ইলিশ বাঁচাতে আরও কঠিন হতে হবে
বিনয় দাস । মঙ্গলবার, ৮ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১৭:৩০
গত ১ মার্চ থেকে আগামী ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত এই দুই মাস দেশের ৬ জেলার ৫টি অভয়াশ্রমে জাটকা ইলিশসহ সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ করেছে সরকার। কিন্তু কে মানে কার কথা। নিষিদ্ধ এই সময়ে অহরহই মিলছে জাটকা ইলিশসহ মা ইলিশ। রাজধানীসহ দেশের সর্বত্র অবাধে চলছে জাটকা বিক্রি। আজকের জাটকা আগামীদিনের ইলিশ- যা দেশের মৎস খাতের সবচেয়ে বড় সম্পদ। চলতি বছর দেশে পাঁচ লাখ টনেরও বেশি ইলিশ উৎপাদনের আশা প্রকাশ করছে মৎস অধিদপ্তর।
জাটকা মৌসুমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার পাশাপাশি নজর বাড়াতে হবে। নচেৎ দিনকে দিন যে হারে জাটকা আহরণ হচ্ছে সেক্ষেত্রে দেশে ইলিশ উৎপাদন হুমকির মধ্যে পরে যাবে। ইলিশ যদি হুমকির মধ্যে পড়ে যায় তবে শুধু আর্থিক ক্ষতি কিংবা ইলিশের চাহিদাই পড়ে যাবে না তার সঙ্গে দেশ হারাবে জাতীয় মাছের কদর।
প্রতিবেশী রাষ্ট্র ইন্ডিয়ার পশ্চিমবঙ্গের দিকে তাকালেই দেখা যায় ইলিশের জন্য তাদের কেমন হাহাকার। তাইতো প্রতিবছরই বাংলাদেশ থেকে তারা বিপুল পরিমাণ ইলিশ আমদানি করে। তাতেও তারা তৃপ্ত থাকে না। তাদের চাহিদার চেয়েও অনেক অনেক কম ইলিশ তারা পায়। তাই প্রাকৃতিক কারনে যে ইলিশ আমাদের দেশের সম্পদে পরিণত হয়েছে তা হাতে ধরে নষ্ট করা হবে সবচেয়ে বোকামি। আগামী ২০২৪ সালের জুন মাসের পর দেশে ইলিশের উৎপাদন ১৬ শতাংশ বাড়বে। এ লক্ষ্যে মৎস্য অধিদফতর ‘ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা প্রকল্প’ নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। ২০২০ সালের জুলাই মাসে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পর দেশে ইলিশের উৎপাদন ১৬ শতাংশ বাড়বে বলে মনে করছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।
ইলিশ জেলেদের এসব বোঝানোর দায়িত্ব যথাযথ কর্তৃপক্ষের। ইলিশের এই নিষিদ্ধ সময়ে তাদের অন্যান্য কাজের ব্যবস্থা কিংবা পুর্নবাসন আরও বাড়তে হবে। তাহলেও কিঞ্চিত তাদের মধ্যে অনুধাবন হবে। যদিও সরকার ইতোমধ্যেই মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকাকালীন অভয়াশ্রমগুলো এলাকার নদনদীতে জাটকা আহরণে বিরত থাকা ২ লাখ ৪৩ হাজার ৭৭৮ জেলের জন্য মাসে ৪০ কেজি করে দুই মাসে ৮০ কেজি হারে মোট ১৯ হাজার ৫০২ মেট্রিক টন ভিজিএফ চাল বরাদ্দ দিয়েছে।
সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে অনেক জেলে সরকারের নির্দেশ অমান্য করে নদীতে নামছে মাছ ধরতে। এ সমস্ত জেলের জালেই ধরা পড়ে শত শত টন জাটকা। যা দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে যাচ্ছে এবং বিক্রিও হচ্ছে। মৎস্য সুরক্ষা ও সংরক্ষণ আইন-১৯৫০ এর ধারা ৩ এর উপধারা ৫ এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার ঘোষিত ৫টি অভয়াশ্রমে প্রতিবছর মার্চ-এপ্রিল দুই মাস ইলিশ, জাটকাসহ (২৫ সেন্টিমিটার বা ১০ ইঞ্চি সাইজের ইলিশ) সব ধরনের মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আইন অমান্যকারীদের কমপক্ষে ১ বছর থেকে সর্বোচ্চ ২ বছর সশ্রম কারাদণ্ড অথবা পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করারও বিধান রয়েছে আইনে।
ইলিশের জন্য দেশের ৫টি অভয়াশ্রম হচ্ছে চাঁদপুর জেলার ষাটনল থেকে লক্ষ্মীপুর জেলার চর আলেকজান্ডার পর্যন্ত মেঘনা নদীর নিম্ন অববাহিকার ১০০ কিলোমিটার এলাকা। ভোলা জেলার মদনপুর বা চর ইলিশা হতে চর পিয়াল পর্যন্ত মেঘনা নদীর শাহবাজপুর শাখা নদীর ৯০ কিলোমিটার এলাকা। ভোলা জেলার ভেদুরিয়া হতে পটুয়াখালী জেলার চর রুস্তম পর্যন্ত তেঁতুলিয়া নদীর প্রায় ১০০ কিলোমিটার এলাকা। শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া ও ভেদরগঞ্জ উপজেলা এবং চাঁদপুর জেলার মতলব উপজেলার মধ্যে অবস্থিত পদ্মা নদীর ২০ কিলোমিটার এলাকা এবং বরিশাল জেলার হিজলা, মেহেন্দীগঞ্জ ও বরিশাল সদর উপজেলার কালাবদর, গজারিয়া ও মেঘনা নদীর প্রায় ৮২ কিলোমিটার এলাকা।
আন্তর্জাতিক মৎস্য গবেষণা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে আহরিত ইলিশের ৮০ শতাংশই বাংলাদেশে। ১০ শতাংশ মিয়ানমারে, ৫ শতাংশ ভারতে এবং বাকি ৫ শতাংশ অন্যান্য দেশে। স্বাদ ও ঘ্রাণে বাংলাদেশের ইলিশ অতুলনীয়, বিশ্বসেরা। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, রপ্তানি আয় বাড়ানো ও আমিষের চাহিদা পূরণে জাতীয় মাছ ইলিশের গুরুত্ব অপরিসীম। জাটকা সংরক্ষণসহ ইলিশ রক্ষায় বছরব্যাপী বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ায় প্রতি বছর মাছটির উৎপাদন বাড়ছে। গত ১০ বছরে উৎপাদন বেড়েছে প্রায় আড়াই লাখ টন। বেশকিছু পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করায় ইলিশ উৎপাদন বেড়েই চলছে। পাশাপাশি নতুন কয়েকটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর ফলে ইলিশের উৎপাদন প্রতি বছর বাড়বে।
২০১৭ সালে বাংলাদেশের ইলিশ ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এর মাধ্যমে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চিরদিনের জন্য স্থান পায় বাংলার ইলিশ। মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা বলছে, ১০ বছর আগে দেশের ২১টি উপজেলার নদ-নদীতে ইলিশ পাওয়া যেত। বর্তমানে ১২৫টি উপজেলার আশপাশ দিয়ে প্রবাহিত নদীতে এ মাছ পাওয়া যাচ্ছে। পদ্মার শাখা নদী মহানন্দা থেকে শুরু করে মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওর এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেদির হাওরেও ইলিশ পাওয়া যাচ্ছে।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী
ইউডি/সুপ্ত

