বিষয়ক একদল বিশেষজ্ঞের সমন্বয়ে গঠিত সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সলিউশন নেটওয়ার্ক নামের একটি সংস্থা। বিশ্বব্যাংক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থাসহ সরকারিভাবে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে এ প্রতিবেদন তৈরি করে। এই প্রতিবেদনে দেখা যায় জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য বা এসডিজি অর্জনে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে। বাংলাদেশ ৬৩ দশমিক ৫১ নম্বর নিয়ে অবস্থান করছে র্যাঙ্কিংয়ে ১০৯-এ সেখানে ইন্ডিয়া ৬১ দশমিক ৯২ নম্বর নিয়ে অবস্থান করছে র্যাঙ্কিংয়ের ১১৭ এবং পাকিস্তান ১৩৪-এ।
মাথাপিছু আয় বা জিডিপি:
সম্প্রতি পাকিস্তানের একটি ইংরেজি জাতীয় দৈনিকে দেশটির অর্থনীতির সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনীতির তুলনা করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সেখানে বাংলাদেশের অর্থনীতি ও সমাজ ব্যবস্থার ভূয়সী প্রশংসা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, দুই দশক আগেও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন মাথাপিছু আয় ও স্বল্প প্রবৃদ্ধির জিডিপি ছিলো বাংলাদেশের। অথচ এখন বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় পাকিস্তানের চেয়ে বেশি। এমনকি ভারতের পর বাংলাদেশই বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ মনে করছে তারা।
দ্য নিউউজ ইন্টারন্যাশনালের ওই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের শিক্ষা ব্যবস্থার তুলনা করে বলে, পাকিস্তানের সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের খুবই নিম্নমানের শিক্ষা দেওয়া হয় অথচ বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষায় তালিকাভুক্তির দিক দিয়ে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। এমনকি তাদের দেশের তুলনায় এখানে শিক্ষার্থীদের ঝড়ে পড়ার হারও সবচেয়ে বেশি।
পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশে শিশু মৃত্যুর হার অর্ধেক উল্লেখ করে প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, পাকিস্তানে বাংলাদেশের তুলনায় বেশি পরিমাণে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, প্যারামেডিকেল কর্মী রয়েছে। এ ছাড়া সরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকের সংখ্যাও বাংলাদেশের তুলনায় বেশি। কিন্তু তার পরও বাংলাদেশিদের গড় আয়ু পাকিস্তানিদের তুলনায় তিন বছর বেশি।
অন্যদিকে চলতি বছর আইএমএফের পূর্বাভাস বলছে মাথাপিছু জিডিপিতে ইন্ডিয়াকে ছাড়িয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক সংস্থাটির পূর্বাভাস ঠিক থাকলে ২০২০ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি হবে ১ হাজার ৮৮৮ ডলার সেখানে ইন্ডিয়ার ১ হাজার ৮৭৭ ডলার। যা আমাদের ৪৯ বছরের স্বাধীনতায় অবিস্মরণীয় এক অর্জন।
স্বাধীনতার ৪৯ এগিয়ে বাংলাদেশ:
১৯৭২ সালে পাকিস্তানের অবকাঠামো উন্নয়ন ও অর্থনৈতীক দিক দিয়ে বাংলাদেশ পিছিয়ে ছিলো অনেক। বাংলাদেশের মুদ্রার মানও পাকিস্তানের চেয়ে অনেক কম ছিলো। বর্তমানে ১ মার্কিন ডলারের সমান বাংলাদেশের ৮৪ টাকা অন্যদিকে পাকিস্তানের ১৪১ রুপি। ২০১৯ সালের ২০ মার্চের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত ৩ হাজার ১৬৯ কোটি ৮০ লাখ ডলার, আর পাকিস্তানের (২০১৯ সালের জানুয়ারি) ১ হাজার ৪৮৮ কোটি ডলার। অর্থাৎ, আমাদের মজুত পাকিস্তানের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি।
১৯৭২-৭৩ সালে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ছিল ৪৭ বছর, পাকিস্তানের ৫৪ বছর। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু ৭৩ বছর, পাকিস্তানের ৬৬ বছর। গড় আয়ুতে আমরা ভারতের থেকেও এই মুহূর্তে এগিয়ে আছি। বিশ্বব্যাংকের ২০১৮ সালের মানবসম্পদ সূচকে দেখা যায়, ১৫৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১০৬তম আর পাকিস্তান ১৩৪তম। এটিতে ভারতও আমাদের পেছনে, ১১৫তম।
এইচএসডিসির রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ পৃথিবীর ২৬তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হতে যাচ্ছে। বর্তমানে বিশ্ব সূচকে ৪২তম। বাংলাদেশ এগিয়ে আছে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণেও। ১৯৭১ সালে যেখানে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৫০ লাখ এবং পাকিস্তানের ৬ কোটি ৫০ লাখ, সেখানে বর্তমানে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৭ কোটি আর পাকিস্তানের ২০ কোটি ৭০ লাখ। বাংলাদেশের যেসব নীতিনির্ধারক বর্ধিত জনসংখ্যাকে সম্পদ ভাবেন, তাঁদের একবার পাকিস্তান ঘুরে আসা উচিত।
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে বাংলাদেশ এ বছর বিশ্বের শীর্ষ পাঁচে থাকবে। মানবসম্পদ উন্নয়নে বাংলাদেশ ভালো করেছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুমৃত্যুর হার, শিশুদের স্কুলে পাঠ গ্রহণের সময়কাল, শিক্ষার মান, প্রাপ্তবয়স্কদের অন্তত ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে থাকা, শিশুদের সঠিক আকারে বেড়ে ওঠাসহ বেশ কয়েকটি সূচক দিয়ে এই প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। আদর্শ শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসুবিধা পেলে একটি শিশু প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে শতভাগ উৎপাদনশীলতা দেখাতে পারে। বাংলাদেশের একজন শিশু বিদ্যমান সুযোগ-সুবিধা পেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে গড়ে ৪৮ শতাংশ উৎপাদনশীলতা দেখাতে পারবে। আর পাকিস্তানের শিশুরা ৩৯ শতাংশ।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের বার্ষিক প্রতিবেদন মতে, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন সূচকেও বাংলাদেশ অনেকটাই পেছনে ফেলেছে ভারত ও পাকিস্তানকে। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের মধ্যে কেবল নেপালই বাংলাদেশের থেকে এগিয়ে। উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ৩৪। দক্ষিণ এশিয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনীতিগুলোর মধ্যে ভারতের অবস্থান ৬২, পাকিস্তানের ৫২ ও শ্রীলঙ্কার ৪০।
পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ আরও যেসব ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে, তার মধ্যে রয়েছে জঙ্গি ও সন্ত্রাস দমন। বাংলাদেশ জঙ্গি সমস্যাকে প্রায় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছে। অন্যদিকে বহু বছর ধরেই পাকিস্তান জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদের নিরাপদ স্থান হিসেবে পরিচিত। একদা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি তালেবান ছাড়াও ডজন খানেক জঙ্গিগোষ্ঠী দেশটিতে সক্রিয়। শুধু ভারত নয়, অপর দুই প্রতিবেশী আফগানিস্তান ও ইরানও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদ উসকে দেওয়ার অভিযোগ করে আসছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আকারে যেমন অনেক পার্থক্য, অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির দিক দিয়ে ব্যবধান আছে। পারমাণবিক শক্তিধর বিশাল এই প্রতিবেশীর সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নানান চড়াই-উতরাই পেরিয়ে চলেছে। অনেক সময় অভিন্ন নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত সমস্যা, সমুদ্রসীমা, বাণিজ্য ঘাটতি ইত্যাদি ইস্যুতে ভারতের সঙ্গে সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারেনি বাংলাদেশ। তার পরও স্বাধীন বাংলাদেশ নীরবে পথ চলে অনেক বিষয়ে ভারতের কাছে ঈর্ষার পাত্র হয়ে উঠেছে। সামাজিক উন্নয়ন সূচক বলছে, বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে ভারতের চেয়ে তেমন অন্যদিকে পাকিস্তানের চেয়েও এগিয়ে। ইতিহাসের অনিবার্য প্রত্যাঘাতের দেশ পাকিস্তান আজ উন্নয়নের সব সূচকে বাংলাদেশের পেছনে। অন্যদিকে আমার এগিয়ে যাচ্ছি দিনক্ষণ এশিয়ার সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক দেশের পথে।

