ফেব্রুয়ারি গেলেই যেন ভাষার মাসের চেতনাও বিদায় না হয়ে যায়
অভিমত | উত্তরদক্ষিণ
রবিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ | আপডেট: ০০:০১
তাসফিয়া আহমেদ-
বাঙ্গালি হিসেবে নিঃসন্দেহে আমরা গর্বিত জাতি। বাংলাই পৃথিবীর একমাত্র ভাষা যার জন্য অনেক মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে। যা পৃথিবীর ইতিহাসেও বিরল। প্রায় ৪৭ বছর পর হলেও সেই রক্ত আর প্রাণের প্রতিদান পেয়েছে সমগ্র বাঙালি জাতি। বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বাঙালি জাতি বাস করে থাকে। তবে এর বাইরেও বাংলা ভাষাভাষীর আরও মানুষ রয়েছেন। তবে শুধুমাত্র ভাষার জন্য প্রাণ দিতে হয়েছে বাংলাদেশি (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের) মানুষরা। যার ফলস্বরূপ বাধ্য হয়েই ১৯৫৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারিতে বাংলাকে দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে সংবিধানে পরিবর্তন করতে বাধ্য হয় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার। শুধু তাই নয় বাংলা ঠাই করে নেয় আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার জায়গা। এরপর ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে ১৮৮টি দেশ সমর্থন জানালে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এমনকি ২০০০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি থেকে দিবসটিকে জাতিসঙ্ঘের সদস্যদেশসমূহ পালন করে আসছে। তবে ২০১০ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬৫তম অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়।
যে ভাষার জন্য এতকিছু। এখন সেই ভাষায় অনেক শব্দ হারানোর পথে। এমনকি ভাষার অনেকাংশে মিশে যাচ্ছে বিদেশি ভাষাও। এছাড়াও ভাষার মাস গেলেও ভাষার প্রতি কদরও কমে যায়। যা সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাপকভাবে লক্ষ করা যায়। যেমন ইংরেজি নতুন বছরের পর ফেব্রুয়ারি আসলেই একুশকে ঘিরে শুরু হয় কত কিছু। জায়গায় জায়গায় বইমেলা। শহিদ মিনার পরিষ্কারের কাজ। যেখানে সারাবছরই অধিকাংশ শহীদ মিনার ধুলো দেখা যায়। ফেব্রুয়ারি আসলেই যেন শহীদ মিনারের কদর হাজার গুণ বেড়ে যায়। যেখানে সারা বছর মাঝে মাঝে বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবরে দেখা যায়, শহীদ মিনারে জুতা নিয়ে প্রবেশ, এছাড়াও বখাটেদের আড্ডা, অনেক সময় মাদক পানের দৃশ্যও গণমাধ্যমেও উঠে আসে। যে ভাষার জন্য আমাদের রক্ত আর প্রাণ দিতে হয়েছে আজ তার প্রতিক শহীদ মিনারের এমন অবমাননা কিঞ্চিত হলেও হ্রদয়ে আঘাত আনে অনেক বাঙালির।
বাস্তব এসব দৃশ্য নিয়ে কথা বলার অর্থ কোন একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীকে উদ্দেশ্য করে নয়। কারণ আমি আপনি আমরা আমাদের চারপাশে খেয়াল করলে এমন দৃশ্য দেখা যায়। যার জন্য অনেকাংশে আমরাও দায়ী।
ইতিহাসের কিছু কথা না তুলে ধরলেই নয়, এই ভাষার জন্য আমাদের কি কি করতে হয়েছে। কত রক্ত আর প্রাণ দিতে হয়েছে। ফিরে যেতে হবে ৭২ বছর পিছনে। ১৯৪৮ সালের মার্চ মাসে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকায় সফরে এসে উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন পাকিস্তানের গভর্নর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। এরপরই রাগে ক্ষোভে ফেটে উঠে পুর্ব বাংলার জনগণ। সেদিন ‘নো নো’ ধ্বনিতে আকাশ-বাতাস কেঁপে তুলে এ দেশের ছাত্র-যুবকরা। এরপর নানা বিক্ষোভের মুখে ১৯৫২ সালে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ১৪৪ ধারা জারি করে। ২১ শে ফেব্রুয়ারিতে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে সড়কে নেমে আসে আন্দোলনরত ছাত্ররা।
ঐদিনই ১৪৪ ধারা ভেঙে ছাত্র-জনতার মিছিল বের হয়। বেলা ১১টায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ চত্বরে ছাত্রদের ডাকা সভা জনসমুদ্রে পরিণত হয়। ঐ মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালায় পাকিস্তান সরকার। আন্দোলনরত ছাত্রদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণে কয়েকজন তরুণ শহীদ হন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলো রফিক, জব্বার, শফিউল, সালাম, বরকতসহ অনেকেই। তাই এ দিনটি শহীদ দিবস হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।
এই হলো ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসের সংক্ষেপে। ভাষার আন্দোলনের এই ইতিহাসের কারিগর ও সৈনিক ছিলেন বাংলাদেশের বাঙালি রাজনীতিক-ছাত্র-জনতা।
এরপর ২২ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের পাশাপাশি ঢাকার বাঙালি জনতা রাজপথে নামে। শহীদদের স্মরণে ২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে গড়ে ওঠে স্মৃতিস্তম্ভ। কিন্তু পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ২৬ ফেব্রুয়ারি স্মৃতিস্তম্ভটি ভেঙে ফেলে।
অবশ্য দুই বছর পরই ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করলে ৭ মে অনুষ্ঠিত গণপরিষদের অধিবেশনে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। ১৯৮৭ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে ‘বাংলা ভাষা প্রচলন বিল’ পাশ হয়। যা কার্যকর হয় ৮ মার্চ ১৯৮৭ সাল থেকে।
এছাড়াও বিশ্ববাসীর কাছে এই ইতিহাসকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মোড়কে চিরজীবী করে রাখার লক্ষ্যে যারা উদ্যোগ নিয়েছিলেন তারাও ছিলেন বাংলাদেশেরই প্রবাসী বাঙালি। তারা হলেন কানাডার ভ্যাঙ্কুভার শহরে বসবাসরত দুই বাঙালি রফিকুল ইসলাম এবং আব্দুস সালাম। তাদের উদ্যোগের জন্যই আজকে আমাদের ভাষার জন্য ত্যাগের ইতিহাস বিশ্ববাসী জানে এবং আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালন করে।
পৃথিবীর সর্ববৃহৎ মুক্তকোষ থেকে জানা কিছু তথ্য- ১৯৯৮ সালে জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনানের কাছে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণার আবেদন জানিয়েছিলেন ভ্যাঙ্কুভার শহরে বসবাসরত দুই বাঙালি। সে সময় সেক্রেটারী জেনারেলের প্রধান তথ্য কর্মচারী হিসেবে কর্মরত হাসান ফেরদৌসের নজরে এ চিঠিটি আসে।
হাসান ফেরদৌস ঐ বছরেই ২০ শে জানুয়ারী রফিককে অনুরোধ করেন তিনি যেন জাতিসংঘের অন্য কোন সদস্য রাষ্ট্রের কারো কাছ থেকে একই ধরনের প্রস্তাব আনার ব্যবস্থা করেন। পরে রফিক, আব্দুস সালামকে সাথে নিয়ে “মাদার ল্যাংগুয়েজ লাভার্স অফ দ্যা ওয়ার্ল্ড” নামে একটি সংগঠন দাঁড় করান। এতে একজন ইংরেজিভাষী, একজন জার্মানভাষী, একজন ক্যান্টোনিজভাষী, একজন কাচ্চিভাষী সদস্য ছিলেন। তারা আবারো কফি আনানকে “এ গ্রুপ অব মাদার ল্যাংগুয়েজ অফ দ্যা ওয়ার্ল্ড”-এর পক্ষ থেকে একটি চিঠি লেখেন, এবং চিঠির একটি কপি ইউএনওর কানাডীয় দূত ডেভিড ফাওলারের কাছেও প্রেরণ করা হয়।
১৯৯৯ সালে জোশেফ ও ইউনেস্কোর আনা মারিয়ার সাথে দেখা করেন তারা। আনা মারিয়া পরামর্শ দেন আনা মারিয়া পরামর্শ দেন কানাডা, ভারত, হাঙ্গেরি, ফিনল্যান্ড এবং বাংলাদেশ দ্বারা আনীত হতে হবে। তারপর বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রস্তাবের পক্ষে সমর্থন দানে ২৯টি দেশ অনুরোধ জানাতে কাজ করেন। এরপর একই বছরের ১৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত ইউনেস্কোর প্যারিস অধিবেশনে প্রস্তাব উত্থাপন করা হয় ও এতে ১৮৮টি দেশ সমর্থন জানালে একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এরপর ২০১০ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৬৫তম অধিবেশনে একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস পালনের প্রস্তাবটি সাধারণ পরিষদের ৬৫তম অধিবেশনে উত্থাপন করে বাংলাদেশ। মে মাসে ১১৩ সদস্যবিশিষ্ট জাতিসংঘের তথ্যবিষয়ক কমিটিতে প্রস্তাবটি সর্বসম্মতভাবে পাস হয়। এরপর বিশ্বজুড়ে নতুন করে জায়গা তৈরি করে নেয় বাংলা ভাষা।
যে ভাষার জন্য এতকিছু আজ এই ভাষার স্থান কোথায়? নাকি সল্প সময় আমাদের ভাষাপ্রীতি থাকে? নাকি যান্ত্রিকতার ভিড়ে মানুষে পরিবর্তন দেখা দিচ্ছে? নাকি ভাষা আন্দোলনের অমর রক্তচিহ্ন মানুষ শুধু ফেব্রুয়ারি মাস আর মুখেই ধারণ করে?
রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ দাশের মতো লেখক সৃষ্টি হয়েছে বাংলা ভাষায়ই। অন্য ভাষা শেখায় কোনো দোষ নেই। কিন্তু প্রযুক্তিনির্ভর একবিংশ শতাব্দীতে বাংলা ভাষার প্রতি চরম উদাসীন তরুণ প্রজন্মও। ফেব্রুয়ারি আসলেই হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্যমণ্ডিত বাংলাভাষার প্রতি যেন ‘প্রেম উৎলে উঠে’। শহিদ মিনার হয়ে যায় মসজিদ-মন্দিরের চেয়েও পরিস্কার। শহীদ মিনারে গিয়ে কেউ-কেউ-বা কণ্ঠস্বর ভারী আবেগী করার মিথ্যে চেষ্টাও করেন। সারাবছর হাফপ্যান্ট পড়া লোকটিও বাজার ঘুরে একটি সাদাকালো পাঞ্জাবী দাম দিয়ে কিনে আনেন। কিন্তু জানেন না ভাষার ইতিহাস। এমনকি কয়েকজন ভাষা শহিদের নাম বলতে ঘাম ঝরিয়ে নাস্তানাবুদ হয়ে যান। অনেকেই তো সঠিক সালই বলতে পারেন না।
মানুষ পরিবর্তনশীল। এটাই স্বাভাবিক বিষয়। মাস যায় বছর যায় মানুষের মধ্যে পরিবর্তন আসে। এ বছরও বিদায় নিয়েছে মহান একুশে ফেব্রুয়ারি। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টাবে নতুন মাস। ফের নতুন বিষয়। নতুন আলোচনা। এভাবেই সময় কাটতে থাকে। এটাই নিয়ম। কিন্তু এর ভিড়ে আমাদের নাড়ির টান ভুলে গেলে চলবে না। ফেব্রুয়ারির সাথে সাথে ভাষা আর ভাষার মাস ভুলে গেলে চলবে না। কারণ ফেব্রুয়ারি শুধু একটি মাস নয়। এটি ভাষা আন্দোলনের অমর রক্তচিহ্ন। বাঙালি হিসেবে কিছু জিনিস অন্তর থেকে মেনে চললে আর শ্রদ্ধা-ভালোবাসা থাকলে ভাষা শহীদদের প্রতি আমাদের ঋণ না কমলেও তাদের বিদেহী আত্মা হয়ত কিছুটা হলেও শান্তি পাবে।

