ভেনামি চাষে ঘুরে দাঁড়াবে চিংড়ি শিল্প
গাজী কাইয়ুম । রবিবার, ১৬ জানুয়ারি ২০২২ । আপডেট । সোমবার, ১৭ জানুয়ারি ২০:৩০
চিংড়ি, এটাকে আমরা হোয়াইট গোল্ড বলে থাকি। চিংড়ি রপ্তানি করে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে আসছে। চিংড়ি এনিমালিয়া জগৎ, আর্থোপোডা পর্ব, মালাকস্ত্রাচা শ্রেণীর প্রানি। বাংলাদেশে প্রথম ১৯২৯-৩০ সালে সুন্দরবন অঞ্চলে চিংড়ি চাষের সূচনা হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়।
পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক উপকূলীয় বন্যা প্রতিরোধ ও পানি নিষ্কাশন বাঁধ তৈরীর পূর্বে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট অঞ্চলে নদী সংলগ্ন এলাকার মাটির ঘের দিয়ে বা পাড় বেঁধে তৈরি পুকুরে প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত খাদ্য থেকে চিংড়ি কয়েক মাসের মধ্যে বড় হলে তা সংগ্রহ করে বাজারজাত করা হতো। উপকূলীয় বাঁধ তৈরীর পরপরই দেশের সনাতন চিংড়ি চাষ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়।
সত্তর দশকের পর বিশ্ববাজারে চিংড়ির চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাঁধের অভ্যন্তরে পুনরায় চিংড়ি চাষের সূচনা হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক উৎস থেকে পোনা সংগ্রহ করে ঘেরে লালন-পালন করা হয়। খুলনা, বাগেরহাট, পাইকগাছা ও সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চল ছাড়াও বর্তমানে চট্টগ্রাম বিভাগের কক্সবাজার, মহেষখালী, চকোরিয়া, সুন্দরবন, কুতুবদিয়া ও টেকনাফে চিংড়ি চাষ সম্প্রসারিত হয়েছে।
পানির লবণাক্ততার ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের চিংড়ি চাষকে দুভাগে ভাগ করা হয়। অল্পলোনা পানির চিংড়ি চাষ ও স্বাদুপানির চিংড়ি চাষ।
বাংলাদেশের চিংড়ি চাষ বলতে অল্পলোনা পানির চিংড়ি চাষকেই বোঝায়। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম এলাকায় খুলনা বিভাগের খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা জেলায় এবং দক্ষিণ-পূর্ব এলাকায় চট্টগ্রাম বিভাগের কক্সবাজার জেলায় দেশের প্রায় সব চিংড়ি খামার অবস্থিত। এ দুটি অঞ্চলে বর্তমানে প্রায় ১,৪৫,০০০ হেক্টর জমিতে চিংড়ি চাষ হচ্ছে।
২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৪৭ হাজার ৬৩৫ টন চিংড়ি রপ্তানির বিপরীতে ৫৫ কোটি ডলার আয় হয়। পরবর্তী বছরগুলোতে রপ্তানি কমতে থাকে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৪৪ হাজার ২৭৮ টন চিংড়ির বিপরীতে ৫১ কোটি ডলার, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৪০ হাজার ২৭৬ হাজার টন চিংড়ি থেকে ৪৫ কোটি ডলার, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩৯ হাজার ৭০৬ টন চিংড়ি রপ্তানি করে ৪৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার আয় হয়েছে। সর্বশেষ অর্থবছরে এ খাতের আয় আরও ৪ কোটি ডলার কমে ৪০ কোটি ৪৭ লাখ ডলারে নেমে আসে। ইপিবির সর্বশেষ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, শেষ হওয়া ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এ আয় এ বছর ৪৫ কোটি ডলার। (সূত্রঃ বিএফএফইএ)
চিংড়ি শিল্প দেশের আর্থনীতির চাকা সচল রেখে বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। কিন্তু দেশের অন্যতম রপ্তানিমুখী খাত চিংড়ি শিল্প এখন মহাসংকটে। করোনার ধাক্কা, নানা কারণে উৎপাদন কমে যাওয়া, একইসঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশে উৎপাদিত চিংড়ির চাহিদা কমে যাওয়ায় বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে চিংড়ি রপ্তানি। ফলে বিগত দিনে খাতটি দ্বিতীয় স্থানে থাকলেও বর্তমানে সপ্তম স্থানে নেমে এসেছে। সেই সাথে সাথে হারাচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজার। অসাধু ব্যবসায়ীরা চিংড়ির ভেতরে তারকাঁটা, শ্যাওলা ঢুকিয়ে বাজারজাতের কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার ফলেই দেশের সম্ভাবনাময় খাতটি ধীরে ধীরে পতনের মুখে পড়ে যাচ্ছে।

তবে ভেনামি চাষে ঘুরে দাঁড়াবে চিংড়ি শিল্প। দেশে ভেনামি প্রজাতির চিংড়ি চাষে প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। ২০১৯ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে পরীক্ষামূলক চাষের অনুমোদন দিলেও করোনার কারণে এটি আর শুরু করা যায়নি। তবে ২০২১ সালের এপ্রিল মাসে ব্যাংকক থেকে ১০ লাখ ভেনামির পোনা এনে সাতক্ষীরায় বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটে লোনা পানি কেন্দ্রে ৬টি পুকুরে পরীক্ষামূলক চাষ করা হয়। পরীক্ষামূলক চাষে ফলাফল অনেক ভালো বলে জানান সাতক্ষীরার মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটে কর্মকর্তারা। তারা জানায়, প্রতি হেক্টরে ১০ টন ভেনামি উৎপাদন হয়েছে। যেখানে সনাতন পদ্ধতিতে বাগদা চিংড়ি উৎপাদন হয় ৩৫০ কেজি, সেমি ইন্টেন্সি সিস্টেম (আধুনিক পদ্ধতি) ব্যবহার করে বাগদায় পাওয়া যায় ২-৩ টন, সেখানে ভেনামি চাষ করে পেয়েছি ১০ টন।
তাই এটি আর পরীক্ষামূলক না রেখে যারা ভেনামি চাষ করতে চায় এবং করার সামর্থ্য রাখে তাদেরকে অনুমোদন দেয়ার জন্য সরকারের কাছে আবেদন করেছেন চিংড়ি উৎপাদনকারীরা। ইতিমধ্যেই সরকার ৫ জনকে অনুমোদন দিয়েছে।

