সিরিয়া যুদ্ধ: শিশুসহ বন্দি লাখো মানুষ কোথায়?
উত্তরদক্ষিণ | মঙ্গলবার, ০২ মার্চ, ২০২১ | আপডেট: ১৭:৪০
সিরিয়ায় ১০ বছর ধরে চলা গৃহযুদ্ধের সময় বাছবিচার ছাড়াই বন্দি হওয়া লাখো বেসামরিক লোক এখনও নিখোঁজ রয়েছেন বলে জাতিসংঘের তদন্তকারীরা জানিয়েছেন। আরও কয়েক হাজার ব্যক্তি হয় নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বা নিরাপত্তা হেফাজতে থাকার সময়েই মারা গেছেন।

দেশটির গৃহযুদ্ধকালীন যুদ্ধাপরাধ বা মানবতাবিরোধী অপরাধ বিষয়ে নতুন এক রিপোর্টে এসব তথ্য দেয়া হয়েছে। নির্যাতিত ও প্রত্যক্ষদর্শীরা ‘অকল্পনীয় দুর্ভোগের’ বর্ণনা দিয়েছেন, এসবের মধ্যে ১১ বছর বয়সী পর্যন্ত বালক ও বালিকাদের ধর্ষণের মতো ঘটনাও আছে। এসব ঘটনা ‘জাতীয় মানসিক আঘাত’ হয়ে আছে এবং এগুলোকে অবশ্যই চিহ্নিত করতে হবে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জানিয়েছে বিবিসি।
সিরিয়া-তুরস্ক সীমান্তের আতমেহ শরণার্থী শিবিরে বাবা-মাবিহীন কিছু শিশু। ছবি: ডয়ছে ভেলে
সিরিয়া-তুরস্ক সীমান্তের আতমেহ শরণার্থী শিবিরে বাবা-মাবিহীন কিছু শিশু ছবি: রয়টার্স
মার্চ, ২০১১ এ সরকারবিরোধী শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দমাতে প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের সরকার মারাত্মক শক্তি প্রয়োগ করলে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়, তাতে সিরিয়া বিধ্বস্ত হয়ে যায়। এই লড়াইয়ে অন্তত তিন লাখ ৮০ হাজার লোকের মৃত্যু হয় এবং দেশটির জনসংখ্যার অর্ধেক বাড়ি ছেড়ে পালতে বাধ্য হয়, এদের মধ্যে প্রায় ৬০ লাখ বিদেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় নেন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের সিরিয়া সংক্রান্ত তদন্তের জন্য গঠিত ‘স্বাধীন আন্তর্জাতিক কমিশন’ শতাধিক কারাগারের চালানো তদন্ত ও ২৬৫০ জনেরও বেশি লোকের সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। এতে যুদ্ধে জড়িত প্রায় সবগুলো বড় দলের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নথিবদ্ধ করা হয়েছে। সম্ভাব্য বিরোধীদের ভয় দেখাতে ও শাস্তি দেওয়ার অভিপ্রায় থেকে এমন ঘটনাগুলো ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

স্বীকারোক্তি আদায় ও অন্যান্য উদ্দেশ্য পূরণে বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে ভয়াবহ নির্যাতন চালানো হয়েছে এসব বন্দির ওপর। কোনো বিচার ছাড়াই বন্দিদের মেরে ফেলা হয়েছে অথবা যে ধরনের বিচারে বন্দিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে সেগুলো পক্ষপাতদুষ্ট ছিল বলে কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। আটক অবস্থায় কতোজন বন্দি মারা গেছেন তার সঠিক সংখ্যা অজ্ঞাতই রয়ে গেছে। তবে প্রতিবেদনের রক্ষণশীল হিসাবগুলো বলছে, সরকারি হেফাজতে লাখো মানুষ নিহত হয়েছেন। সিরিয়ার সরকার ও জঙ্গি গোষ্ঠী হায়াত তাহরির আল শাম বন্দিদের নির্যাতন করার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
অনেক সূত্রগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী নিহতদের বিভিন্ন গণকবরে দাফন করা হয়েছে, যার দুটি অন্তত দামেস্কের শহরতলীতেই।
পাওলো পিনহেইরো বলছেন, “পরিবারের লাখ লাখ সদস্যের জানার অধিকার আছে যে, তাদের প্রিয়জনের ভাগ্যে কী ঘটেছে। এটি একটি ন্যাশনাল ট্রমা যার দিকে সব পক্ষ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জরুরিভাবে দৃষ্টি দেয়া উচিত”।

কমিশনের চেয়ারম্যান পাওলো পিনহেরো বলেন, “সরকারি বাহিনীগুলো নির্বিচারে বিরোধী রাজনৈতিক দলের সদস্যদের, সাংবাদিকদের, মানবাধিকার আন্দোলনকারীদের ও বিক্ষোভকারীদের আটক করে, এ থেকেই সংঘাত শুরু হয় এবং এটাই সংঘাত শুরু হওয়ার মূল কারণ।
“সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো ও জাতিসংঘ ঘোষিত সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো যেমন, হায়াত তাহরির আল শাম ও ইসলামিক স্টেটের মতো গোষ্ঠীগুলো লোকজনের স্বাধীনতা হরণ করতে শুরু করে, চরমভাবে তাদের মানবাধিকার লঙ্ঘন করতে শুরু করে যার সঙ্গে সাম্প্রদায়িক মনোভাবও জড়িয়ে ছিল।”

এলাকা পুনরুদ্ধারের পর সিরিয়ান সেনাবাহিনীর উল্লাস
সাবেক বন্দিরা মাসের পর মাস ধরে দিনের আলো না দেখার কথা, অপরিষ্কার পানি পান করার ও বাসী খাবার খেতে বাধ্য হওয়ার কথা জানিয়েছেন। পায়খানাবিহীন অতিরিক্ত বন্দিতে পূর্ণ সেলে তাদের থাকতে হয়েছে এবং কোনো চিকিৎসাও দেওয়া হয়নি।
সংঘটিত অপরাধের জন্য জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সব দেশের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের সিরিয়া বিষয়ক তদন্ত কমিশন।
এদিকে সিরিয়ায় রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে সমর্থন করছে আসাদ সরকারকে। নিজের সেনাবাহিনী থেকে শুরু করে অস্ত্র পর্যন্ত সবই রাশিয়া দিয়েছে আসাদের সমর্থনে। এমন কী জাতিসংঘে কূটনৈতিক সমর্থনও নিশ্চিত করেছে সিরিয়ার জন্য।
২০১৫ সালের অক্টোবর থেকে রাশিয়া দেশটিতে সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। তারা ‘সন্ত্রাসীদের’ বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালিয়েছে। তাদের ভাষায় এইসব সন্ত্রাসীরা আইএসের সদস্য। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র বারবার অভিযোগ করেছে, রাশিয়া আইএস দমনের অজুহাতে তাদের সমর্থিত বিদ্রোহীদের ওপর বিমান হামলা করছে। অন্য দিকে রাশিয়াও অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র আইএসের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে এমনভাবে ব্যবহার করছে যেন রাশিয়া ও সিরীয় বাহিনীর অগ্রযাত্রা ব্যহত হয়।
রাশিয়ার ইচ্ছা আসাদকে ক্ষমতায় রাখা। কারণ আসাদ মধ্যপ্রাচ্যে রাশিয়ার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র। সিরিয়ায় রাশিয়ার একটি বিমান ঘাঁটি ও একটি নৌঘাঁটি রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে নিজের সামরিক শক্তি অটুট রাখতে রাখতে রাশিয়া তাই আসাদকেই চায়। শান্তি আলোচনায় রাশিয়া হয়তো সিরিয়ার অন্যান্য গোষ্ঠীগুলোর জন্য সীমিত মাত্রায় স্বায়ত্তশাসন অনুমোদন করতে পারে, তবে সেটা আসাদকে ক্ষমতায় রেখেই হতে হবে।

রাশিয়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বি ইরানও সমর্থন করে আসাদকে। ২০১২ সাল থেকে তেহরান আসাদ সরকারকে বিশাল পরিমাণে সামরিক সাহায্য ও গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে আসছে। ইরান সিরিয়াতে তার সেনাবাহিনীর পাশাপাশি শিয়া মিলিশিয়াদেরও মোতায়েন করেছে। তাছাড়া ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহও আসাদ সরকারের একনিষ্ঠ সমর্থক। ইরান আসাদবিরোধীদের পাশাপাশি আইএসের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করছে।
ইরানের আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী সৌদি আরব ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সিরিয়া সবসময় ইরানের পাশে থেকেছে। তাছাড়া লেবাননে হিজবুল্লাহকে অস্ত্র পাঠাতে সিরিয়া দিয়ে যেতে হয় ইরানকে। তাই আসাদকে ক্ষমতায় রাখতে চায় ইরান। লেবাননের হিজবুল্লাহও ইরানের মতো ইসরায়েলবিরোধী।
সিরিয়া যুদ্ধের শুরু থেকেই তুরস্ক আসাদবিরোধীদের সমর্থন করছে। কুর্দি ব্যতীত অন্যান্য সরকারবিরোধী শক্তি যেমন ‘ফ্রি সিরিয়ান আর্মির’ সঙ্গে তারা আসাদবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ জোটের অংশ তুরস্ক আইএসের অবস্থানের ওপর যেমন হামলা করেছে তেমনি একতরফাভাবে কুর্দিদের অবস্থানের ওপরও হামলা করেছে। অপারেশন ‘ইউফ্রেটাস শিল্ডের’ নামে চলা অভিযানে তারা পদাতিক সেনাও পাঠিয়েছিল সিরিয়ায়।

সিরিয়া যুদ্ধে তুরস্কের মূল লক্ষ্য কুর্দিদের অগ্রযাত্রা ব্যহত করা। তুরস্ক চায় না কুর্দিরা নতুন এলাকার নিয়ন্ত্রণ পাক। তাছাড়া যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তারা যেন কোন রকম স্বায়ত্তশাসনের সুযোগ না পায় সেদিকেও নজর রয়েছে তুরস্কের। তাদের দাবি, সিরিয়ার কুর্দিরা পিকেকের কুর্দিদের সঙ্গে যুক্ত। পিকেকে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে স্বাধীনতার জন্য তুরস্ক সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রাম করছে। দেশটিতে পিকেকে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী হিসেবে আখ্যায়িত করে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এবার আইএসের যোদ্ধারা যুদ্ধের বদলে নাশকতা করা শুরু করবে। কারণ তাদের আর যুদ্ধ করার মতো সক্ষমতা নেই।
কুর্দিরা আইএসকে বিতাড়িত করলেও, বেশিরভাগ আরব অঞ্চলের শাসনক্ষমতা তাদের হাতে যাবে না। এতে এই অঞ্চলগুলোতে নেতৃত্বের সংকট দেখা দেবে যা ভবিষ্যতে নতুন সংঘাতের উপলক্ষ্য হয়ে উঠবে। কারণ সিরিয়া যুদ্ধের ভেতরেই কুর্দিরা তুরস্ক সীমান্তে একটি নতুন ‘দেশ’ প্রতিষ্ঠা করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় কুর্দি অধ্যুষিত ছিটমহল আফরিনে আক্রমণ করেছে তুরস্ক। তুর্কিদের দাবি, তারা সন্ত্রাসীদের মূলোৎপাটন করতে আফরিন আক্রমণ করেছে।

উত্তর সিরিয়ার এলাকাগুলোতে কুর্দি নিয়ন্ত্রণ থাকায় সমাধানের আশা খুব কম। কারণ আসাদ দীর্ঘমেয়াদে কুর্দিদের প্রভাব বরদাশত করবেন না।
অন্যদিকে তুরস্ককে যুক্তরাষ্ট্র সাহায্য করছে আইএস দমনের জন্য। কিন্তু তুরস্ক ভাবছে সেই সমর্থনকে ব্যবহার করে এবার তারা কুর্দিদের পর্যদুস্ত করবে। সমস্যা হচ্ছে, কুর্দিরাও যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত। ফলে এখন যারা মিত্র ভবিষ্যতে তারা একে অপরের বিরুদ্ধে সংঘর্ষে লিপ্ত হতে পারে।





