বিপ অ্যাপ এবং হুজুগপ্রিয় বাংলাদেশিদের অবস্থা
প্রতিক্রিয়া| উত্তরদক্ষিণ
মুদ্রিত সংস্করণ: রবিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২১ | আপডেট : ০০:০১
গত কয়েক ধরেই বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেখা যাচ্ছে তুরস্কের সামাজিক মাধ্যম ‘বিপ’ নিয়ে বন্দনা। ‘বাংলাদেশে হঠাৎ জনপ্রিয়তায় তুরস্কের মেসেজিং অ্যাপস বিপ’, ‘হঠাৎ কেন এত জনপ্রিয় বিপ?’, ‘তুরস্কের ‘বিপ’ অ্যাপে ঝুঁকছে বাংলাদেশ’, ‘বিপ’ অ্যাপে মজেছে বিশ্ব। গণমাধ্যমে প্রযুক্তির পাতা খুললেই দেখা যাচ্ছে এসব হেডলাইন। এর মধ্যে আরও কিছু উল্লেখ না করলেই নয় যেমন- সিগনাল, টেলিগ্রাম। এসব অ্যাপগুলো বলতে গেলে ভালোই পুরনো। কিন্তু হঠাৎ করেই কেন এসব অ্যাপ নিয়ে কেন মাতামাতি হচ্ছে?
এতদিন সারাদেশে হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, মেসেঞ্জার, ইমো মেসেজিং অ্যাপের দিক দিয়ে জনপ্রিয় থাকলেও হঠাৎ করেই কেন অন্য অ্যাপগুলোর চাহিদা বেড়ে গেল! হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার, মেসেঞ্জার, ইমো যুগের সঙ্গে মিলিয়ে দিন দিন নতুন ফিচার আনছে। তবুও কেন মানুষ হঠাৎ করেই ঐসব অ্যাপে ঝুঁকছে?
শুরুটা হোয়াটসঅ্যাপের জন্য। কারণ সম্প্রতি সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিষ্ঠানটি নীতিমালায় কিছু পরিবর্তন আনে। নিজেদের এক ঘোষণায় ব্যবহারকারীদের সঙ্গে সম্পর্কিত বেশ কিছু নীতিমালায় পরিবর্তন আনে হোয়াটসঅ্যাপ। সংক্ষেপে বললে, ব্যবহারকারীদের প্রায় সব ধরনের তথ্য সংগ্রহ করবে হোয়াটসঅ্যাপ। আগামী মে মাস থেকে নতুন এই নীতিমালা কার্যকর হবে বলে জানায় হোয়াটসঅ্যাপ। ইউরোপ-আমেরিকা ছাড়া বিশ্বের সকল দেশের জন্য এই আইন কার্যকর হবে। এমনকি নতুন এই পরিবর্তন গ্রহণ না করলে মোবাইলেও আর চলবে না হোয়াটসঅ্যাপ।
২০২০ সালের এক হিসেব মতে, বিশ্বে প্রায় দুই বিলিয়ন ব্যবহারকারী রয়েছে হোয়াটসঅ্যাপের। তবে গত এক সপ্তাহেই ২০ লাখ ব্যবহারকারী হারিয়েছে হোয়াটসঅ্যাপ।
মূলত নীতিমালা পরিবর্তনের ঘোষণা আসার পর থেকেই ব্যবহারকারীদের একটি বড় অংশ হোয়াটসঅ্যাপ বিমুখ হতে শুরু করেন। বিকল্প হিসেবে তুরস্কের বিপ অ্যাপ বেশ জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেছে ব্যবহারকারীদের মাঝে। পাশাপাশি আমেরিকার সিগনাল এবং রাশিয়ার টেলিগ্রামও ব্যবহারকারীদের পছন্দের শীর্ষে উঠে আসছে।
সারাবিশ্বে এখন প্রায় ৫০ মিলিয়নের বেশিবার প্লে-স্টোরে ডাউনলোড হয়েছে বিপ। শুধু বাংলাদেশ থেকেই অ্যাপটি বর্তমানে ডাউনলোডে শীর্ষে অবস্থান করছে। এ নিয়েও সংবাদ প্রকাশ করেছে তুরস্কের রাষ্ট্রীয় বার্তাসংস্থা আনাদলু এজেন্সি।
বাংলাদেশি ব্যবহারকারীদের অ্যাপ ডাউনলোডের র্যাংকিং বিবেচনায় দেখা যাচ্ছে, বিপ’র ডাউনলোড মাত্র একদিনের ব্যবধানে ৯২ ধাপ এগিয়ে গিয়ে শীর্ষে উঠে এসেছে। জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা অন্যান্য ম্যাসেজিং অ্যাপগুলোকে পেছনে ফেলে তালিকার শীর্ষে জায়গা করে নিয়েছে তুরস্কের তৈরি ‘বিপ’ অ্যাপটি। আর দুই নম্বরে অবস্থান করছে হোয়াটসঅ্যাপ।
গণমাধ্যমসূত্রে জানা যায়, আইফোন ও অ্যান্ড্রয়েড চালিত মোবাইল ফোনে ডাউনলোড করা যায় অ্যাপটি। ডেস্কটপেও ব্যবহার করতে পারবেন অ্যাপটি। মোবাইল ডেটা বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাপ অ্যানি’ জানাচ্ছে, বাংলাদেশে এখন সবার শীর্ষে রয়েছে তুরস্কের অ্যাপ বিপ।
বিশ্বে মানুষ প্রাইভেসি নিয়ে আগের তুলনায় বেশি সচেতন। বাংলাদেশেও অনেক ব্যবহারকারী প্রাইভেসিকে গুরুত্ব দেন। তাই হয়ত তাঁরা হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার ছেড়ে দিতে পারে। কিন্তু অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, বিশ্বে এত মেসেজিং অ্যাপ থাকতে তুরস্কের বিপ অ্যাপে কেন ঝুঁকছে বাংলাদেশিরা?
বাংলাদেশের মানুষের সাথে তুরস্কের একটা বড় মিল হচ্ছে, দুই দেশই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ। আরেকটি ব্যাপার হতে পারে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেজেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। কারণ বাংলাদেশে তাঁর মুসলিম নেতা হিসেবে রয়েছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা। শুধু মুসলিম দেশের অ্যাপ বলেই কি ‘বিপে’ ঝুঁকছে বাংলাদেশিরা? নাকি গুজবপ্রবণ বাঙালি গুজবে কান দিয়েই বিপের দিকে ঝুঁকছে?
মানুষের বিপ অ্যাপের প্রতি আকৃষ্ট হওয়ার একাধিক কারণ কারণ থাকতে পারে। যেমন- তুরস্কের প্রেসিডেন্ট যখন হোয়াটসঅ্যাপ ছেড়ে বিপ ব্যবহারের ঘোষণা দিলো, তখন এর একটি প্রভাব পড়েছে। আরেকটি কারণ হতে পারে- বিপ কতৃপক্ষের ঢাকঢোল পিটিয়ে ‘গোপনীয়তার স্বর্গ’ হিসেবে দাবি করা। এটি এন্ড-টু-এন্ড এনক্রিপটেড, অর্থাৎ ভয়েস কল এবং মেসেজ আদান-প্রদান গোপন থাকবে এবং এটি কেউ হ্যাক করতে পারবে না বলা হচ্ছে।
টার্কিশ এই প্রতিষ্ঠানটি দাবি করেছে, এই অ্যাপের মাধ্যমে একসঙ্গে ৬ জনকে যুক্ত করে অডিও-ভিডিও কল, মেসেজ, ছবি এবং ভিডিও আদান-প্রদান করা যায়। এখানে সিক্রেট চ্যাট করার ব্যবস্থাও রয়েছে। কোন ব্যবহারকারী যদি নির্দিষ্ট সময় পরে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মেসেজ মুছে দিতে চান, তাহলে সে অনুযায়ী সময় সেট করা যাবে। এছাড়াও বলা হয়, ব্যবহারকারীদের তথ্যগুলো এনক্রিপটেড ভল্ট-এ রাখে প্রতিষ্ঠানটি। শুধু ব্যবহারকারীরাই এটি খুলতে পারে।
২০১৩ সালে তুরস্কের সবচেয়ে বড় টেলিকম সংস্থা তুর্কসেল চালু করে এই অ্যাপটি। গত কয়েকদিনে তুর্কসেলের এই অ্যাপটি নতুন করে ৪০-৫০ লাখ ব্যবহারকারী ডাউনলোড করেছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে সত্যিই কি এই অ্যাপটি ‘গোপনীয়তার স্বর্গ’?
মূলত হোয়াটসঅ্যাপ-এর নতুন প্রাইভেসি পলিসি নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের যোগাযোগ দপ্তর এবং দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। এতে যোগাযোগের গোপনীয়তা থাকবে না বলে তাদের সন্দেহ এবং সেজন্যই তারা হোয়াটসঅ্যাপ বাদ দিয়ে বিপ অ্যাপ ব্যবহার করা শুরু করার ঘোষণা দেয়। আর এর প্রভাব আমাদের বাংলাদেশিদের মধ্যেও পড়েছে।
হোয়াটসঅ্যাপের আগেও গুগল, ইউটিউব এবং ফেইসবুকের বিরুদ্ধে কঠোর হয়েছে তুরস্ক সরকার এবং তাদেরকে দেশটিতে অফিস খুলতে বাধ্য করেছে। আর এখন এরদোগান সরকার চাইবে হোয়াটসঅ্যাপ যেন তুরস্কে তাদের অফিস খুলে ব্যাবহারকারীদের সব তথ্য তুরস্কেই রাখে এবং তুরস্কের আইন মেনে সব কাজ করে। আর তা নাহলে হোয়াটসঅ্যাপে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে বিপ অ্যাপ চালানোর জন্য জনগণকে উদ্বুদ্ধ করবে। আর তা তুরস্ক নিজেদের স্বার্থের জন্যই করবে।
এখন আসা যাক বিপ অ্যাপের যাত্রা শুরুর দিকে–তুর্কসেলের হাত ধরে এই অ্যাপের যাত্রা শুরু। ১৯৯৪ সালে প্রতিষ্ঠিত তুর্কসেলের মালিক মেহমেত এমিন কারামেহমেত। তুরস্কের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধনী ব্যাক্তি। তুরস্কের হুররিয়াত পত্রিকার ২০০৪ সালে প্রকাশিত এক খবর অনুযায়ী এই কারামেহমেত আমেরিকার ইহুদি লবি সংগঠন দি জিউশ ইন্সিটিউট ফর ন্যাশনাল সেক্যুরিটি অফ আমেরিকা নামে একটি সংস্থার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে। এছাড়াও জার্মান ভিত্তিক প্রভাবশালী ইহুদি পরিবার রথচাইল্ড ফ্যামিলির ঘনিষ্ঠতা এবং একত্রে ব্যবসাও করেছেন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে আজকের এই ‘বিপ’ কি একদিন হোয়াটসঅ্যাপের মতো তাঁদের নীতিমালা পরিবর্তন করবে না? বা তাঁরা সত্যি বলছে এইটারই বা কতোটুকু মেনে নেওয়া যায়? অথবা তৃতীয় কোন পক্ষের কাছে তথ্য বিক্রি করছে না তারই বা নিশ্চয়তা কতোটুকু?
ইহুদি পরিবার রথচাইল্ড ফ্যামিলি হলো বিশ্বের একমাত্র ট্রিলিয়ন ফ্যামিলি। এই পরিবারের প্রত্যেকেই একেকজন বিলিয়নিয়ার। এদের মোট সম্পদ বিশ্বের অনেক দেশের মোট সম্পদের চেয়ে বেশি। আঠারো শতকের ষাটের দশকে ব্যাংকিং ব্যবসা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আজকের অবস্থানে উঠে আসে এই ইহুদি পরিবার। এই পরিবার শুধু বিশ্বের সবচেয়ে ধনাঢ্য পরিবার নয়, বরং তারা সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় পরিবারও। এদের সম্পদের উৎস নিয়ে রয়েছে অনেক বিতর্ক, তাই তাদেরকে। বিশ্বের সেরা ধনীদের তালিকা প্রকাশের সময়ও নাম রাখা হয় না। এখন এই রথচাইল্ড ফ্যামিলির সাথে মেহমেত এমিন কারামেহমেতের এমন ঘনিষ্ঠতায় বিপ কতোটুকু ‘গোপনীয়তার স্বর্গ’ হিসেবে থাকবে তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে। তবে যাই হোক তুরস্কের জন্য যে বিপ হুমকিস্বরূপ না তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
তাছাড়াও ইন্টারনেটে যোগাযোগের সফটওয়্যার বা অ্যাপের মাধ্যমে পাঠানো বার্তাগুলো শতভাগ গোপনীয় বা এসব বার্তা তৃতীয় কোনো ব্যক্তি উদ্ধার করতে পারবে না, এমন দাবি অযৌক্তিক বলে বার বার দাবি করে আসছেন বিশেষজ্ঞরা।
গুগল ষ্টোরে দেখা যায়, পুরো বিশ্বে হোয়াটসঅ্যাপ ডাউনলোড হয়েছে কমবেশি ২০০ কোটি। অন্যদিকে বিপ অ্যাপ টার্গেট করেছে আগামী কিছুদিনের মধ্যে ১০ কোটি পূর্ণ করবে। সুতরাং বিপ অ্যাপ হোয়াটসঅ্যাপের ধারেকাছেও নেই। এখন শুধু দেখার অপেক্ষা হোয়াটসঅ্যাপ-এর জায়গা কতোটুকু নিতে পারবে বিপ। নাকি সাময়িক সময় আলোচনায় থেকে অন্যান্য অনেক অ্যাপের মতোই হারিয়ে যাবে। লেখক: মশিউর রহমান, সংবাদকর্মী

