কৃষি নির্ভরতা থেকে শিল্পায়নে বাংলাদেশ

কৃষি নির্ভরতা থেকে শিল্পায়নে বাংলাদেশ

সিফাত আবদুল্লাহ । মঙ্গলবার, ২৮ ডিসেম্বর ২০২১ । আপডেট ১১:৫৫

কৃষি নির্ভরতা নিয়ে শুন্য থেকে যাত্রা শুরু করেছিল বাংলাদেশ। পরবর্তী ৫০ বছরে কৃষিতে অভুতপুর্ব সাফল্য পেয়েছে বাংলাদেশ। কৃষিতে উৎপাদন বেড়েছে, বেড়েছে প্রযুক্তির ব্যবহার। তারপরও বাংলাদেশ বর্তমানে মূলত কৃষি নির্ভর নয়। বাংলাদেশ এখন রয়েছে শিল্পের উড্ডয়ন পর্যায়ে। ‘কৃষিপ্রধান বাংলাদেশ’ প্রবাদবাক্যটি এখন আর এতটা উচ্চারিত হয় না। বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান খাতে পরিণত হয়েছে শিল্প খাত। এর মধ্যে সবার উপরে তৈরি পোশাক রপ্তানি। পাশাপাশি অর্থনীতির শক্তির অন্যতম উৎস হয়ে দাঁড়িয়েছে রেমিটেন্স। তার সঙ্গে সেবা খাত এগিয়ে গেছে অনেক।

পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ধীর গতিতে কৃষি প্রধান অর্থনীতি থেকে একটি শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির দেশে পরিণত হচ্ছে। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান ছিল ২১. ৮ ভাগ। ২০১২-১৩ অর্থবছরে এসে জিডিপিতে কৃষি খাতের অবদান দাড়ায় ১৮.৭ ভাগ। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের জিডিপিতে সেবাখাতের অবদান ৫৩.৩৯ ভাগ, শিল্প খাতের ৩১.২৮ এবং কৃষি খাতের ১৫.৩৩ ভাগ। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে তিনটি বৃহত্‍ খাতের মধ্যে কৃষির অবদান এখন তৃতীয়।

স্বাধীনতা পরবর্তী বাংলাদেশে ১৯৭২-৭৩ সালে রপ্তানি আয় ছিল মাত্র ৩৪৮.৩৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। যার ৯০ ভাগ তখন আসে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে। আশির দশকে এই ধারার পরিবর্তন শুরু হয়ে, যা এখন আরো দ্রুত হচ্ছে। কৃষির জায়গা দখল করে নিচ্ছে শিল্প এবং সেবা খাত। বর্তমানে বাংলাদেশের বার্ষিক রপ্তানি আয় মিলিয়ন নয়, ৩২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

বিশ্বব্যাংক প্রতিবেদন অনুসারে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের মোট দেশজ জাতীয় উৎপাদনে (জিডিপিতে) কৃষি খাতের অবদান ছিল ৫৯ দশমিক ৪ শতাংশ। আর শিল্পের অবদান ৬ দশমিক ৬ শতাংশ এবং সেবা খাতের ৩৪ শতাংশ। কিন্তু বর্তমানে জিডিপিতে কৃষির অবদান ১৩ দশমিক ৭ শতাংশ, শিল্প ৩৪ দশমিক ৪ এবং সেবা খাতের ৫১ দশমিক ১৯ শতাংশ। বিশ্বব্যাংকের ওই প্রতিবেদন অনুসারে ১৯৭০ সালে অর্থনীতির আকার ছিল মাত্র ৪৫০ কোটি ডলার। বর্তমানে নমিনাল জিডিপির আকার ৩১ হাজার ৪০০ কোটি ডলার।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের এক গবেষণা প্রতিবেদনে জানা গেছে দারিদ্র্য কমাতে অকৃষি খাতের চেয়ে কৃষি খাতের ভূমিকা তিন গুণ বেশি। ব্র্যাকের গবেষণা ও মূল্যায়ন বিভাগের ‘ট্র্যাটেজিক এগ্রিকালচার সেক্টর অ্যান্ড ফুড সিকিউরিটি ডায়াগনস্টিক ফর বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গত কয়েক দশকের দেশের কৃষি খাতের গতি-প্রকৃতি নিয়ে এ গবেষণা করা হয়েছে।

কৃষিনির্ভর অর্থনীতির এই দেশে কৃষির ওপর আরো জোর দেয়ার তাগিদ এসেছে এই প্রতিবেদনের মধ্য দিয়ে। কৃষির বহুমুখীকরণের পাশাপাশি কৃষি জাত শিল্প-কারখানা এবং উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তি নিশ্চয়তা ক্রমে বাজার ক্ষেত্র বিস্তৃতকরণ ও সমভাবে গুরুত্বপূর্ণের বিষয়টিও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কৃষক উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না বিধায় কৃষিক্ষেত্র থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছেন এমন অভিযোগ রয়েছে। এর নিরসন ঘটাতে হবে।

ওই গবেষণা প্রতিবেদনে উপস্থাপিত হয়েছে যে, ১৯৯৯ থেকে ২০১৪ সময়কালে দারিদ্র্যের হার ৪৮ শতাংশ থেকে কমে ২৮ শতাংশে নেমেছে। এ সময় কৃষি ও অকৃষি উভয় ক্ষেত্রেই কর্মী পিছু জিডিপি বেড়েছে। গবেষণায় বহুমাত্রিক রিগ্রেশন মডেল ব্যবহার করে দেখা গেছে, কর্মী পিছু কৃষি জিডিপি এক শতাংশ বাড়লে দারিদ্র্যের প্রকোপ কমে দশমিক ৩৯ শতাংশ আর অকৃষি খাতে এক শতাংম বাড়লে দারিদ্রের প্রকোপ কমে দশমিক ১১ শতাংশ।

জিডিপিতে কৃষির অবদান কমলেও এ খাতে উৎপাদন বেড়েছে। প্রযুক্তি ও আধুনিক পদ্ধতি ব্যবহার করে এ খাতে উৎপাদন বাড়ানো হচ্ছে। প্রতি বছর গড়ে কৃষি খাতের উৎপাদন বাড়ছে ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ হারে। কৃষির উৎপাদন নির্ভর করে আবহাওয়া, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, পণ্যের দাম পাওয়ার ওপর। এ কারণে এ খাতকে অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তির আসনে ধরে রাখা সম্ভব নয়। এ কারণেই শিল্প খাতের দিকে নজর দিয়েছে সরকার। উন্নত দেশগুলোর অর্থনীতিও শিল্প খাতের ওপর নির্ভরশীল। তবে কৃষি উৎপাদনকে কাজে লাগাতে সরকার কৃষিভিত্তিক শিল্প গড়ে তুলছে।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

ইউডি/ অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading