এ.পি.জে. আবদুল কালাম: এক চিরকালীন স্বপ্নদ্রষ্টা

এ.পি.জে. আবদুল কালাম: এক চিরকালীন স্বপ্নদ্রষ্টা

উত্তরদক্ষিণ । বৃহস্পতিবার, ১০ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১২:৪৮

“সফলতার গল্প পড়ো না, কারণ তা থেকে তুমি শুধু গল্পটাই পাবে। ব্যর্থতার গল্প পড়ো, তাহলে সফল হওয়ার কিছু উপায় পাবে” উক্তিটি এ.পি.জে আবদুল কালামের অনেক বিখ্যাত উক্তির মধ্যে একটি। এ.পি.জে. আবদুল কালাম ছিলেন একজন সফল ইন্ডিয়ান মহাকাশ বিজ্ঞানী ও রাজনীতিবিদ। তিনি ইন্ডিয়ার ১১তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। রকেট উন্নয়নের কাজে অবদানের জন্য তাকে ‘মিসাইল ম্যান অব ইন্ডিয়া’ বলা হয়। মহান এই কর্মবীরের সংক্ষিপ্ত জীবনী লিখেছেন মো. সাইফুল ইসলাম

তুমি তোমার ভবিষ্যৎ পরিবর্তন করতে পারবে না, কিন্তু তোমার অভ্যাস পরিবর্তন করতে পারবে এবং তোমার অভ্যাসই নিশ্চিতভাবে তোমার ভবিষ্যৎ পরিবর্তন করবে।

সাধারণ পরিবারে জন্ম তার: ১৯৩১ সালের ১৫ অক্টোবর তামিলনাড়ুর রামানাথপুরম জেলায় রামেশ্বরম দ্বীপসাগরের এক মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন তিনি। তার পুরো নাম আবুল পকির জয়নুল আবেদীন আবদুল কালাম। তার পিতার নাম জয়নুল আবেদিন ও মায়ের নাম অশিয়াম্মা।

আবদুল কালাম এর শিক্ষাজীবন: ছোটবেলা থেকেই ছিলেন বিজ্ঞানের এক অসাধারণ প্রভাবশালী ছাত্র। শৈশবের শিক্ষা শুরু হয় রামেশ্বরম এলিমেন্টরি স্কুলে। এরপর ভর্তি হলেন স্টুওয়াজ হাইস্কুলে। স্কুলের পরীক্ষাতে বরাবর কৃতিত্বের সাথে পাশ করেছেন তিনি। ১৯৫০ সালে সেন্ট জোসেফ কলেজে ইন্টারমিডিয়েট কোর্সে ভর্তি হন তিনি। সেন্ট জোসেফ কলেজ থেকে পদার্থবিদ্যা নিয়ে স্নাতক হওয়ার পর ম্যাড্রাস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজিতে এরোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া শেষ করেন।

সফলতার মূলমন্ত্র দিয়েছিল স্কুল শিক্ষক: হাইস্কুলের এক শিক্ষক ইয়াদুরাই সুলেমান তাকে কর্মযোগী পুরুষে পরিণত করেছিলেন। এই শিক্ষক কালামকে তিনটি মূল মন্ত্র শিখিয়েছিলেন। জীবনে সফল হতে গেলে তিনটি গুণের অধিকারী হতে হবে; ইচ্ছা, বিশ্বাস এবং আশাবাদ। ইচ্ছা হল স্বপ্নের প্রথম প্রহর। দ্বিতীয় প্রহর হল বিশ্বাস। নিজের কর্তব্যবোধের ওপর অবিচল আস্থা থাকতে হবে। সৃষ্টিকর্তার ওপর বিশ্বাস এবং নির্ভরতা রাখতে হবে। সর্বশেষ প্রহরে আশাবাদ জেগে ওঠে। আশাবাদ না থাকলে অরণ্যচারী মানুষ আজ মহাকাশ বিজয়ী হতে পারতনা।

দেশীয় প্রযুক্তিতে মিসাইল তৈরির নায়ক: তিনি ১৯৬০ সালে বিজ্ঞানী হিসেবে যোগ দেন ইন্ডিয়ার ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনে(ডিআরডিও)। ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল ইন্ডিয়ান সেনাবাহিনীর ছোট মাপের একটি হেলিকপ্টারের নকশা করার মধ্য দিয়ে। কিন্তু দ্রুতই উত্থান ঘটে তার। ইন্ডিয়ার মহাকাশ গবেষণার সংস্থা ইসরো’র সঙ্গে যুক্ত হন তিনি। সেখান থেকে রকেট সাইন্সের উপর প্রশিক্ষণ নিতে তাকে আমেরিকায় পাঠানো হয়। তার হাত ধরেই ইন্ডিয়ার রকেট টেকনোলোজির বিশাল উন্নতি সাধিত হয়। দেশীয় প্রযুক্তিতে উন্নত সামরিক মিসাইল তৈরির প্রকল্পে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। মহাকাশযান ও স্যাটেলাইট বহনকারী পিএসএলভি এবং এসএলভিথ্রি রকেট তৈরিতে উল্লেখযোগ্য অবদানের জন্য তাকে ইন্ডিয়ার মিসাইল ম্যান বলা হয়। পরমাণু শক্তিধর দেশগুলির সঙ্গে একই সারিতে ইন্ডিয়াকে তুলে আনায় তার অবদান অনস্বীকার্য। ১৯৯৮ সালে পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষা সংক্রান্ত ‘পোখরান–টু’ প্রকল্পের চিফ প্রজেক্ট কোঅর্ডিনেটর ছিলেন তিনি।

ইন্ডিয়ার ১১তম রাষ্ট্রপতি: দেশের প্রথম সারির বিজ্ঞানী হিসাবে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। পরে প্রবেশ করেন রাজনীতির অঙ্গনে। নিজেকে রাজনৈতিক দলাদলির উর্দ্ধে রেখে কাজ করে এক মহান মানুষে পরিণত হয়েছিলেন তিনি। তৎকালীন শাসকদল ইন্ডিয়ান জনতা পার্টি ও বিরোধী দল ইন্ডিয়ান জাতীয় কংগ্রেসের সমর্থনের ভিত্তিতে ২০০২ সালে ইন্ডিয়ার একাদশতম রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এ.পি.জে. আবদুল কালাম। ২০০২-২০০৭ সাল পর্যন্ত পালন করেন রাষ্ট্রপতির দ্বায়িত্ব।

তরুণ শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন সারথি: রাষ্ট্রপতির মেয়াদ পূর্ণ করার পর সারা ইন্ডিয়া জুড়ে চষে বেড়িয়েছেন শিশু-কিশোর ও তরুণ শিক্ষার্থীদের উদ্বুব্ধ করার কাজে। শিক্ষার্থীদের কাছে তিনি চিরকালীন অনুপ্রেরণার সঙ্গী। তিনি নিজে যেমন আজীবন স্বপ্ন দেখেছেন, স্বপ্নের পিছু ছুটেছেন; ঠিক তেমনি স্বপ্ন দেখিয়েছেন প্রজন্মকে। বলতেন ‘স্বপ্ন, স্বপ্ন, স্বপ্ন। স্বপ্ন দেখে যেতে হবে। স্বপ্ন না দেখলে কাজ করা যায় না।’ মাঝে মাঝে তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলতেন, ‘কখনো যদি নিজেকে একা মনে হয় তবে আকাশের দিকে তাকাবে। আমরা একা নই। পৃথিবীটা আমাদের বন্ধু। যারা কাজ করে ও স্বপ্ন দেখে প্রকৃতিও তাদের সাহায্য করে।’

এক নজরে সম্মাননা: ইন্ডিয়ার সকল প্রদেশের সকল মানুষের সম্মানের পাত্র ছিলেন তিনি। নিজেকে উজার করে দিয়েছেন রাষ্ট্রকে। রাষ্ট্রও দিয়েছে তার প্রতিদান। পেয়েছেন দেশ-বিদেশের অনেক পুরষ্কার ও সম্মাননা। উল্লেখযোগ্য গুলো হল: পদ্মভূষণ(১৯৮১), পদ্মবিভূষণ(১৯৯০), ইনস্টিটিউট অব ডিরেক্টর্স(ইন্ডিয়া)-র ডিশটিংগুইশড ফেলো(১৯৯৪), ভারতরত্ন(১৯৯৭), ইন্দিরা গান্ধী পুরস্কার(১৯৯৭), বীর সাভারকর পুরস্কার(১৯৯৮), রামানুজন পুরস্কার(২০০০), ব্রিটেনের উলভারহ্যাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্মানিক ডক্টরেট(২০০৭), কিং চার্লস টু মেডেল(২০০৭), আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্মানিক ডক্টরেট(২০০৮), সিঙ্গাপুরের নান্যাঙ্গ টেকনোলজি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্মানিক ডক্টরেট(২০০৮), ক্যালিফোর্নিয়া ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজির ইন্টারন্যাশনাল ভোন কর্মণ উইংস অ্যাওয়ার্ড(২০০৯), হুভার মেডেল(২০০৯), আমেরিকার ওকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্মানিক ডক্টরেট(২০০৯), ব্রিটেনের এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্মানিক ডক্টরেট(২০১৪)।

উজ্জ্বল ব্যক্তিত্বের চিরবিদায়: ২৭ জুলাই ২০১৫ ইন্ডিয়ার পরমাণু গবেষনার পথিকৃৎ, ইন্ডিয়ার একাদশতম রাষ্ট্রপতি এ.পি.জে. আবদুল কালামের (৮৪) জীবনাবসান হয়। শিলংয়ের আইআইএমের এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখার সময় মঞ্চের ওপরেই পড়ে যান। পরে তাকে স্থানীয় বেথানি হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। সেখানেই তার মৃত্যু হয়। ৩০ জুলাই তার পৈতৃক গ্রাম রামেশ্বরমের কাছেই শেষকৃত্য করা হয়েছিল তার। তার শেষকৃত্যে প্রায় ৩৫,০০০ মানুষ অংশ নিয়েছিল। ইন্ডিয়ার ইতিহাসে এ.পি.জে. আবদুল কালাম এক উজ্জ্বল ব্যক্তিত্ব হিসাবে থেকে যাবে চিরকাল।

Asadujjaman

Leave a Reply

Discover more from Daily Uttor Dokkhin উত্তরদক্ষিণ

Subscribe now to keep reading and get access to the full archive.

Continue reading