বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের বিস্ময়কর বিকাশ

বাংলাদেশের ওষুধ শিল্পের বিস্ময়কর বিকাশ

শিমুল মাহমুদ । রবিবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২২ । আপডেট ১৪:৩৫

স্বাধীনতার ৫০ বছরে এসে বাংলাদেশে ওষুধশিল্পের বিস্ময়কর বিকাশ ঘটেছে। বেসরকারি খাতের উদ্যোগে ওষুধ উৎপাদন ও রপ্তানিতে বাংলাদেশ অভাবনীয় অগ্রগতি অর্জন করেছে। স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে যেখানে বিদেশি ওষুধের ওপর নির্ভরতা ছিল প্রায় শতভাগ, সেখানে ৫০ বছর পর বিশ্বের ১৪৭টি দেশে রপ্তানি হচ্ছে বাংলাদেশের ওষুধ। জীবন রক্ষাকারী ওষুধ উৎপাদনে বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশ এখন এক নির্ভরতার নাম।

বাংলাদেশের কোম্পানিগুলো এখন ভ্যাকসিন, হৃদরোগ ও ক্যান্সারের ওষুধ, ইনসুলিনসহ বিভিন্ন ধরনের জটিল ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ওষুধ তৈরি করছে। ইতিমধ্যে দেশের অন্তত ১৪টি কোম্পানি বিভিন্ন দেশে নিবন্ধন পেয়েছে। এর মাধ্যমে সেসব দেশে আরও বিপুল পরিমাণ ওষুধ রপ্তানির পথ প্রশস্ত হয়েছে। দেশের প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকার ওষুধের বাজারের ৯৮ শতাংশই স্থানীয় ওষুধ কোম্পানিগুলোর দখলে।

প্রতি বছর দেড় হাজার কোটি টাকার ওষুধ রপ্তানি হচ্ছে। বর্তমানে গড়ে ১৫ শতাংশ হারে বাড়ছে বাংলাদেশের ওষুধের বাজার। এ অবস্থায় প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকলে আগামী ১০ বছরের মধ্যে বিশ্বের ওষুধ-বাণিজ্যের অন্তত ৫ শতাংশ দখল করা সম্ভব বলে মনে করছেন এই খাতের উদ্যোক্তারা।

কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকায় এখন থেকে পাঁচ বছর আগেই (২৪ আগস্ট, ২০১৬) সাংবাদিক অমিত বসু বাংলাদেশের ওষুধশিল্প নিয়ে ‘এখন দুনিয়া দাপাচ্ছে বাংলাদেশের ওষুধশিল্প’ শিরোনামে এক অনবদ্য প্রতিবেদন প্রকাশ করে ছিল।

বাংলাদেশের ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানিগুলোকে বর্তমানে আবিষ্কারক প্রতিষ্ঠানকে মেধাস্বত্বের জন্য অর্থ দিতে হয় না। গরিব দেশে ওষুধের মূল্য বৃদ্ধি ঠেকাতে এ সুবিধা দিচ্ছে অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট (এপিআই) উৎপাদক দেশগুলো। আর এ সুবিধা পাওয়ার কারণে দেশের ওষুধশিল্প একটি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে। সারা দুনিয়ায় বাংলাদেশের ওষুধের চাহিদা দিন দিন বাড়ার মূল কারণ বিশ্ব বাজারের তুলনায় দাম অনেক কম। ভারতীয় একটি দৈনিকের প্রতিবেদন বলছে, উন্নত বিশ্বে যে ওষুধের দাম গড়ে ৪২৫ ডলার, বাংলাদেশে এর দাম মাত্র ৩২ ডলার। মানও খারাপ নয়।

তবে ওষুধের বাজার বিকাশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের ওষুধের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়াটা সহজ ছিল না। ইউরোপ-আমেরিকায় ওষুধের মতো স্পর্শকাতর পণ্য বাজারে যায় কঠিনভাবে মান যাচাইয়ের পর। তাদের মান যাচাইয়ের প্রক্রিয়ার ওপর সবাই আস্থাশীল। সেই মান যাচাইয়ের পরীক্ষায় পাস করেই বাংলাদেশের ওষুধ বিভিন্ন দেশে যাচ্ছে। আমেরিকায় ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা এফডিএর ছাড়পত্র পাওয়া দুরূহ, সময়সাপেক্ষ।

দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে অনেক বিতর্ক থাকলেও ওষুধশিল্পের সুনাম বিশ্বজুড়ে। গুণগত মান ও কার্যকারিতার কারণে বাংলাদেশের ওষুধ ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্ববাজারে। অনুন্নত বিশ্বের ৪৮ দেশের মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে বাংলাদেশের ওষুধ। দেশের ২৫৭টি কোম্পানির কারখানায় বছরে ২৪ হাজার ব্র্যান্ডের ওষুধ উৎপাদিত হচ্ছে। এ শিল্পে প্রায় ২ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। এসব তথ্য দিয়ে ওষুধশিল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, তারা এ অগ্রযাত্রা আরও বেগবান করতে চান।

ক্যান্সারের ওষুধের সঙ্গে বাংলাদেশ তৈরি করছে হেপাটাইটিস সির ওষুধ। ৮৪ ডোজের চিকিৎসায় ১ ডোজের খরচ ১ হাজার ডলার। পুরো কোর্সে খরচ ৮৪ হাজার ডলার। বাংলাদেশে তৈরি এর ১ ডোজের দাম পড়ে মাত্র ৮০০ টাকা। দেশের ৪৬ কোম্পানির ৩০০ ধরনের ওষুধপণ্য বিশ্ববাজারে রপ্তানি হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, জাতীয় অর্থনীতিতে ওষুধশিল্পের অবদান বাড়ছে। জিডিপিতে ওষুধ খাতের অবদান ছিল প্রায় ৩ শতাংশ। বর্তমানে ২৫৭টি অনুমোদিত কোম্পানির মধ্যে উৎপাদনে রয়েছে ১৫০টি। ওষুধের বৈশ্বিক বাজারের হিসাবে দেখা যায়, ২০১৮ সালের শুরুতে বিশ্বব্যাপী ওষুধের বাজার ছিল ১ হাজার ২০৫ বিলিয়ন ডলারের, যেখানে প্রবৃদ্ধি ছিল ৪ দশমিক ০৮ শতাংশ। ২০২৩ সালে এটা ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে।

ওষুধশিল্প সমিতির তথ্যানুযায়ী, গত দুই বছরে ১ হাজার ২০০ ধরনের ওষুধ রপ্তানির অনুমোদন পাওয়া গেছে। রপ্তানিতে শীর্ষ সাত দেশ হচ্ছে- মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম, আফগানিস্তান, কেনিয়া ও স্লোভেনিয়া। মোট ওষুধ রপ্তানির ৬০ শতাংশ যাচ্ছে এসব দেশে। আর বাকি ৪০ শতাংশ অন্যান্য দেশে রপ্তানি হয়। রপ্তানির শীর্ষে রয়েছে বেক্সিমকো ফার্মা। দ্বিতীয় ও তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ইনসেপ্টা ও স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড। বাংলাদেশের তৈরি ওষুধ এশিয়া মহাদেশের ৪১টি দেশে, দক্ষিণ আমেরিকার ২৩টি দেশে, আফ্রিকা মহাদেশের ৩৭টি, উত্তর আমেরিকার ৪টি দেশে, ইউরোপের ৩২টি ও অস্ট্রেলিয়ার ৫টি দেশে নিয়মিত রপ্তানি হচ্ছে।

বাংলাদেশ ওষুধশিল্পে দ্রুত অগ্রসর হওয়ার পেছনে ১৯৮২ সালের ওষুধনীতি বড় ভূমিকা পালন করেছে। এ ছাড়া সরকার ওষুধশিল্পের ওপর নানা ধরনের সুবিধা প্রদানের কারণে এটি বিশ্বের কাছে পরিচিতি লাভ করতে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে দেশের কয়েকটি কোম্পানি ভ্যাকসিন ও ক্যান্সারের ওষুধ তৈরিতে এগিয়ে এসেছে। বাংলাদেশে রয়েছে অসংখ্য গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট। বিশ্বের অনেক দেশেই গ্র্যাজুয়েট ফার্মাসিস্ট নেই। বাংলাদেশের ওষুধ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিন দিন রপ্তানির পরিমাণ বেড়েই চলেছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান যৌথভাবে কয়েকটি দেশীয় কোম্পানির সঙ্গে ওষুধ তৈরি করছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ওষুধশিল্প রপ্তানির শীর্ষে থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন সংশ্লিষ্টরা।

ইউডি/অনিক

melongazi

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading