আজম খান: দুর্ধর্ষ গেরিলা থেকে পপ সম্রাট
উত্তরদক্ষিণ । রবিবার, ১৩ মার্চ ২০২২ । আপডেট ১২:৫৬
গায়ক আজম খানই প্রথম জারি, সারি, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, নজরুল গীতি, রবীন্দ্র সংগীত এবং লোকসংগীতে সমৃদ্ধ বাংলাদেশে প্রথম বাংলা পপ সংগীতের প্রচলন ও জনপ্রিয় করেন। তাই তাকে বাংলার পপ ও ব্যান্ড সংগীতের গুরু বা পপ সম্রাট বলা হয়। বাংলা গানকে তিনিই প্রথম ভিন্ন আঙ্গিকে শ্রোতাদের সামনে এনেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধে দুর্ধর্ষ গেরিলা বাহিনী ‘ক্র্যাক প্লাটুন’এর সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আজম খানকে নিয়ে লিখেছেন মো. সাইফুল ইসলাম…
| ‘এটা কিন্তু মেইনলি আমার যুদ্ধ, গণসংগীত। মানুষকে উৎসাহ দেয়ার জন্য, চেতনার জন্য, জাগানোর জন্যই কিন্তু আমার গান গাওয়া। পপ সম্রাট, গুরু, টাকা পয়সা, ধান্দা ফিকির এইগুলার জন্য কিন্তু আমার হেডেক নাই, বা চিন্তাও নাই’ |
শৈশব ও পড়ালেখা: তার আসল নাম মোহাম্মদ মাহবুবুল হক খান। তবে তিনি আজম খান নামেই পরিচিত। তিনি ১৯৫০ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরের আজিমপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ছিল আফতাবউদ্দিন খান ও মায়ের নাম জবেদা বেগম। বাবা সরকারি কর্মকর্তা হওয়ার সুবাদে তার ছেলেবেলা কাটে আজিমপুরের ১০ নম্বর সরকারি কোয়ার্টারে। ১৯৫৫ সালে তিনি প্রথমে আজিমপুরের ঢাকেশ্বরী স্কুলে শিশু শ্রেণিতে ভর্তি হন। পরে তার বাবা কমলাপুরে বাড়ি বানিয়ে চলে যান সেখানে। তিনি কমলাপুরের প্রভেনশিয়াল স্কুলে প্রাথমিক স্তরে এসে ভর্তি হন। তারপর ভর্তি হন সিদ্ধেশ্বরী হাইস্কুলে বাণিজ্য বিভাগে। এই স্কুল থেকে ১৯৬৮ সালে এসএসসি পাস করেন। ১৯৭০ সালে টিঅ্যান্ডটি কলেজ থেকে বাণিজ্য বিভাগে উত্তীর্ণ হন। মুক্তিযুদ্ধের পর পড়ালেখায় আর অগ্রসর হতে পারেননি।
মুক্তিযুদ্ধে ছিলেন সেকশন ইন-চার্জ: যুদ্ধ শুরু হলে আজম খান বাবাকে বলেন, যুদ্ধে যাব। সায় দিয়ে বাবা বলেছিলেন, ‘দেশ স্বাধীন না করে ঘরে ফিরবি না!’ ২১ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন তিনি। তার গাওয়া গান প্রশিক্ষণ শিবিরে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রেরণা যোগাতো। যুদ্ধ প্রশিক্ষণ শেষে তিনি কুমিল্লায় পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে সম্মুখ সমরে অংশ নেয়া শুরু করেন। কিছুদিন পর আগরতলা হয়ে ফিরে আসেন ঢাকায়। গেরিলা যুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য। আজম খান ছিলেন দুই নম্বর সেক্টরের একটা সেকশনের ইন-চার্জ। আর সেক্টর কমান্ডার ছিলেন কর্নেল খালেদ মোশাররফ। তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের বিখ্যাত গেরিলা বাহিনী ‘ক্র্যাক প্লাটুন’ এর সদস্য। ঢাকায় তিনি সেকশান কমান্ডার হিসেবে যাত্রাবাড়ি-গুলশান এলাকার গেরিলা অপারেশনগুলো পরিচালনার দায়িত্ব পান। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল তার নেতৃত্বে সংঘটিত “অপারেশন তিতাস”। এই যুদ্ধে তিনি তার বাম কানে আঘাতপ্রাপ্ত হন।
প্রারম্ভ ও উচ্চারণ ব্যান্ড: মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের পর ১৯৭২ সালে তিনি তার বন্ধুদের নিয়ে উচ্চারণ ব্যান্ড গঠন করেন। তার ব্যান্ড উচ্চারণ এবং লাকী আখন্দ ও হ্যাপী আখন্দ দেশব্যাপী সংগীতের জগতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। তার প্রথম কনসার্ট প্রদর্শিত হয় বাংলাদেশ টেলিভিশনে ১৯৭২ সালে। সেই অনুষ্ঠানের এতো সুন্দর দুনিয়ায় কিছুই রবে না রে ও চার কালেমা সাক্ষী দেবে গান দুটি সরাসরি প্রচারিত হলে ব্যাপক প্রশংসা আর তুমুল জনপ্রিয়তা পান এই গানের দল। পরবর্তীতে পরিচিত হন ফকির আলমগীর, ফেরদৌস ওয়াহিদ, পিলু মমতাজের সাথে। একসাথে বেশ কয়েকটা জনপ্রিয় গান করেন তারা। পরে একটি এসিড-রক ঘরানার গান ‘জীবনে কিছু পাবোনা এ হে হে’। তিনি দাবি করেন, এটি বাংলা গানের ইতিহাসে প্রথম হার্ডরক।
তবে তার নতুনের এই পথচলা ও প্রতিষ্ঠা অর্জন একেবারেই সহজ ছিলোনা। যুবসমাজের মধ্যে বিপুল জনপ্রিয়তা পাওয়া সত্ত্বেও তাকে বাংলার অনেক বিখ্যাত শিল্পীদের থেকে গায়ক হিসেবে সম্মান ও স্বীকৃতি পেতে অনেক বছর অপেক্ষা করতে হয়েছে। তার গানকে সংগীত হিসেবে ও তাকে গায়ক হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য সংগ্রাম করতে হয়েছে তাকে। অনেক প্রথিতযশা শিল্পী তার সাথে সংগীতের এক মঞ্চে আসতে অসম্মত ছিলেন।
বিখ্যাত গান: জীবদ্দশায় তিনি প্রায় শতাধিক গান গেয়েছেন। যার অধিকাংশ তার নিজের রচনা ও সুর করা। তবে তিনি কোন বাদ্যযন্ত্র বাজাতে জানতেন না। কিন্তু তারপরেও তার গান ছিল অসাধারণ। রেললাইনের ওই বস্তিতে, সময় এখন বর্ষাকার, চুপ চুপ অনামিকা চুপ, পাপড়ি কান বোঝেনা, আর কতকাল বয়েযাবো দুঃখ আমি, আসি আসি বলে তুমি আর এলেনা, আলাল আর দুলাল, দুঃখ আমার, চাঁদকে ভালোবেসো না, একটাই দুঃখ, তুমিহীনা, কেউ নেই আমার, ওরে সালেকা-ওরে মালেকা; তার বিখ্যাত গানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য। ‘আমি বাংলাদেশের আজম খান, বাংলাতে গাই পপ গান’ এই গানটির মধ্য দিয়ে তার জীবনী তুলে ধরা হয়েছে। মৃত্যুর আগে নিজেই নিজের জীবনী নিয়ে গানটি লিখেছিলেন।
একক সংগীত শিল্পী: ‘এক যুগ’ নামে তার প্রথম অডিও অ্যালবাম ক্যাসেট প্রকাশিত হয় ১৯৮২ সালে। ১৭টি একক, ডুয়েট ও মিশ্রসহ সব মিলিয়ে তার গানের অ্যালবাম ২৫টি। তার প্রথম সিডি বের হয় ১৯৯৯ সালের ৩ মে ডিস্কো। আজমের উল্লেখযোগ্য অ্যালবামের মধ্যে আছে দিদি মা, বাংলাদেশ, কেউ নাই আমার, অনামিকা, কিছু চাওয়া, নীল নয়নতা ইত্যাদি। মৃত্যুর পর ২০১১ সালে ইম্প্রেস অডিও ভিশনের ব্যানারে ‘গুরু তোমায় সালাম’ নামে তার সর্বশেষ অ্যালবাম প্রকাশিত হয়।
মডেলিং ও সিনেমায় পপ সম্রাট: গানের পাশাপাশি ১৯৮৬ সালে ‘কালা বাউল’ নামে হিরামন সিরিজের নাটকে অভিনয় করেন। এছাড়া ২০০৩ সালে ‘গডফাদার’ নামক সিনেমায়ও অভিনয় করেন। ২০০৩ সালে ক্রাউন এনার্জি ড্রিংকসের বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে প্রথম মডেল হন আজম খান। সর্বশেষ ২০১০ সালে কোবরা ড্রিংকসের বিজ্ঞাপনে মডেল হয়েছিলেন তিনি।
জীবদ্দশায় পাননি একুশে পদক: মৃত্যুর ৯ বছর পর ২০১৯ সালে আজম খান ‘একুশে পদক’ অর্জন করেন। ১৯৯৩ সালে সেরা পপ শিল্পী পুরস্কার, ২০০২ সালে টেলিভিশন দর্শক পুরস্কার ছাড়াও দেশে বিদেশে আরো অনেক পুরস্কার ও সম্মাননা অর্জন করেন। ২০১৩ সালে তার পরিবার দুস্থ শিল্পীদের জন্য ‘আজম খান ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেন।
ক্যান্সার কেড়ে নিল জীবন: ২০১০ সালে মুখে দুরারোগ্য ক্যান্সার ব্যাধি ধরা পড়লে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে থাকেন তিনি। পরে ৫ জুন, ২০১১ইং তারিখে ঢাকাস্থ সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তিনি ভক্ত ও শ্রোতা হৃদয়ে বেঁচে আছেন তার চিরস্মরণীয় গানগুলোর জন্য।।

