ঢাকার বায়ুদূষণ রোধ হবে কবে?
সম্পাদকীয় | উত্তরদক্ষিণ
মুদ্রিত সংস্করণ: মঙ্গলবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২১ | আপডেট: ০০:০১
বায়ু দূষণে বিশ্বের শীর্ষ শহরগুলোর মধ্যে ঘুরেফিরে ঢাকার নাম আসবেই। রিয়েলটাইম এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সে গত শুক্রবারও (১৫ জানুয়ারি) ঢাকার বাতাস ছিল ‘খুবই অস্বাস্থ্যকর’। জানা গেছে, ২০০৯ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত ঢাকার বাতাসের মানোন্নয়নে ৮০২ কোটি টাকা ব্যয়ে সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ (কেইস) শীর্ষক একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছিল পরিবেশ অধিদফতর। কিন্তু বাতাসের মান উন্নয়ন হয়নি, বরং ১২ বছরে দূষণ আরও বেড়েছে। এ অবস্থায় নতুন করে আরও সাত হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। দেশের পরিবেশের মানোন্নয়নে যা এ যাবতকালের সবচেয়ে বড় প্রকল্প হবে বলে জানিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ুমন্ত্রী।
পরিবেশ অধিদফতরের তথ্যমতে, বায়ুদূষণের স্কোর ৫০-এর নিচে থাকার অর্থ হলো বাতাসের মান ভালো। স্কোর ৫১ থেকে ১০০ হলে বাতাসের মান গ্রহণযোগ্য বলে ধরে নেওয়া হয়। তবে এ অবস্থায় শিশু, বয়স্ক ও যাদের শ্বাসকষ্ট আছে তাদের বাইরে বেশি সময় না থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। ১৫১ থেকে ২০০ এর মধ্যে স্কোর থাকার অর্থ হলো সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যের ওপরও এর খারাপ প্রভাব পড়বে। আর সূচক ২০১ থেকে ৩০০-এর মধ্যে থাকার অর্থ হলো প্রত্যেকেই মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়বে। এমনটা হলে ধরে নেওয়া হয় ওই এলাকায় স্বাস্থ্যসংক্রান্ত জরুরি অবস্থা চলছে।
করোনা মহামারির প্রকোপে লকডাউন পরিস্থিতিতে কিছুদিনের জন্য হলেও ঢাকায় বায়ুদূষণের সমস্যা কিছুটা কমেছিল। নিউ নরমাল জীবন শুরু হতে না হতেই আবার শুরু হয়েছে বায়ুদূষণের মহোত্সব। এতদিন প্রতিবেশী দেশ ইন্ডিয়ার দিল্লি ছিল বায়ুদূষণে শীর্ষে। সেই দিল্লির চেয়ে দ্বিগুণের বেশি দূষিত এখন আমাদের এই ঢাকা। টানা কয়েক বছর ধরে বায়ুদূষণে ঢাকা বিশ্বের শহরগুলোর মধ্যে প্রথম দিকেই থাকছে।
সম্প্রতি ‘কারেন্ট সায়েন্স’ পত্রিকার এক গবেষণায় প্রকাশ, বায়ুদূষণের কারণে অন্য অসুখ-বিসুখের পাশাপাশি অ্যাথেরোসে্ক্লরোসিস নামক রোগের গতি বাড়ছে। যার অর্থ, রক্তবাহী ধমনীতে চর্বি জমে রক্ত চলাচল কমে যাওয়া। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাভাবিক নিয়মে বয়স বাড়লে, ওজন বেশি হলে এবং ভুল খাদ্যাভ্যাসের ফলে অ্যাথেরোসে্ক্লরোসিস হয় ঠিকই। তবে বায়ুদূষণ এই রোগের গতি আরও বাড়িয়ে দেয়। ফলে হূদরোগ ও ব্রেইন স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। বিশ্বব্যাপী সমীক্ষায় প্রকাশ্তপ্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে ২৭৫০ জন মারা যায় বায়ুদূষণজনিত নানা শারীরিক সমস্যায়।
বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন- বাতাস, শব্দসহ অন্যান্য দূষণ মানুষ ও পরিবেশের অন্য প্রাণীদের উপর কতটা ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। গাড়ি ও কারখানার ধোঁয়ার পাশাপাশি বাড়িতে রান্নার জ্বালানির কাজে ব্যবহূত লাকড়ির চুলা বা কেরোসিন স্টোভের ধোঁয়াও আমাদের হূদপিণ্ড, ফুসফুসসহ সামগ্রিক শরীরের পক্ষে মারাত্মক ক্ষতিকর। রান্নার ধোঁয়াতে থাকে সূক্ষ্ম ভাসমান কণা। যেগুলো অত্যন্ত ছোট্ট (২.৫ মাইক্রন)। নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের সময় এই ভাসমান কণাগুলো শ্বাসনালী দিয়ে সরাসরি শরীরে প্রবেশ করে। বিজ্ঞানীরা জানান, পিএম ছাড়াও দূষিত বাতাসে থাকে নাইট্রোজেন, সালফার ও কার্বন মনোক্সাইড। এসব রাসায়নিক একই সঙ্গে ধমনীর ভেতরে লাইনিং-এর কার্যকারিতাকে নষ্ট করে দেয়। এর ফলে হূদপিণ্ড ও মস্তিষ্কের ধমনীতে কোলেস্টেরলের প্রলেপ জমে। ফলে প্রাথমিকভাবে শ্বাসকষ্টসহ নানা উপসর্গ দেখা দেয়। এভাবে বাতাসের ভাসমান কণা হূদরোগীদের ‘কার্ডিও রেসপিরেটরি ফেইলিওর’-এর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। পরবর্তীকালে হূদরোগ এবং ব্রেইনস্ট্রোকের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
ঢাকার বিষাক্ত বাতাসের যে চিত্র আমরা প্রতিনিয়ত দেখছি এবং এর প্রভাবে মানুষের রোগব্যাধির কথা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাতে আমাদের স্বস্তিতে থাকার কোনো কারণ নেই। শীতকালে এমনিতেই বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়ে যায়। কারণ এ সময়ে বায়ুমণ্ডলে মিশে থাকা দূষণকারী পদার্থ ওপরে উঠতে পারে না।
বায়ুদূষণ রোধে দরকার পরিকল্পিত কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা। স্থাপনা তৈরি কিংবা উন্নয়নমূলক কাজ যেমন ফুটপাত সংস্কার, উড়াল সেতু নির্মাণ ও পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থার জন্য খোঁড়াখুঁড়ির ক্ষেত্রে বায়ুদূষণ রোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা। পরিবহনের ধুলাবালি কমাতে ব্যবস্থা নেয়া। মূল কথা হলো, বায়ুদূষণ মোকাবিলার জন্য দূষণের উেস হাত দেওয়া জরুরি। আমাদের উচিত এখনই রাষ্ট্রীয়ভাবে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ে সচেতনতা অবলম্বন করা। অপরিকল্পিত শিল্প, যানবাহনের কালো ধোঁয়া, ইটভাটা ও নির্মাণকাজ নিয়মিত তদারকি করা। একই সঙ্গে শহরের বিভিন্ন স্থানে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলা এবং জলাশয় বাড়ানোটাও জরুরি।

