আধুনিক বাংলা সাহিত্যের কারিগড়
উত্তরদক্ষিণ । মঙ্গলবার, ২৮ ডিসেম্বর ২০২১ । আপডেট ১০:৫০
রবীন্দ্র উত্তর আধুনিককালের কবিদের মধ্যে যিনি শব্দচয়নে, জীবনবোধে, শব্দালংকারের নান্দনিকতায়, বর্ণনায় অসামান্য আর ধ্রুপদী, তিনি কবি আল মাহমুদ। যিনি আধুনিক বাংলা কবিতাকে নতুন আঙ্গিকে, চেতনা ও বাকভঙ্গিতে বিশেষভাবে সমৃদ্ধ করেছেন। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সাথে নাম জড়িয়ে হয়েছেন সমালোচিত। জামায়াতের সাথে রাজনৈতিক সম্পৃকতা নিয়েও বিতর্কিত হয়েছিলেন তিনি। যদিও তা বরাবরই অস্বীকার করেছেন কবি। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রধান কবিকে নিয়ে লিখেছেন সাইফুল অনিক।
প্রাথমিক জীবন
কবি আল মাহমুদ ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার মোড়াইল গ্রামের এক ব্যবসায়ী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। প্রকৃত নাম মীর আবদুস শুকুর আল মাহমুদ। তার পিতার নাম মীর আবদুর রব এবং মাতার নাম রওশন আরা মীর। বেড়ে উঠেছেন নিজ জন্মভূমি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। কুমিল্লার দাউদকান্দি থানার সাধনা হাইস্কুল এবং পরে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডু হাইস্কুলের পড়াশোনা করেন। মূলত এই সময় থেকেই তার লেখালেখির শুরু। তিনি মধ্যযুগীয় প্রণয়োপাখ্যান, বৈষ্ণব পদাবলি, রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল প্রমুখের সাহিত্য পাঠ করে ঢাকায় আসার পর কাব্য সাধনা শুরু করেন এবং ষাট দশকেই স্বীকৃতি ও পাঠকপ্রিয়তা লাভ করেন।
সাংবাদিকতা, সাহিত্য রচনা ও যাপিত জীবন
মাত্র ১৮ বছর বয়স ১৯৫৪ সালে সংবাদপত্রে লেখালেখির সূত্র ধরে কবি ঢাকা আসেন এবং পত্রিকায় কাজ নেন। তখনই সাহিত্যে পুরোদমে মনযোগী হন। ঢাকা থেকে প্রকাশিত সিকান্দার আবু জাফর সম্পাদিত সমকাল পত্রিকা এবং কলকাতার নতুন সাহিত্য, চতুষ্কোণ, ময়ূখ ও কৃত্তিবাস ও বুদ্ধদেব বসু সম্পাদিত বিখ্যাত ‘কবিতা’ পত্রিকায় লেখালেখির সুবাদে ঢাকা-কলকাতার পাঠকদের কাছে তার নাম সুপরিচিত হয়ে ওঠে এবং তাকে নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত হয়।
সমকালীন বাংলা সাপ্তাহিক পত্র-পত্রিকার মধ্যে কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী সম্পাদিত ও নাজমুল হক প্রকাশিত সাপ্তাহিক কাফেলায় লেখালেখি শুরু করেন। পাশাপাশি দৈনিক মিল্লাত পত্রিকায় প্রুফ রিডার হিসেবে সাংবাদিকতা জগতে পদচারণা শুরু করেন। ১৯৫৫ সালে কবি আব্দুর রশীদ ওয়াসেকপুরী কাফেলার চাকরি ছেড়ে দিলে তিনি সেখানে সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন।
আল মাহমুদ শুধু কবি হিসেবেই নয়, তিনি একাধারে একজন কবি, ঔপন্যাসিক, প্রাবন্ধিক, ছোটগল্প লেখক, শিশুসাহিত্যিক, গবেষক, সাংবাদিক ও কলাম লেখক। সাহিত্যের অনেক শাখাতেই তার অবাধ বিচরণ। ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ‘লোক লোকান্তর’ সর্বপ্রথম তাকে স্বনামধন্য কবিদের সারিতে জায়গা করে দেয়। এরপর কালের কলস, সোনালী কাবিন, মায়াবী পর্দা দুলে উঠো কাব্যগ্রন্থগুলো তাকে প্রথম সারির কবি হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত করে। ১৯৭১ সালে তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন, যুদ্ধের পরে দৈনিক ‘গণকণ্ঠ’ নামক পত্রিকায় সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন।
মূলত এই সময় তিনি গল্প লেখার দিকে মনোযোগী হন। ১৯৭৫ সালে তার প্রথম ছোটগল্প গ্রন্থ ‘পানকৌড়ির রক্ত’ প্রকাশিত হয়। ১৯৯৩ সালে বের হয় তার প্রথম উপন্যাস ‘কবি ও কোলাহল’। সেই সময় বঙ্গবন্ধু তাকে শিল্পকলা একাডেমির গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের সহপরিচালক পদে নিয়োগ দেন। দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালনের পর তিনি পরিচালক হন। পরিচালক হিসেবে ১৯৯৩ সালে অবসর নেন।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি পাঁচ ছেলে ও তিন মেয়ের জনক। তার স্ত্রী সৈয়দা নাদিরা বেগম।
উল্লেখযোগ্য রচনা
কবি আল মাহমুদের প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা কবিতা, গল্প, উপন্যাসসহ একশ’র মত। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে; কবিতা : লোক লোকান্তর, কালের কলস, সোনালী কাবিন, মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো, প্রহরান্তরের পাশ ফেরা, আরব্য রজনীর রাজহাঁস, মিথ্যেবাদী রাখাল, আমি দূরগামী, বখতিয়ারের ঘোড়া, দ্বিতীয় ভাঙন, নদীর ভেতরে নদী, উড়াল কাব্য, বিরামপুরের যাত্রী, বারুদগন্ধী মানুষের দেশে, তুমি তৃষ্ণা তুমিই পিপাসার জল, অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না, ইত্যাদি।
পানকৌড়ির রক্ত, সৌরভের কাছে পরাজিত, গন্ধবনিক, ময়ূরীর মুখ, নীল নাকফুল, কলংকিনী জ্যোতির্বলয়, গন্ধ বণিক, সৌরভের কাছে পরাজিত, আল মাহমুদের গালগল্প ইত্যাদি ছোট গল্পগ্রন্থ। উপন্যাস : কাবিলের বোন, উপমহাদেশ, চেহারার চতুরঙ্গ, নিশিন্দা নারী, ইত্যাদি। শিশুতোষ : পাখির কাছে ফুলের কাছে। প্রবন্ধ : কবির আত্মবিশ্বাস, কবির সৃজন বেদন, আল মাহমুদের প্রবন্ধ। ভ্রমণ : কবিতার জন্য বহুদূর, কবিতার জন্য সাত সমুদ্র। আত্মজীবনী যেভাবে বেড়ে উঠি।
পুরষ্কার ও সম্মাননা
বাংলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখার জন্য কবি আল মাহমুদ দেশের জাতীয় পদকসহ পেয়েছেন অনেক পুরস্কার। মাত্র দুটি কাব্যগ্রন্থের জন্য ১৯৬৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া পেয়েছেন একুশে পদক, জয়বাংলা পুরস্কার, হুমায়ুন কবির স্মৃতি পুরস্কার, ফররুখ স্মৃতি পুরস্কার, অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার, জীবনানন্দ দাশ স্মৃতি পুরস্কার, সুফী মোতাহের হোসেন সাহিত্য স্বর্ণপদক, ফিলিপস সাহিত্য পুরস্কার, নাসিরউদ্দীন স্বর্ণপদক, সমান্তরাল (ভারত) ভানুসিংহ সম্মাননা পদক, লেখিকা সঙ্ঘ পুরস্কার, হরফ সাহিত্য পুরস্কার, অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার, নতুন গতি পুরস্কার ইত্যাদি।
মৃত্যু
কবি ৮২ বছর বয়সে ১৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ শুক্রবার রাত ১১টা ৫ মিনিটে ধানমন্ডির ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন। বাংলা সাহিত্যে অনবদ্য অনন্য অপার বিরল সৃষ্টি কালজয়ী কাব্য ‘সোনালী কাবিনে’র স্রষ্টা বাংলা ভাষার অন্যতম প্রধান গুরুত্বপূর্ণ প্রতিভাবান ও শক্তিমান কবি এবং এক প্রবাদতুল্য অনিবার্য কিংবদন্তি হিসেবে আল মাহমুদই পরিচিত।
ইউডি/ অনিক

