টিকাপ্রাপ্তিতেও বাংলাদেশের বড় জয়
সম্পাদকীয় | উত্তরদক্ষিণ
মুদ্রিত সংস্করণ | রবিবার, ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ | আপডেট: ০০:০১
দেশে করোনা মহামারি শুরুর আগে থেকেই তা মোকাবেলা করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা এবং সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দফতর নানাবিধ প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং তা বাস্তবায়নে তৎপর ছিল। সেইসাথে বিশ্বব্যাপী যেসব দেশ কিংবা প্রতিষ্ঠান ভ্যাকসিন আবিষ্কার নিয়ে গবেষণা শুরু করে সেগুলোর প্রতিটির ব্যাপারেই নিয়মিত হালনাগাদ তথ্য সংগ্রহ করার কাজ চলে। কোভিডের সম্ভাব্য ভ্যাকসিন প্রাপ্তির বিষয়েও কার্যক্রম শুরু করে সরকার। লক্ষ্য ছিল একটাই, দ্রুততম সময়ে বাংলাদেশের জন্য সর্বোচ্চ উপযোগী ও কার্যকর কোভিড ভ্যাকসিন প্রাপ্তি নিশ্চিত করা। আর এই কাজে সরকার যে শতভাগ সফল তার প্রমাণ হলো আমাদের হাতে ইতিমধ্যেই ভ্যাকসিন এসে পৌঁছেছে এবং ভবিষ্যতে প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিনের সংস্থানও নিশ্চিত হয়েছে।
বাংলাদেশে গণটিকাদান কর্মসূচী শুরু হয়েছে ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে। সেনাবাহিনী প্রধান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রীসহ দেশের অনেক মন্ত্রীও ইতোমধ্যে ইন্ডিয়া থেকে আনা কোভিশিল্ড টিকা গ্রহণ করেছেন। বাংলাদেশ টিকা সংগ্রহ করতে পারলেও পৃথিবীর অনেক দেশই এখনো টিকা সংগ্রহ করতে পারেনি। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস গত ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে বলেছেন- এখন পর্যন্ত মোট ভ্যাকসিনের ৭৫ শতাংশ মাত্র ধনী ১০টি দেশের দখলে। এটাকে তিনি ‘চরম অসম ও অন্যায্য’ হিসাবে উল্লেখ করেছেন। জাতিসংঘ মহাসচিবের এ বক্তব্যই প্রমাণ করে, টিকা গ্রহণের প্রশ্নে বিশ্ব কীভাবে বিভক্ত হয়ে আছে।
এদিকে ‘ভ্যাকসিন কুটনীতি’ নিয়ে সক্রিয় হয়েছে দুটি বড় দেশ চীন ও রাশিয়া। যখন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২২ সালের আগে বিশ্বের চারভাগের এক ভাগ মানুষের করোনা টিকা পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। চীন ইতোমধ্যে ঘোষণা করেছে, তারা গরিব দেশগুলোকে স্বল্প সুদে ঋণ দেবে; যাতে করে গরিব দেশগুলো করোনা টিকা কিনতে পারে। পশ্চিমা বিশ্ব যেখানে ‘ভ্যাকসিন জাতীয়তাবাদের’ জন্ম দিয়ে নিজ দেশের জনগণকে আগে টিকা দেওয়া শুরু করেছে, সেখানে চীন কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিনামূল্যে; কোথাও স্বল্প সুদে ঋণ দিয়ে গরিব দেশগুলোকে ভ্যাকসিন কেনার সুযোগ করে দিয়েছে। সারা বিশ্ব যখন কোভিড-১৯ নিয়ে উত্কণ্ঠিত এবং করোনাভাইরাসের নতুন একটি ধরন যখন নতুন করে বিশ্বকে আঘাত করেছে; টিকার বিশ্বায়ন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ভ্যাকসিনের বিশ্বায়ন প্রশ্নে গরিব দেশগুলোর জন্য কোনো সুখবর নেই। বস্তুত বিশ্বায়ন গরিব দেশগুলোর ভ্যাকসিনপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে পারেনি। ‘মাই ন্যাশনস ফাস্ট’-এর ধারণা ভ্যাকসিনপ্রাপ্তিতে গরিব দেশগুলোকে অনেক পেছনে ফেলে দিয়েছে। এই অবস্থার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের মানুষ ভ্যাকসিন পাচ্ছে, পেয়েছে, এর চেয়ে বড় সাফল্য আর কী হতে পারে! আর এটি সম্ভব হয়েছে আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী সিদ্ধান্তের কারণেই। সরকার যদি আগেভাগেই এই চুক্তি না করতো তাহলে কোনোভাবেই এত দ্রুত সময়ে ভ্যাকসিন আমাদের হাতে এসে পৌঁছাত না তা বোঝাই যাচ্ছে।
বাংলাদেশে এখন রীতিমতো ভ্যাকসিন উত্সব চলছে। সরকারের সঠিক পদক্ষেপে একটি সফল ও ব্যতিক্রমী ভ্যাকসিন উত্সবে মুখরিত পুরো দেশ। প্রথম দিকে জনমনে একটু সংশয় থাকলেও বর্তমানে ভ্যাকসিন কেন্দ্রে ভিড় প্রমাণ করে এখন আর সংশয় নেই।
টিকা দেশে আসার আগে, এমনকি টিকাদান শুরুর পরেও এই টিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল বিভিন্ন মহল, চেষ্টা করেছিল বিভিন্ন গুজবও ছড়াতে, কিন্তু তাতে তারা ব্যার্থ হয়েছে। জনগণের স্বতস্ফুর্তভাবে টিকাগ্রহণের দৃশ্যই প্রমাণ করে অপচেষ্টাকারীদের সব চেষ্টা ব্যার্থ হয়েছে। আবার টিকা সম্পর্কে বিরুপ মন্তব্যকারীদের অনেককে সেই টিকা গ্রহণও করতে দেখা যাচ্ছে।
এখন কথা হলো- যেহেতু খুব দ্রুত এ মহামারিটি বিশ্ব থেকে নির্মূল করা সম্ভব হবে না। সুতরাং ভ্যাকসিন প্রাপ্তির নিশ্চয়তা, এর সহজলভ্যতা ও ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে ভ্যাকসিনের আওতায় আনাই হবে এ মুহূর্তে অগ্রাধিকার। সেটাই করে যাচ্ছে আমাদের সরকার। দেশের জনগোষ্ঠীর একটি অংশ ইতমধ্যে ভ্যাকসিনেশনের আওতায় চলে এসেছে। বিরুপ মন্তব্যকারীদের মুখে চুনকালি পড়েছে বলতেই হয়।
তবে একটি কথা মাথায় রাখতে হবে- টিকা নেয়া মানেই কিন্তু দায়িত্ব শেষ নয়। টিকা গ্রহণের পর মানবদেহে সেটি কার্যকর হতে বেশ কয়েক দিন লেগে যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন- টিকা নেয়ার পরও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। সুতরাং গুজবে কান না নিয়ে বিশেষজ্ঞদের কথা মেনে চলি, টিকা নেয়ার ব্যাপারে আতঙ্কিত না হই, সেটাই আমার আপনার জন্য মঙ্গলজনক হবে।

