একুশে বিষমুক্ত হোক বিশ্ব

একুশে বিষমুক্ত হোক বিশ্ব

সম্পাদকীয় | উত্তরদক্ষিণ
মুদ্রিত সংস্করণ: রবিবার, ০৩ জানুয়ারি, ২০২১ | আপডেট: ০০:০১

দুই হাজার বিশ সাল। ‘২০’ উচ্চারণের বানান বিষাক্ত না হলেও শুনতে বিষাক্ত হয়ে উঠেছে ২০২০ সালে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্খিত সব নির্মম বিষয়াবলীর কারণে। এমন অকল্যাণের কাল আর কখনও বিশ্বে আসেনি মনে হয়, আর আসুক সেটাও কেউ চাইবে না। বরাবরের মতো নতুন বছরটি (২০২০) শুরু হয়েছিল প্রবল আশাবাদ নিয়ে। কিন্তু বিধিবাম। ২০২০ সাল আসার ঠিক আগের দিনই চীনের উহানে ধরা পড়ে করোনাভাইরাস। আর সেটাই ‘বিষময়’ হয়ে ওঠে পুরো বছরটি জুড়ে। করোনার বিষে নীল হয়ে যায় গোটা বিশ্ব। সেই সাথে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে পড়ে হাজারো বিপর্যয়।

যদিও করোনার মতো বৈশ্বিক মহামারি এই প্রথম নয়। কিন্তু বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষতার এই যুগে ক্ষুদ্র এক অণুজীবের কাছে মানবজাতির অসহায়ত্ব বড় বিস্ময়ের। বছরজুড়েই লকডাউন, কোয়ারেন্টিন, আইসোলেশন আর সামাজিক দূরত্বে স্থবির হয়ে যায় পুরো বিশ্ব। ২০১৯-এর ৩১ ডিসেম্বরে শনাক্ত হওয়া এ ভাইরাস ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে ২১৯টি দেশ ও অঞ্চলের প্রায় ২০ লাখ মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, ভাইরাসটিতে আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় সাড়ে ৮ কোটি মানুষ।

ছোট্ট এই ভাইরাস বদলে দিয়েছে গোটা বিশ্বকেই। এতদিন মানুষ প্রকৃতির ওপর নানা অবিচার করেছে। আর করোনা এসে মানুষকে অবরুদ্ধ করে প্রকৃতিকে উন্মুক্ত করে দেয়। এ যেন প্রকৃতির প্রতিশোধ। তাতেও তার ক্ষুধা মেটেনি। এখন আবার বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে করোনার নতুন স্ট্রেইন।

অনেকের জীবন থেকে আস্ত একটি বছর কেড়ে নিয়েছে। অনেকে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন, অনেকের সংসার ভেঙেছে, দেউলিয়া হয়ে গেছে বহু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, বন্ধ হয়ে গেছে বহু কর্মকাণ্ড; এমনকি বছরের বড় একটা সময় ধরে রাষ্ট্রীয় প্রায় সব অর্থনৈতিক তৎপরতা বন্ধ ছিল, বন্ধ ছিল আন্তর্জাতিক যোগাযোগ। পর্যটন, বিনোদন, খেলার স্থবিরতা কাটেনি এখনও। এই এক বছরের ধাক্কা কাটাতে কত বছর লাগবে কেউ জানে না। গোটা বিশ্বের শিক্ষা ব্যবস্থা বন্ধ প্রায়। অনলাইন ক্লাসেই চলছে পুষিয়ে নেওয়ার চেষ্টা। বাংলাদেশে ১৭ মার্চ থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। কবে খুলবে কেউ জানে না। এরই মধ্যে পিইসি, জেএসসি এবং এইচএসসি পরীক্ষা বাতিল হয়েছে। সবাই অটো প্রমোশন পেয়ে যাবে। কিন্তু ক্লাসরুমে পড়াশোনা ছাড়া এই অটো প্রমোশন ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে নিশ্চয়ই নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

শুধু অর্থনীতি, শিক্ষা বা রাজনীতি নয়; করোনা প্রভাব ফেলেছে আমাদের ব্যক্তিজীবনেও, ওলটপালট করে দিয়েছে আমাদের মনোজগত। দীর্ঘ লকডাউনে পারিবারিক সম্প্রীতি যেমন বেড়েছে, বেড়েছে অস্থিরতা, উদ্বেগ, কোথাও ঝগড়াও বেড়েছে। মৃত্যুভয় অনেক অবিশ্বাসীকে বিশ্বাসী বানিয়েছে, ধর্মে-কর্মে মন দিয়েছেন অনেকে। আবার প্রবল শোকে বিশ্বাসী কারও কারও বিশ্বাস হারানোর ঘটনাও ঘটেছে। করোনা বিশ্বে বৈষম্য আরও বাড়িয়েছে। গরিব আরও গরীব হয়েছে। প্রান্তের মানুষ প্রায় ছিটকে পড়ার দশা। এরই মধ্যে আবার অল্প কিছু মানুষের আয় বেড়েছে। দুর্নীতি করে অনেকে আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন। করোনা আমাদের অনেককে মিতব্যয়ী বানিয়েছে। আবার অনেকে পয়সা খরচ করার রাস্তা পাননি। লকডাউন চলাকালে পিকনিকে মেতে উঠেছেন অনেকে। করোনা বৈশ্বিক মহামারি আমাদের অনেক মানবিক করেছে। একজনের বিপদে আরেকজন পাশে দাঁড়িয়েছে। আবার করোনা সন্দেহে মাকে জঙ্গলে ফেলে রাখার মতো অবিশ্বাস্য অমানবিকতাও দেখেছে বিশ্ব।

তবে সব কিছুর মধ্যেও আশার কথা হলো বিশ্বের বড় বড় অর্থনীতির দেশ যখন করোনার চাপে বিধ্বস্ত, বাংলাদেশ তখন প্রবৃদ্ধির চাকা গতিশীল রাখতে পেরেছে। মাথাপিছু গড় আয়ে ছাড়িয়ে যাচ্ছে ইন্ডিয়াকেও। নিজেদের অর্থে প্রমত্তা পদ্মার দুই পাড়ে সেতুবন্ধন গড়ে প্রমাণ রেখেছে নিজেদের সক্ষমতার। বাংলাদেশ সরকারের দূরদর্শিতায় বছরের শেষদিকে এসেছে আরও দুটি সুখবর। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) ২০২০ সালের দ্য হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট প্রতিবেদনের মানব উন্য়ন সূচকে গত বছরের তুলনাযয় দুই ধাপ এগিযয়েছে বাংলাদেশ। আর ব্রিটেনভিত্তিক সেন্টার ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড বিজনেস রিসার্চ-সিইবিআরের নতুন প্রতিবেদন বলছে, ২০৩৫ সালে বিশ্বের ২৫তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হবে বাংলাদেশ। এর মধ্যে করোনার ভ্যাকসিনও আবিষ্কৃত হয়েছে, বিভিন্ন দেশে এর প্রয়োগও শুরু হয়েছে। বাংলাদেশেও কিছু দিনের মধ্যে ভ্যাকসিন দেয়া শুরু হবে বলে জানা যাচ্ছে। ২০২০ সাল পার করে আমরা এসেছি ২০২১-এ… ‘একুশে বিষমুক্ত হোক বিশ্ব’ এটাই এখন একমাত্র প্রত্যাশা।

Md Enamul

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading