মানবতার গায়ক ভূপেন হাজারিকা

মানবতার গায়ক ভূপেন হাজারিকা

উত্তরদক্ষিণ । বুধবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২২ । আপডেট ১২:৩৫

মানুষের মনে মানবতা জাগিয়ে তোলা, জীবন সম্পর্কে আরেকটু ভাবা আর নমনীয় হওয়ার আবেদন তুলে ধরতেন ভূপেন হাজারিকা। তার অনবদ্য সব গানে তাই প্রেম-ভালোবাসার চেয়ে মানবিক বোধ বেশি স্থান পেয়েছে। ভূপেন হাজারিকা শুধু শিল্পী নন, তিনি প্রতিবাদের সুর, বিদ্রোহের ছন্দ এবং বাংলার শব্দ-লয়ের যোদ্ধা। কীর্তিমান সঙ্গীতজন ভূপেন হাজারিকাকে নিয়ে লিখেছেন সাইফুল অনিক

ভূপেন হাজারিকা একজন স্বনামধন্য কণ্ঠ শিল্পী এবং সঙ্গীত ব্যক্তিত্ব বাংলা, অসমীয়া, হিন্দি ও বিভিন্ন ভাষায় তার এক একটি গান তাকে কিংবদন্তীতুল্য জনপ্রিয়তায় পৌঁছে দিয়েছে সংগীতে তার অবদান খুবই উচ্চস্তরের। তার সঙ্গীতের স্বর ও গানের জন্য তার জনপ্রিয়তা ছিল আন্তর্জাতিক স্তরের ভারত ছাড়াও তার বাংলা গানের জন্য বাংলাদেশে বিশেষভাবে জনপ্রিয় সংগীত শিল্পী ছিলেন, তার গানে বাংলাভাষী, হিন্দিভাষী এবং অসমীয়া শ্রোতা সারা বিশ্ব থেকে তাকে ভালোবাসা দিয়ে গেছেন। ভূপেন শুধু গায়ক ছিলেন না, ছিলেন একজন মহান সমাজসংস্কারকও। ইন্ডিয়ার পূর্বাঞ্চল ও বাংলাদেশকে বিশ্বের কাছে তুলে ধরেছিলেন তিনি।

কীর্তিমানের আগমন
কিংবদন্তিতুল্য ভূপেন হাজারিকা ১৯২৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর ইন্ডিয়ার আসামের সদিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন। একাধারে তিনি ছিলেন গীতিকার, সুরকার, চলচ্চিত্র নির্মাতা, সাংবাদিক ও সাহিত্যিক। তার পিতা নীলকান্ত হাজারিকা আর মা শান্তি প্রিয়া হাজারিকা। ১০ ভাই-বোনের মাঝে তিনি ছিলেন সবার বড়।

পড়াশোনা ও সঙ্গীতে হাতেখড়ি
কিশোর বয়স থেকেই তিনি গান গাইছেন, সুর করছেন, লিখছেন, পড়াশোনায় ভালো, খেলাধুলোয় ভালো। ১৯৪২ সালে গুয়াহাটির কটন কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েটে আর্টস, কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪৪ সালে বিএ এবং ১৯৪৬ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে এমএ পাস করেন ভূপেন হাজারিকা। এরপর ১৯৫২ সালে নিউইয়র্কের কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি নেন তিনি। তার গবেষণার বিষয় ছিল ‘প্রাপ্তবয়স্কদের শিক্ষায় শ্রবণ-দর্শন পদ্ধতি ব্যবহার করে ভারতের মৌলিক শিক্ষাপদ্ধতি প্রস্তুতি-সংক্রান্ত প্রস্তাব’। এত পড়াশোনা আর কাজের ভেতরেও তিনি গান লেখা আর সুর করাটা ছাড়েননি।

যাপিত জীবন ও সঙ্গীতে শ্রেষ্ঠ হয়ে উঠা
ভূপেন হাজারিকা শুধু গাইতেন না, তিনি গান লিখতেন এমনকি সুরও করতেন। ১০ বছর বয়স থেকেই গান লিখে সুর দিতে থাকেন। অসমিয়া চলচ্চিত্রে গান গাওয়ার মধ্য দিয়ে তার সঙ্গীতজগতে প্রবেশ। পরবর্তী সময়ে বাংলা ও হিন্দি ভাষায় গেয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় গান। জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠেছিলেন ভারতে, বাংলাদেশে, পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র।

তার রচিত গানগুলি ছিল কাব্যময়। গানের উপমাগুলো তিনি প্রণয়-সংক্রান্ত, সামাজিক বা রাজনৈতিক বিষয় থেকে তুলে আনতেন। তিনি আধুনিকতার ছোঁয়া দিয়ে লোকসঙ্গীত গাইতেন। গানের মাধ্যমেই তার ছিল সমাজের প্রতি দায়িত্ববোধ ও মেহনতি মানুষদের জন্য ভালোবাসার প্রকাশ। আধুনিক গান, সিনেমার গান, অসম ভাষায় গান, বাংলা গান, ইংরেজি হিন্দি কত কিছু নিয়ে তিনি কাজ করেছেন। তার বেশির ভাগ জনপ্রিয় বাংলা গানই অসমী ভাষার গানের বাংলা।

মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার গানে আকৃষ্ট হয়েছেন শ্রোতারা। আসামিয়া, ফোক, বলিউড এবং আধুনিক গানকে তিনি জনপ্রিয় করেছেন। বাংলা ও হিন্দি দু’ভাষাতেই আকাশচুম্বি জনপ্রিয়তা পায় ভূপেনের গান। বাংলাদেশের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্কের বাঁধন ছিল তার। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এই শিল্পীর সঙ্গীত স্বাধীনতাকামী জনগণের মাঝে যে আশার আলো জাগিয়েছিল তা চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। বাংলাদেশে ভীষণ জনপ্রিয় ভূপেন হাজারিকা ১৯৭৩ সালে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ নামে যৌথ প্রযোজনায় ছবিতে কণ্ঠ এবং ১৯৭৭ সালে ‘সীমানা পেরিয়ে’ ছবির সংগীত পরিচালনা করেন।

কালজয়ী গানে স্মরণীয় হয়ে থাকা
ভূপেন হাজারিকা অনেক বাংলা, অসমীয়া ও হিন্দি গান গেয়েছেন ও সুর করেছেন। তার মধ্যে কিছু আজও মানুষে মুখে মুখে রয়েছে। তার অমর কিছু গানের মধ্যে রয়েছে; শরৎ বাবু খোলা চিঠি দিলেম তোমার কাছে, আজ জীবন খুঁজে পাবি, হে দোলা হে দোলা, গঙ্গা আমার মা-পদ্মা আমার মা, মানুষ মানুষের জন্য-জীবন জীবনের জন্য, আমি এক যাযাবর, বিস্তীর্ণ দুপারের, মেঘ থম থম করে, সবার হৃদয়ে রবীন্দ্রনাথ, সাগর সঙ্গমে, আমরা করবো জয়, আমায় একটা সাদা মানুষ দাও প্রভৃতি।

পুরস্কার ও সম্মাননা
ভূপেন হাজারিকা তার পরিচালিত শকুন্তলা ছবির জন্য ১৯৬১ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন। এরপর ‘চামেলি মেমসাব’ গানের জন্য ১৯৭৫ সালে শ্রেষ্ঠ সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে আবারও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান গুণী এ ব্যক্তি। ১৯৭৯ সালে শ্রেষ্ঠ লোকসঙ্গীত শিল্পী হিসেবে পেয়েছেন অল ইন্ডিয়া ক্রিটিক অ্যাসোসিয়েশন পুরস্কার।

এছাড়া পদ্মশ্রী (১৯৭৭), অরুণাচল প্রদেশ রাজ্য সরকারের কাছ থেকে ‘গ্লোড মেডেল’, দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার (১৯৯২), পদ্মভূষণ (২০০১), অসম রত্ন পুরস্কার (২০০৯), ফ্রেন্ডস অফ লিবারেশন ওয়ার অনার, বাংলাদেশ সরকার (২০১১), পদ্মবিভূষণ পুরস্কার (২০১২, মরণোত্তর), ভারতরত্ন পুরস্কার (২০১৯, মরণোত্তর) সহ অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। তার সম্মানার্থে ২০০৯ সালে আসাম রাজ্যের রাজধানী গৌহাটি শহরে ভূপেন হাজারিকার ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে।

স্বর্গলোক গমন
ভূপেন হাজারিকা ৫ নভেম্বর ২০১১ মুম্বাইয়ের ধিরুভাই আম্বানি মেডিকেল রিসার্চ ইনস্টিটিউট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় স্বর্গলোক গমন করেন। ৮৫ বছর বয়সে জীবনাবসান হলেও এই মহান মানুষটি তার কর্মের মাধ্যমে মানুষের মনের খুব কাছেই রয়েছেন ও থাকবেন আজীবন।

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading