বিতর্ক নাসিরের নাকি নাসির বিতর্কের পিছে ছুটে?
প্রতিক্রিয়া | উত্তরদক্ষিণ
রবিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ | আপডেট: ০০:০১
মশিউর রহমান-
বিতর্ক যেন বাংলাদেশের ‘ব্যাড বয়’ খ্যাত ক্রিকেটার নাসির হোসেনের পিছু ছাড়ছেই না! সেই উজ্জ্বল সম্ভাবনা নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয় দলে সুযোগ পাওয়া। তারপর একের পর এক বিতর্কে জড়িয়ে পড়া যেন নাসিরের নিত্য-নৈমিত্যিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কাকতালীয়ভাবে হোক আর মিডিয়ার মারফতেই হোক তা যেন আলোচনায় উঠে আসে। এছাড়াও নারী ক্যালেঙ্কারি, দুর্ব্যবহারই হোক আর দলের নিয়ম ভাঙা সবকিছুতেই যেন বাংলার এই অপার সম্ভাবনাময় ক্রিকেটারের নাম জড়িয়েই যায়।
২০১০ সালে এশিয়ান গেমসের দলে ঠাই হয় বাংলার এই টাইগারের। এরপর ২০১১ সালে বাংলাদেশ দলে সুযোগ পেয়ে রাতারাতি তারকা বনে যান এই খেলোয়াড়। এরপর নিজের প্রতিভা দিয়ে বেশ কিছু সময় দেশকে অনেক জয় উপহার দিয়েছেন। পাশাপশি নিজের ক্যারিয়ার করেছেন সমৃদ্ধ। কিন্তু খুব একটা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারেননি জাতীয় দলে। নানা সময় খেলার পাশাপাশি বিভিন্ন কর্মকাণ্ড দিয়ে আলোচিত-সমালোচিত হয়েছেন। এমনকি স্বয়ং বিসিবি (বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড) সভাপতির সঙ্গে তার বিরোধের গুঞ্জনও শোনা গেছে সোশ্যাল মিডিয়া ও গণমাধ্যম মারফতে। সাম্প্রতিক সময়ে বিয়ে করে ফের লাইমলাইটে বাংলার এই ক্রিকেটার।
অভিযোগ উঠেছে, ডিভোর্স ছাড়াই বিবাহিত এক নারীকে বিয়ে করেছেন তিনি। আর অভিযোগ তুলেছেন ঐ নারীর স্বামী দাবি করা রাকিব হাসান নামের এক যুবক। আর এই নিয়েই বিতর্কে বাংলাদেশের এই তারকা। জীবনের প্রথম বিয়ে করেও সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্নের শিকারও হচ্ছেন এই ক্রিকেটার। জন্ম হয়েছে এক বিশাল বিতর্কের। যা গড়িয়েছে আদালত পর্যন্ত। এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা! জানা যাবে সত্যিটা কি?
তবুও কিছু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে দেশের একজন ক্রিকেট আইকন হিসেবে সবসময় কেনই তাকে বিতর্কের মধ্যে দেখা যায়? একের পর এক বিতর্কের জন্মের কারণে আপন মনেই প্রশ্ন চলে আসে, বিতর্ক নাসিরের নাকি নাসির বিতর্কের পিছে ছুটে?
একটি কথা বলে নেওয়া ভাল, নাসিরের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আমার কোন মাথাব্যাথা নেই। কিন্তু নাসির যেহেতু বাংলাদেশের লাখো তরুণের জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব সেহেতু সমাজে এর প্রভাব পড়েই যা নিয়েই মূলত সমস্যার জন্ম। বিদেশে ‘ক্যাসিনো ক্যালেঙ্কারি’ থেকে সুবাহকাণ্ড। মাঝে আরও কতকিছু। কিন্তু সবকিছুকে ছাড়িয়ে গেছে যেন নাছিরের বিয়ে বিতর্ক। আর নাসিরের প্রাক্তন প্রেমিকা সুবাহর বর্তমান ‘লাইভকাণ্ড’ নিয়ে আর নাই বললাম। তাদের এসব কাণ্ড কি শুধুই লাইমলাইটে থাকার জন্য? নাকি সময় আর কাল তাদের এসব বিতর্কে জড়িয়ে দিচ্ছে?
নিঃসন্দেহে দেশের আইন মেনে এবং মুসলমান হিসেবে ইসলামি শরিয়াহ মেনে বিয়ে করেছেন নাসির। যা পুরো দেশবাসীই দেখেছে। স্ত্রী তামিমা তাম্মি পেশায় একজন কেবিন ক্রু, একটি বিদেশি এয়ারলাইন্সে কাজ করেন। কিন্তু এতে সাধ বাঁধল রাকিব হাসান নামের এক যুবক। নিজেকে তাম্মির স্বামী দাবি করেন রাকিব গণমাধ্যমে বলেন, নাসিরের স্ত্রী তামিমা তাম্মি তাকে ডিভোর্স না দিয়েই বিয়ে করেছেন। পাশাপাশি কোন সিদ্ধান্ত ছাড়ায় একটি শিশু মেয়েকে রেখে এসেছেন। ২০১১ সালে বিয়ের পর আট বছরের একটি মেয়েও রয়েছে। এর মধ্যে তাম্মি আরেক জায়গায় ৬ মাস সংসার করে স্বামী রাকিবের কাছে ক্ষমা চেয়ে পার পেয়ে যান। এছাড়াও নাসিরের সঙ্গে তিনি বিয়ের বিষয়টিও জানতেন না। চলতি বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি তামিমা ও নাসিরের বিয়ের ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে সেখান থেকেই বিষয়টি জানতে পারেন। পরে বিভিন্ন সূত্রে বিয়ের পুরো খবর জানতে পারেন।
ইতিমধ্যেই এ ঘটনা আদালত ও প্রশাসন পর্যন্ত গড়িয়েছে। দেশের চলমান আইন অনুযায়ী বিবাহবিচ্ছেদ ছাড়াই একজনের স্ত্রীকে বিয়ে করার অভিযোগে ঢাকার সিএমএম আদালতে নাসির হোসেন ও তার স্ত্রী তামিমা সুলতানার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে। অন্যের স্ত্রীকে প্রলুব্ধ করে নিয়ে যাওয়ায় মানহানি এবং ব্যাভিচারের অভিযোগ করা হয়েছে নাসির দম্পতির বিরুদ্ধে। এছাড়া আগের বিয়ে চলমান থাকা অবস্থায় অন্যত্র বিয়ের অভিযোগ আনা হয়েছে নাসিরপত্নির বিরুদ্ধে। এর আগে থানায় একটি জিডি করেছিলেন রাকিব হাসান। ইতিমধ্যে বিষয়টি তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন পিবিআইকে নির্দেশ দিয়েছে আদালত। ৩০ মার্চের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদনও দিতে বলেছেন আদালত।
এখন এই রাকিব সাহেব কতটুকু সত্য বা মিথ্যা বলছেন? প্রথম দিক থেকে নাসির দম্পতির বক্তব্য না পাওয়া গেলেও মামলা হওয়ার দিনই বিষয়টি নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন এই দম্পতি। দাবি করেছেন উল্টো কথা। তবে মামলার ব্যাপারে কিছু জানেন না বলে দাবি করেন নাসির হোসেন।
রাজধানীর একটি হোটেলে উপস্থিত হয়ে স্বামী-স্ত্রী দুইজনেই দাবি করেন, তামিমা সুলতানার প্রথম স্বামী রাকিব হাসান মিথ্যা বলছেন। তবে আগে বিয়ে ও ৮ বছরের মেয়ের কথা স্বীকার করেন দুইজনেই। নাসির গণমাধ্যমকে বলেন, তামিমার বিবাহবিচ্ছেদ নিয়ম অনুযায়ী হয়েছে, এবং তামিমার বিয়ে ও সন্তান সম্পর্কে সবকিছু জেনেই তিনি বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সংবাদ সম্মেলনে তালাকের একটি কপি সাংবাদিকদের দেখান তারা। এমনকি তামিমার প্রথম স্বামী রাকিব হাসানের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা করার কথাও বলেছেন নাসির হোসেন। বর্তমান বিষয়টি নিয়ে তাদের দুইজনের পরিবারকে ভুগতে হচ্ছে বলে জানিয়ে নাসির অনেকটা কড়া গলায় বলেছিলেন, গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তামিমাকে নিয়ে ভুল এবং ‘উল্টাপাল্টা’ কিছু প্রচার করা হলে ‘আইনগত ব্যবস্থা’ নেয়া হবে। রাকিব মামলা করলে আইনগতভাবে বিষয়টি মোকাবেলা করবেন বলেও জানান তিনি।
এইটা নিঃসন্দেহে স্ত্রীর প্রতি স্বামীর ভালোবাসা এবং তাকে আগলে রাখারই বহিঃপ্রকাশ। নাসিরের বিষয়টির আমি প্রশংসা করি। কারণ স্বামী হিসেবে নাসির তার কর্তব্যই পালন করেছে। আর অতীতের বিয়ের কথা স্বীকার করেন নাসিরপত্নী তাম্মি। তিনি বলেন, ২০১৭ সালে আগের স্বামী রাকিব হাসানের সঙ্গে বিবাহবিচ্ছেদ হয় তার। তাদের একমাত্র কন্যাও ২০১৯ সাল পর্যন্ত তার কাছেই ছিল। এরপর শিশুটিকে নিজেদের বাসায় নিয়ে যায় রাকিব হাসানের পরিবার।
আধা ঘণ্টা ধরে চলা সংবাদ সম্মেলনে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন নাসির দম্পতি। ৮ বছরের মেয়ের কথা ছাড়া রাকিব হাসান যা যা বলছেন তা সবই মিথ্যা বলেও উল্লেখ করেন তারা।
ক্রিকেটার নাসিরের ব্যক্তিগত জীবন বা নতুন দম্পতির প্রেম কাহিনী নিয়ে আমার কোন আগ্রহ নেই। শুধু পাল্টাপাল্টি অভিযোগের প্রসঙ্গটা তুলে বিতর্কের বিষয়টা সামনে নিয়ে আসা আর আমাদের সমাজের একটা দিক তুলে ধরাই প্রধান উদ্দেশ্য। নাসির ছাড়াও বাংলাদেশ দলের অনেক খেলোয়াড় নিয়ে বিতর্কের শেষ ছিল না। তাদের নাম উল্লেখ না করেই একটা কথা বলি, হঠাৎ পাওয়া খ্যাতিতে খেলোয়াড়রা সাময়িক সময়ের জন্য নিজেদের ধরে রাখতে না পারলেও সময়ের সাথে অনেক খেলোয়াড় নিজেদের পরিণত করে গড়ে তুলেছেন। বিয়ে করে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে অনেক ক্রিকেটার সুন্দর সংসার করছেন। বিতর্কের জন্য তো তাদেরকে গণমাধ্যমের হেডলাইন হতে হয় না। কেনই নাসিরের ক্ষেত্রে ঘটল উল্টো ঘটনা?
কে সত্যি বলছেন রাকিব নাকি নাসির দম্পতি? নাকি রাকিব হোসেন এই ইস্যুটাকে ব্যবহার করে আলোচনায় থাকতে চাচ্ছেন? নাকি সত্যিই এমন কাণ্ড ঘটিয়েছেন নাসির দম্পতি?
যদি রাকিব হাসানের অভিযোগ সত্য হয় তাহলে- তাম্মি নাসিরের বিয়ে ধর্মীয় এবং রাষ্ট্রীয় আইন অনুযায়ী সম্পূর্ণ অবৈধ। আর একজন পাবলিক ফিগার হিসেবে নাসিরের কাছ থেকে এমন কাজ কখনোই কাম্য নয়। বুঝতে হবে অন্যের বউকে ডির্ভোস ছাড়া বিয়ে করা যায় না, এই বোধটিই বিদায় নিয়েছে। আর এটাও সত্যি সমাজে অসভ্যতা, অসামাজিকতা, বেহায়াপনা দিন দিন বাড়ছে! মোবাইলের একাধিক সিমের মতো একাধিক সম্পর্কের সংখ্যার পরিমাণও বৃদ্ধি পাচ্ছে। যদি নাসির ও তামিমার বিরুদ্ধে অপরাধ প্রমাণিত হয় তাহলে সাত বছরের করাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের সাজার সুযোগ রয়েছে। আর যদি রাকিব হাসান মিথ্যা বলে থাকেন তাহলে তারও শাস্তি হওয়া উচিত। ব্যক্তিস্বার্থ উদ্ধারের জন্য এমন জঘন্য ও ছোটমনের কাজ সমাজে কারও কাছ থেকে কাম্য নয়। যেহেতু বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা।

