আমার পুতুল আমার নীলা | রেজা কামাল

আমার পুতুল আমার নীলা | রেজা কামাল

শিল্প-সাহিত্য | উত্তরদক্ষিণ
শুক্রবার, ২৫ ডিসেম্বর, ২০২০ | আপডেট: ১৪:৫০

যে কোন মানুষ তার বিপরীত লিঙ্গের মানুষের প্রতি আকর্ষণ অনুভব করে। এ আকর্ষণ নারী-পুরুষকে যে শুধু প্রেমের দিকেই টানে তা নয়। কখনো তা শুধু ভাল লাগার সীমানাতেই গভীরতা খুঁজে। ভাল লাগার বা প্রেমের আকর্ষণ, এ দুইয়ের পিছনে নাকি বৈজ্ঞানিক কারণ আছে। আধুনিক বিজ্ঞান মানুষের শরীরে সেইসব আকর্ষণ জাগানো উদ্দীপক পদার্থের সন্ধান পেয়েছে। মানুষের মস্তিষ্কে যখন ডোপামিন ও নোরিপাইন নামের রাসায়নিক পদার্থ উচ্চ মাত্রায় নিঃসৃত হয় তখন তাদের একসাথে সময় কাটানোর বাসনা তীব্র হয়ে উঠে। সাথে যদি সেরেটোনিন নামক পদার্থের নিঃসরণ হয় তবে সেই আকর্ষণ থেকে জেগে উঠে প্রেম। শিরি-ফরহাদ, লইলি-মজনুর সেরেটোনিন মাত্রা জানা গেলে বেশ ভাল হতো। সেরেটোনিন মাপার একটি যন্ত্র বানাতে কাজে লাগত। তাহলে প্রেমে পড়ার আগেই কারোর প্রেমের গভীরতার মাপ নেওয়া যেত। তাতে অন্তত প্রতারককে চিনা যেত।

প্রেমে পড়ার পর মানুষের কামভাব কখনো মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। এমনকি প্রবল কামাসক্তিতে কেউ তার নিজের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে। এর কারণ মূলত পুরুষের মধ্যে টেসটোসটেরন ও নারীর ক্ষেত্রে ইনট্রোজেন নামক হরমোনের রাজত্বের প্রভাব। উল্লেখিত সকল রাসায়নিকের অতিমাত্রায় সমাহার ঘটেছে নীলার শরীরে। নীলা আমার স্ত্রীর নাম। বিয়ের পরেই তার এই সমস্যার কথা ধীরে ধীরে আন্দাজ করতে পারি। খুব জটিল এক সমস্যা। এখন অবধি ডাক্তার দেখিয়ে খুব একটা লাভ হয়নি।
তার শারীরিক ও মানসিক চাহিদার যোগান দিতে বেশ ব্যস্ত সময় কাটাতে হয় আমাকে। তবে অস্বীকার করারও জো নেই, তার সাথে আমি আমার জীবনের মধুর সময় অতিবাহিত করছি। তার গভীর প্রেমে হিমশিম খেলেও আমি খুশি এই ভেবে যে, ক’জনের ভাগ্যে এতো নিখাদ প্রেম জোটে? সে অর্থে বেশ ভাগ্যবান পুরুষ আমি।
চাঁদেরও কলঙ্ক থাকে। এতো সুন্দর চাঁদের মাঝে চরকা বুড়ি যেন পেত্নী রূপে বসা। আমার নীলার শরীরেও পেত্নী এসে ভড় করেছে। তার মধ্যে কিছু অস্বাভাবিকতা তৈরি হয়েছে। সে এখন আলঝেইমার্সে আক্রান্ত। আলঝেইমার্সে আক্রান্ত রোগীরা তার স্মৃতিগুলি খুব দ্রুত ভুলে যায়। নীলাও ইদানীং তাই করছে। এই যেমন, সেদিন সে ঘুম থেকে উঠেই আমাকে বলছে,
বাবা, তোমার নাম কী?

আমার দাঁড়ি আছে ঠিক। তাই বলে বয়সে তার চেয়ে কতই বা বড়! বাবা ভাবার মতো নিশ্চয়ই নই? তাকে অনেক কষ্টে বুঝালাম, আমি তার জীবন সঙ্গী। সে যেন বিস্মিত হলো। অবাক হয়ে আমাকে দেখতে লাগলো। জানিনা কী বুঝলো। কিছুক্ষণ পর আমার বুকে এলিয়ে পড়ল। শুরু হলো তার প্রেমের আকর্ষণ। যেন এক চার্জ দেওয়া পুতুল। ব্যাটারি দেওয়া মাত্রই কাজে নেমে গেল। তবে পুতুলের এমন কাণ্ডে আমি অভ্যস্ত। পুতুলকে সময় দিয়ে দিয়ে এভাবেই কাটছে আমার জীবন।

ঘুমের মধ্যে পুতুল আমায় ভুলে গেলেও ঘুমের পর চিনিয়ে দেবার পর পুতুল যেমন করে আমায় তার নিঃস্বার্থ ভালবাসায় সিক্ত করে রাখে তাতে আমি আমার পুতুলের কাছে ঋণীই বটে। কারণ পুতুল আমার জীবনকে ভালবাসায় পূর্ণ করে রেখেছে। আজ আমার পুতুলের বিবাহ বার্ষিকী। নিত্য দিনের মতো আজকেও তাকে চিনিয়ে দিতে হলো যে আমি তার স্বামী।

আজ সে বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছে। আমাদের বিবাহ বার্ষিকীর কথা জানার পর থেকেই সে খুব উত্তেজিত। সারাদিন সে আমার পিছনে জোঁক-কামড়ে লেগেছিল। তাতেও তার সাধ মেটেনি। বেশ রাত হয়েছে, অথচ সে ঘুমাতে চায় না। রাত জেগে সে বাসর করতে চায়। নীলাকে আমি কোন অবস্থাতেই অখুশি রাখতে চাই না। এটা আমার নিজের সাথে নিজের পণ। কারণ সে অসুস্থ। এ নিয়ে তার কষ্ট না বাড়িয়ে আমি তাকে এক মধুময় জীবন উপহার দিতে চাই।

নীলা আজ কী সুন্দর করে সেজেছে! যেন সেই প্রথম বাসর রাতের নীলাকেই দেখতে পাচ্ছি আজ। তবে আমি দ্রুতই অনুভব করতে থাকি, নীলার মধ্যে ইনট্রোজেন প্রভাব বিস্তার শুরু করেছে। আমি ভয়ে আঁতকে উঠলাম। কারণ ডাক্তার বলেছিলেন, এ ধরণের রোগীর ঘুম কম হলে বা ক্লান্ত দেহে ইনট্রোজেন অধিক ক্রিয়া করলে উত্তেজনা বশত প্রাণ হারাতে পারে। কিন্তু আমিও রক্ত মাংসের মানুষ। কিছুক্ষণের মধ্যে হিসেব নিকেশ এলোমেলো হয়ে গেল। আমার নিজের টেসটোসটেরনের প্রভাব আমার সকল বৈজ্ঞানিক চিন্তাভাবনা ও ডাক্তারি পরামর্শকে ভুলিয়ে দিল। তাতে ফল ভাল হয়নি। হঠাৎ চিৎকার দিয়ে নীলা দ্রুত শ্বাস-নিশ্বাস নিতে লাগলো। কী করবো ভেবে উঠতে পারছি না। নিজের উপর প্রচণ্ড রাগ হলো। নীলা না হয় বুঝতে পারেনি। আমি তো এর পরিণতি জানতাম। আমি কেন এমনটি করলাম? নিজের প্রতি ঘৃণা ভরে ঘর হতে বের হয়ে এলাম। চাপে মাথা ভনভন করছে। সম্ভবত ব্রেইন ভাল কাজ করছে না। অন্ধকারে কোথাও একটু ধাক্কা খেলাম। মনে হলো আমি উপর থেকে পড়ে যাচ্ছি।

হ্যাঁ, সত্যি তাই হলো। আমি চারতালার বারান্দা হতে পড়ে যাচ্ছি। চারতলা হতে নিচ পর্যন্ত পড়ার জন্য খুব অল্প সময়ের রাস্তা। কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছে এতটুকু রাস্তা নেমে আসতে এক যুগ ধরে হাওয়ায় পাড়ি দিচ্ছি। কারণ চেয়ে দেখি আমার পুতুল নীলাও আমার সাথে উড়ে উড়ে নামছে। নীলা পাশে আছে ভেবে সাহস পাচ্ছি। পড়তে বেশ আরামই লাগছে। কিন্তু নীলা আমার সাথে অনেক কথা বলতে চায়। অনেক কথা তার বলার বাকি। তবে কী নীলার শরীরে ডোপামিন ও নোরিপাইনের নিঃসরণ শুরু হয়েছে। ভাবনার মধ্যেই হঠাৎ শক্ত একটা ঝাঁকুনি খেলাম। তারপর আর কিছু মনে নেই। কিছুক্ষণ পর নীলার স্পর্শ পেলাম। সে আমায় ডাকছে।
চল বাসায় ফিরে যাই। আমরা এখন সম্পূর্ণ সুস্থ।
কোথায় আমাদের বাসা?
একটু হাঁটতে হবে। চলো আমার সাথে।
আমি নীলাকে অনুসরণ করছি। কিন্তু এরমধ্যেই অনেক মানুষ এসে জড়ো হলো। আমি অনুভব করছি, তারা আমায় দেখতে পাচ্ছে না। তাদের অনেকেই অস্ফুটে আমায় গালি দিচ্ছে।
যাক বাবা, কুলাঙ্গারটা মারা গেল। তাতে এলাকার মানুষ বাঁচল। কী উদ্ভট রোগ ছিল তার। ঘুম থেকে উঠেই সে সব ভুলে যেত। মেয়ে দেখলে তার হুশ থাকতো না। মেয়ে মানুষ চোখে পড়লেই পাগলটা আরও পাগল হয়ে যেত। এবার এলাকার মেয়েগুলি শান্তিতে চলতে পারবে। আমি খুব অবাক হলাম। তারা কার কথা বলছে? আমার নাম বলছে কেন? আমি কী মারা গেছি? তাহলে সব দেখতে পাচ্ছি কেমনে? আর যা বলছে সেসব তো নীলার সমস্যা। আমি আবার কখন আলঝেইমার্সে আক্রান্ত ছিলাম। তাছাড়া আমি কোন মেয়ের ক্ষতি করেছি এমন তো মনে পড়ছে না। আমি আমাকে যেন চিনতে পারছিনা।
নীলা, নীলা? এরা এসব কী বলছে?

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading